এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: একই গাছের ডালে পাশাপাশি অসংখ্য বাসা। কোনো বাসায় বক, কোথাও সারস, আবার কোনো ডালে পানকৌড়ি। আছে বাদুড়সহ নানা প্রজাতির পাখি। অথচ একই গাছে ভিন্ন প্রজাতির এত পাখির বসবাস হলেও তাদের মধ্যে নেই কোনো দ্বন্দ্ব। নেই খাবার নিয়ে বিরোধ, নেই বাসা দখলের প্রতিযোগিতা। বরং পাশাপাশি বাসা বেঁধে ডিম পাড়ছে তারা, সেই ডিম থেকে জন্ম নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম।
পাখিদের এমন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিরল দৃশ্য দেখা যায় বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের সুন্দরবন-সংলগ্ন তাফালবাড়ী গ্রামে। ওই গ্রামের দীপক দাস ও কামরুল ইসলামের বাগানবাড়িতে প্রায় এক দশক ধরে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বসবাস করছে নানা প্রজাতির পাখি।
সারা বছরই এসব পাখির আনাগোনা থাকলেও প্রজনন মৌসুমে বেড়ে যায় তাদের সংখ্যা। পুরনো বাসার পাশাপাশি তখন গাছের ডালে তৈরি হয় নতুন নতুন বাসা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে বাড়ি দুটি ও আশপাশের এলাকা। প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে যায় শত শত পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ।
এক গাছে ভিন্ন প্রজাতির শান্তিপূর্ণ সংসার
সরেজমিনে দেখা যায়, বাগানবাড়ির বিভিন্ন গাছে পাশাপাশি অসংখ্য পাখির বাসা। কোথাও বক, কোথাও পানকৌড়ি; আবার গাছের ডালে বসে আছে বাদুড়। নিজেদের মতো করে বাসা বানিয়ে সেখানে ডিম পাড়ছে পাখিরা। ডিম ফুটে জন্ম নিচ্ছে নতুন ছানা। বড় হয়ে সেই ছানারাও আবার ফিরে আসছে একই আশ্রয়ে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই পাখিরা এখানে নিরাপদে বসবাস করে আসছে। মানুষের সঙ্গে পাখিদেরও যেন তৈরি হয়েছে এক ধরনের সহাবস্থানের সম্পর্ক।
এ বছর বক, পানকৌড়ি ও বাদুড়ের সঙ্গে নতুন অতিথি হিসেবে দেখা মিলেছে মদনটাকের। যদিও এখানে স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধেনি পাখিটি। সুন্দরবন কাছাকাছি হওয়ায় মাঝেমধ্যে সেখান থেকে উড়ে এসে বাগানবাড়ির উঁচু গাছের মগডালে বসে।
গাছ বিক্রি না করে পাখিদের জন্য রেখে দিয়েছেন মালিকরা
পাখিদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই বাগানবাড়ির গাছগুলো রক্ষা করে চলেছেন মালিক দীপক দাস ও কামরুল ইসলাম।
তারা বলেন, “১০ বছর ধরে আমাদের বাড়িতে পাখিরা বাসা বেঁধে বসবাস করছে। কখনো পাখিদের বিরক্ত করি না। বাড়ির ফলফলাদি নষ্ট করে, পরিবেশ নোংরা হয়, তবুও পাখিরা যাতে নিরাপদে থাকে, সে চেষ্টা করি।”
তারা আরও বলেন, “বিক্রি উপযোগী অনেক গাছ থাকার পরও আমরা সেগুলো বিক্রি করি না। গাছ কাটলে পাখিদের মধ্যে ভীতি তৈরি হবে। পরে তারা আর নাও আসতে পারে। সে কারণে গাছ বিক্রি করা হয় না। নিরাপদ আবাসস্থল মনে করেই প্রতি বছর তারা এখানে ফিরে আসে। পাখিদের কলকাকলি ভালো লাগে, আপন মনে হয় ওদের।”
‘পাখির গ্রাম’ ঘোষণার উদ্যোগ
শরণখোলা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি শেখ নাজমুল ইসলাম বলেন, “এ এলাকাটিকে পাখির গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করা হবে। পাখিদের সংরক্ষণে একটি কমিটি গঠন করা হবে। তারা যাতে নিরাপদে থাকতে পারে, সেজন্য গাছে গাছে বিকল্প বাসা তৈরি করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে শিগগিরই কাজ শুরু করা হবে।”
তিনি বলেন, পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। পাখিরা যাতে নির্বিঘ্নে প্রজনন করতে পারে, সেদিকেও নজর দেওয়া হবে।
সুন্দরবনের পাশে মানুষের বাড়িতেই জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়
ওয়াইল্ড টিমের শরণখোলা ফিল্ড ফেসিলিটেটর মো. আলম হাওলাদার বলেন, “সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় এ অঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধি রয়েছে। পাশে বিশাল বন রেখেও মানুষের বাড়িতে পাখিদের বসবাস একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।”
তিনি আরও বলেন, “তাফালবাড়ীর এ বাড়ি দুটি পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে ওঠায় মানুষ নানা প্রজাতির পাখি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা নিতে পারছেন। পাখি সংরক্ষণে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
মানুষের একটু সহনশীলতাই হতে পারে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়
সুন্দরবনের একেবারে কাছাকাছি তাফালবাড়ীর এই দুটি বাড়ি যেন প্রমাণ করছে—বন্যপ্রাণীর জন্য শুধু বনই নয়, মানুষের সচেতনতা ও সহনশীলতাও হতে পারে নিরাপদ আশ্রয়। গাছ না কেটে, পাখিদের বিরক্ত না করে এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষা করলেই প্রকৃতি ফিরিয়ে দিতে পারে তার অপার সৌন্দর্য।
তাফালবাড়ীর গাছগুলোতে তাই শুধু পাখির বাসা নয়, তৈরি হয়েছে মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ। পাখিদের কলকাকলিতে প্রতিদিন যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে সুন্দরবন-সংলগ্ন এই জনপদ।