ঢাকাসহ সারা দেশে ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু। বিশেষ করে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। শনিবার পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মারা গেছেন ১৭৮ জন এবং আক্রান্ত হয়েছেন ৬০ হাজার ৩৭৯ জন। গত বছরের একই সময়ে মৃত্যু হয়েছিল ১৬৭ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪০ হাজার। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার মৃত্যু ও সংক্রমণ দুটিই বেড়েছে।
চলতি সেপ্টেম্বরেও পরিস্থিতি টালমাটাল। মৃত্যু ও আক্রান্তে প্রতিদিন গড়ছে নতুন নতুন রেকর্ড। এ মাসের ১৯ দিনে মৃত্যু হয়েছে ৮১ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ হাজার ৫৩৩ জন। গড়ে প্রতিদিন মৃত্যু হচ্ছে চারজনের বেশি এবং আক্রান্ত হচ্ছেন ১,২৯১ জন।
হামের প্রকোপের মধ্যেও রাজধানীসহ দেশের হাসপাতালগুলোয় প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ জ্বর, সর্দি-কাশি, শরীর ব্যথা, ডায়রিয়ার মতো উপসর্গসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, বিশেষ করে শিশুরা। ফলে সর্দিজ্বর হলেই এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে অভিভাবকদের মধ্যে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এবার ডেঙ্গুতে ঢাকা বিভাগেই মৃত্যু হয়েছে ৮৬ জনের, যা মোট মৃত্যুর ৪৮.৩ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ৫৩ জন মারা গেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায়, যার হার ২৯.৭ শতাংশ। এর পরেই খুলনা বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের। ঢাকা ও খুলনায় মোট মৃত্যু হয়েছে ৬৬.৩ শতাংশ।
আক্রান্তের দিক থেকেও এগিয়ে ঢাকা। এর মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ হাজার ২৯৪ জন, যা মোট আক্রান্তের ৪০.২ শতাংশ। এর পরেই খুলনায় আক্রান্ত ৯,৯০৩ জন, যার গড় ১৬.৪ শতাংশ। দুই সিটিসহ ঢাকা ও খুলনায় মোট আক্রান্তের হার ৫৬.৬ শতাংশ। আর বয়সভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সিদের মধ্যে, ২৩ জন। এর মধ্যে ১৪ জনই নারী। আর আক্রান্তের সংখ্যা বেশি ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সিদের। এ বয়সের ৮,৭৫১ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
দিনদিন ডেঙ্গু আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারেÑএমন আশঙ্কা জনস্বাস্থ্য ও কীটতত্ত্ববিদদের। তাদের মতে, মশক নিধন কার্যক্রমে উদাসীনতা, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস না করা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তনসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপে ঘাটতি এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে এখন সারা বছরের রোগ হয়ে গেছে ডেঙ্গু। গত কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে সংক্রমণ ঘটলেও যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ না করায় ডেঙ্গু ভয়াবহ হয়ে উঠছে। তাই ডেঙ্গু মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ তাদের।
সম্প্রতি এক জরিপে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৮টি ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ও ৬৩টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এবার সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ও আক্রান্তের রেকর্ড এই সিটিতে।
জানা গেছে, দেশে প্রথম ডেঙ্গু হয় ১৯৬০-এর দশকে। তখন এটি ‘ঢাকা ফিভার’ নামে পরিচিত ছিল। পরে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ২০০০ সালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এটিকে ডেঙ্গুজ্বর বলে শনাক্ত করেন। ডেঙ্গুতে ২০২৩ সালে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মৃত্যু এবং আক্রান্তের রেকর্ড হয়েছিল। ওই বছর মোট ১,৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং আক্রান্ত হয়েছিলেন তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। আর ২০২৫ সালে ৪১৩ জনের মৃত্যু হয় এবং মোট আক্রান্ত হন এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন।
ডেঙ্গুর ধরনে পরিবর্তন
চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ বা ধরন রয়েছে। এগুলো হলোÑডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। গত চার বছর দেশে ডেন-২ প্রধান সেরোটাইপ হলেও এবার ঢাকাসহ কয়েকটি এলাকায় ডেন-৩ শনাক্ত হয়েছে। রাজধানীতে পরীক্ষা করা ৭১টি নমুনার ৯১.৫ শতাংশে ডেন-৩ এবং ৮.৫ শতাংশে ডেন-২ পাওয়া গেছে।
কোন বিভাগে কত মৃত্যু ও আক্রান্ত
