রংপুর একটি শান্ত জনপদ হিসেবে দেশের মানুষের কাছে পরিচিত ছিল। শান্ত রংপুর হঠাৎ অশান্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে ৯ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে সাতজনই রংপুর মহানগরীর।
জমিজমা বিরোধ, পরকীয়া, মাদক সেবনে বাধা, তুচ্ছ ঘটনা, ছিনতাইকে কেন্দ্র করে এসব খুনের ঘটনা ঘটছে। হঠাৎ করে খুনোখুনি বেড়ে যাওয়ায় জনমনে শঙ্কা রিরাজ করছে। অনেকে রাতে বাড়ি থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা।
সর্বশেষ ২৮ আগস্ট (শুক্রবার) রাতে রংপুর মহানগরীর সীমান্তে গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘণ্টার কাউয়া ফান্দায় এলাকায় মোহাম্মদ মোকলেসুর রহমান (৪০) নামে এক অটোচালককে হত্যা করে তার অটোরিকশা ছিনতাই করা হয়েছে। নিহত ওই অটোচালক গঙ্গাচড়া ইউনিয়নের নবনীদাস এলাকার মৃত হামিদুর রহমানের ছেলে। অটোচালক মোখলেসুর রহমান শুক্রবার রাতে রংপুর নগরীর বুড়িরহাট থেকে যাত্রী নিয়ে গঙ্গাচড়ার গজঘণ্টা ইউনিয়নের কাউয়া ফান্দা এলাকার দিকে যান। নির্জন স্থানে পৌঁছালে ছিনতাইকারীরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে এবং তার ব্যবহৃত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে পথচারীরা রাস্তার পাশে লাশ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে।
এর আগে, রংপুর মেট্রোপলিটন হারাগাছ থানা এলাকায় জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে পলাশ মিয়া (৩৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আহত হওয়ার ৯দিন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ আগস্ট রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি। পলাশ হারাগাছ আরাজি বীরচরণ এলাকার মৃত আব্দুর রশিদের ছেলে। এই ঘটনায় প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট মহানগরীর হারাগাছ থানা এলাকায় সিদ্দিক হোসেন (৩৪) নামে আরেক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। হারাগাছ পৌরসভার চরচতুরা গ্রামের একটি সড়কের পাশে ওই যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত আবু বক্কর সিদ্দিক হারাগাছ ইউনিয়নের পল্লীমারি হক বাজারের রাজা মিয়ার ছেলে। পরকীয়ার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
১৮ আগস্ট মিঠাপুকুরে মিজানুর রহমান (৪৬) নামে এক ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ওই দিন দিবাগত রাতে নিরাপত্তা চেয়ে থানা থেকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে বাড়ি ফেরার পথে তাকে হত্যা করা হয়। নিহত মিজানুর রহমান উপজেলার বড় হযরতপুর ইউনিয়নের চিথলী পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে। তিনি স্থানীয় বাজারে ব্যবসা করতেন। জমিজমা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরে তাকে হত্যা করা হয়।
গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তীকে (১২) হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় পুলিশ দুই যুবককে গ্রেফতার করেছে। মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই ঘটনায় পুলিশ দুজনকে গ্রেফতার করেছে। এই খুনের ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
১৩ আগস্ট নগরীর তাজহাট আনসারি মোড় এলাকার একটি রিকশা গ্যারেজের মালিক আব্দুর রহমান নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীসহ দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। টাকা ও অটোরিকশা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, হঠাৎ রংপুরে হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।
মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, নগরীর আলোচিত চার খুন নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। মহানগর পুলিশ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে।
মহানগরীতে আরও তিন খুন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জমিজমা নিয়ে বিরোধ ও প্রেমজনিত কারণে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। উৎস: বিডি-প্রতিদিন।