এক সময় কচু-লতি ছিল কেবল গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবারের সবজি, এখন সেটিই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাজারে। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া এ সবজি বিদেশি, প্রবাসী বাংলাদেশি ও স্থানীয়দের খাদ্য তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।
বরুড়া উপজেলায় যেসব জমিতে আগে ধান চাষ হতো, উৎপাদন খরচের তুলনায় দাম কম পাওয়ায় কৃষকরা এখন সেসব জমিতে চাষ করছেন কচু-লতি। প্রতিদিন বরুড়া থেকে ৮০ টন লতি রপ্তানি হচ্ছে, যা টাকার অঙ্কে দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৩২ লাখ টাকা। কচু-লতিকে ঘিরে বরুড়ায় সৃষ্টি হয়েছে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। প্রতিদিন স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কৃষকের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে লতি সংগ্রহ করেন। পরে তা ট্রাকে করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঠানো হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন এজেন্সি বাছাই করা কচু-লতি বিদেশে রপ্তানি করছে।
বাণিজ্যিকভাবে ২০১৫ সাল থেকে কচু-লতি চাষে মনোযোগ দেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় এবং উপযুক্ত আবহাওয়া থাকায় স্থানীয় কৃষকেরা ধানের পরিবর্তে কচু-লতি চাষ করতে থাকেন। বরুড়া উপজেলার আগানগর, ভবানীপুর, শিলমুড়ী উত্তর ইউনিয়ন ও খোশবাস দক্ষিণ ইউনিয়নে প্রচুর পরিমাণ কচু-লতি চাষ করা হয়।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বছরে রপ্তানির পরিমাণ ১৭০ থেকে ১৮০ মেট্রিক টন কচুরলতি। যা বিক্রি করা হয় ১৭ থেকে ১৮ কোটি টাকা। বর্তমানে পুরো উপজেলায় ৪৫৯ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে প্রায় আড়াই হাজারের বেশি কৃষক কচু-লতি চাষ করছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ক্ষেত থেকে কচু-লতি তুলে বাড়ি নিয়ে যান কৃষকরা। সেগুলো পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে আঁটি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় বাজারে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাইকারি ব্যবসায়ীরা বরুড়ার বিভিন্ন বাজার থেকে কচু-লতি কিনে নিয়ে যান। মধ্যস্বত্বভোগীদের কয়েক হাত হয়ে এ পণ্য যায় রপ্তানিকারকদের হাতে।
শনি ও মঙ্গলবার বাদে বাকি দিনগুলোতে কচু-লতির হাট বসে বরুড়া উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের বিজয়পুর গ্রামের বাজারে।
জানতে চাইলে বারাইপুর গ্রামের কৃষক হারুন উর রশীদ বলেন, বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে প্রতি কেজি লতি বিক্রি করছি। লতি চাষের বড় সুবিধা হলো, সপ্তাহে এক থেকে দুইবার লতি বিক্রি করা যায়। আমি এবার ৪৫ শতাংশ জমিতে চাষ করছি, খরচ গেছে ৪০ হাজার। এখন পর্যন্ত ৮০ হাজার টাকার বেশি লতি বিক্রি করেছি। পাইকাররা বাড়ি থেকেও লতি নিয়ে যায়। পাশাপাশি কচুও ভালো দামে বিক্রি হয়।
চাষি আব্দুল মতিন বলেন, এখন আর আমাদের বাজারে যেতে হয় না। ব্যবসায়ীরাই বাড়ি থেকে লতি সংগ্রহ করে নেন। মোটা লতি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪৫-৫০ টাকায়, চিকন লতি ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হয়।
বিজয়পুর হাটে গিয়ে দেখা গেছে, দুপুর থেকে কৃষকরা বিভিন্ন যানবাহনে করে লতি নিয়ে হাটে আসেন। নানা জায়গা থেকে পাইকাররাও আসতে থাকেন। বেলা আড়াইটার মধ্যে হাট ভরে যায় লতিতে। অনেকে কচুও নিয়ে আসেন। বেলা ৩টা বাজতেই বেচাকেনা শুরু হয়ে যায়। পাইকাররা কৃষকদের থেকে কেনা কচুর লতি ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান।
কৃষক অহিদুল ইসলাম বলেন, যে লতি দেখতে সুন্দর, মোটা ও লম্বা, এগুলো বিদেশে যায়।
আমিনুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, আমি গত পাঁচ বছর ধরে বাসা ভাড়া নিয়ে বরুড়ায় থাকি। এখান থেকে কচু-লতি পাইকারি কিনে প্রতিদিন ঢাকার যাত্রাবাড়ীর আড়তে পাঠাই। যেসব কচু-লতির মান ভালো, সেগুলো কয়েক হাত হয়ে রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে বিদেশে যায়।
বরুড়া উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, বরুড়া উপজেলার ২৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি কচু-লতি চাষের সঙ্গে জড়িত। বিদেশে সহজে যাতে রপ্তানি করতে পারে সেই বিষয়ে আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। প্রত্যেক ইউনিয়নে কৃষকরা যেন আরও বেশি কচু-লতি চাষাবাদ করতে পারে সেই বিষয়ে আমরা কৃষকদের সার্বিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ।
সূত্র: কালবেলা