ঢাকা বিভাগে দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৯,৯৯৭ জন, মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আক্রান্ত হয়েছেন ৬,৯৮০ জন, মৃত্যু হয়েছে ২৩ জনের। দক্ষিণ সিটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ৭,৩১৭ জন, মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। বরিশালে আক্রান্ত ৮,৪৬৭ জন, মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের; চট্টগ্রামে আক্রান্ত ৮,৬৭২ জন, মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের; খুলনায় আক্রান্ত ৯,৯০৩ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩২ জনের; ময়মনসিংহে আক্রান্ত ৩,৩৬৬ জন, মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের; রাজশাহীতে আক্রান্ত ৩,৬৩৮ জন, মৃত্যু হয়েছে আটজনের; রংপুরে আক্রান্ত ১,৭৬২ জন, মৃত্যু হয়েছে চারজনের এবং সিলেট বিভাগে আক্রান্ত ২৭৭ জন, মৃত্যু হয়েছে একজনের।
এখন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৬২.৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭.৪ শতাংশ নারী। মৃতদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ পুরুষ এবং ৫২ শতাংশ নারী।
রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালের চিত্র
দেশের অন্যতম বড় চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি চিকিৎসাধীন ৩০ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এখানে ভর্তি হয়ে সেবা নিয়েছেন ২,০৫৫ রোগী। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২,৮০৪ জনের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেবা নেওয়া ১,৬৮৮ জনের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১,১০০ জন, মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১,০৪৭ জনের মধ্যে মারা গেছেন ছয়জন।
সরেজমিন ঢামেকসহ কয়েকটি হাসপাতালে দেখা গেছে, মোট শয্যার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি। হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় পাটি ও কাঁথা বিছিয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীরা সেবা নিচ্ছেন। ধারণক্ষমতার চেয়ে রোগী বেশি থাকায় হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরা।
উচ্চ সংক্রমণের আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
এ ব্যাপারে কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবীরুল বাশার আমার দেশকে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এক ধরনের অবহেলা রয়েছে। ঢাকায় তো এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের কিছুটা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ঢাকার বাইরে সে তুলনায় খুব কম। ফলে এখন বছরজুড়েই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। আমাদের পূর্বাভাস মডেল বলছে, অক্টোবর মাসে বিশেষ করে বরিশালসহ উপকূলীয় এলাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু কীটনাশক দিয়ে এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এডিস মশা দমনে ফগিং ব্যবস্থা মোটেও কার্যকর নয়। তাই ফগিং বন্ধ করে বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপের পাশাপাশি এডিস মশার প্রজনন উৎস ধ্বংস করা খুবই জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরেই দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারকদের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে কমিউনিটি পর্যায়ে উদ্যোগ নিলে মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসা দেওয়ার কাজও সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।
সরকারের প্রস্তুতি
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এমএ মুহিত বলেন, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ এবং অক্টোবরের শুরুর দিকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তবে ডেঙ্গু চিকিৎসায় সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি সমন্বিত রূপরেখাসহ তিন মাসব্যাপী বিশেষ কর্মপরিকল্পনা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ৩,০০০ চিকিৎসককে রিফ্রেশার ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে, স্যালাইনের সরবরাহ ও হাসপাতালের বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শুধু চিকিৎসা দিয়ে মৃত্যু ও সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব নয়। এজন্য ঘরবাড়ি ও কর্মস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
সূত্র: আমার দেশ