শিরোনাম
◈ পোশাকের পর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি পণ্য ফুটওয়্যার, এক বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৫২% ◈ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে ঢাকায় আসছে ভারতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ◈ ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল স্থগিতের রিটে আদেশ মঙ্গলবার ◈ জ্যো‌তি‌কে অ‌ধিনায়ক ক‌রে এশিয়া কাপ ও এশিয়ান গেমসের জন‌্য বাংলা‌দেশ নারী দল ঘোষণা  ◈ জ্বালানি সংকট দূর করতে নেওয়া হচ্ছে তিন পরিকল্পনা: সেতুমন্ত্রী ◈ পদোন্নতি পেয়ে উপসচিব হলেন ২৭৭ কর্মকর্তা ◈ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন আশার আলো, স্বীকৃতি দিল মিয়ানমার ◈ ভারতীয় ভিসা নিয়ে হাইক‌মিশনের জরুরি সতর্কবার্তা ◈ ৮৪৫ কোটি টাকায় বার্সেলোনায় রদ্রি ◈ ঢাকা-চট্টগ্রামসহ চার রুটে লংমার্চ, সর্বাত্মক সফলতার আহ্বান জামায়াতের

প্রকাশিত : ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:১১ রাত
আপডেট : ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মোংলায় এফআরএসইউ স্থাপনের উদ্যোগ, ১২ মিটার নাব্যতায় মোংলা বন্দরকে আধুনিকায়নের পরিকল্পনা

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে যাচ্ছে মোংলা বন্দরকে ঘিরে সরকারের একাধিক উন্নয়ন পরিকল্পনা। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি মোংলায় একটি এফআরএসইউ (Floating Storage and Regasification Unit) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মোংলা বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা সবসময় ১২ মিটার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বড় জাহাজ ও মাদার ভেসেল বন্দরে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় মোংলাকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন উন্নয়ন সম্ভাবনা।

সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এসব পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেলে বাগেরহাট প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি নিয়ে বিগত সরকারের সময়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছিল। এর নেতিবাচক প্রভাব বর্তমানে দেখা যাচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে রাতারাতি এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন।

মোংলায় এফআরএসইউ স্থাপনের উদ্যোগ

দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোংলায় একটি এফআরএসইউ স্থাপনের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামে বর্তমানে দুটি এফআরএসইউ রয়েছে। এর একটি মোংলায় স্থাপন করা ন্যায্য। এটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলসহ তিনটি বিভাগের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এফআরএসইউ স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে আকরাম পয়েন্টসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় নাব্যতা ও অন্যান্য বাস্তবিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এফআরএসইউ স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে আশ্বাস দেন মন্ত্রী।

জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ জ্বালানি অবকাঠামো ও বন্দর সক্ষমতা একসঙ্গে বাড়ানো গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

১২ মিটার নাব্যতায় আধুনিক মোংলা বন্দর

মোংলা বন্দরকে আরও আধুনিক ও কার্যকর বন্দরে পরিণত করতে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা সবসময় ১২ মিটার রাখার পরিকল্পনার কথা জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী।

তিনি বলেন, নাব্যতা ১২ মিটার রাখা সম্ভব হলে মাদার ভেসেল ও বড় জাহাজগুলো মোংলা বন্দরে প্রবেশ করতে পারবে। এতে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মোংলার গুরুত্বও আরও বৃদ্ধি পাবে।

মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে মোংলা বন্দর প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ ভূমিকা রাখছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন ও সক্ষমতা বাড়ানো গেলে এই অবদান ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত নাব্যতা ধরে রাখা গেলে বড় জাহাজের আগমন বাড়বে, পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।

অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে ৮৫ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

মোংলা বন্দর এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বন্দর এলাকায় একটি অর্থনৈতিক জোন হবে, যা একটি চীনা কোম্পানি করবে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৮৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

অর্থনৈতিক অঞ্চল, বন্দর সম্প্রসারণ, নাব্যতা বৃদ্ধি ও উন্নত সড়ক যোগাযোগ—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে মোংলা ও আশপাশের এলাকায় শিল্পায়নের গতি বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধিও বিস্তৃত হতে পারে।

সাংবাদিকদের উন্নয়ন হতে হবে অনুসন্ধানে

সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

তিনি বলেন, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় যেমন বিচ্যুতি হয়েছে, তেমনি সাংবাদিকদের মধ্যেও কিছু বিচ্যুতি হয়েছে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। বর্তমানে সাংবাদিকতার বিস্তৃতি যেভাবে বাড়ছে, তা নিয়ে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

মন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকদের উন্নয়ন অর্থ-বিত্তে ও সম্পদে নয়, সাংবাদিকদের উন্নয়ন হবে মননে। ব্যবসায়ীদের উন্নয়ন হয় অর্থে, প্রযুক্তির উন্নয়ন হয় বিজ্ঞানে আর সাংবাদিকদের উন্নয়ন হয় অনুসন্ধানে।

বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাইদ শুনুর সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ, বাগেরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মাদ জাকির হোসেন, বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত হোসেন লিটন প্রমুখ।

বাগেরহাটে ১০ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণ কাজের উদ্বোধন

এর আগে সোমবার দুপুরে বাগেরহাট শহরের দশানী এলাকায় দশানী-রামপাল-মোংলা জেলা মহাসড়কের দশানী থেকে গিলাতলা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ, বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলিম, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার, জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন, সড়ক বিভাগ বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা।

নামফলক উন্মোচনের পর সড়কের কাজের সফলতা কামনা করে মন্ত্রী নিজেই মোনাজাত করেন।

মন্ত্রী বলেন, এই সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজ শুরু হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, খুব ভালোভাবে কাজ শেষ হবে। বাগেরহাটে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব সড়কের কাজও করা হবে। জনগণের উন্নয়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

ঠিকাদারের গাফিলতিতে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল কাজ

বাগেরহাট-দশানী-রামপাল-মোংলা পর্যন্ত ৩৪ কিলোমিটার সড়কের কাজ চারটি প্যাকেজে ২০২১ সালে শুরু হয়। এর মধ্যে দশানী থেকে হেলাতলা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সড়কের কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল।

সম্প্রতি পুরোনো ঠিকাদারের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়েছে সড়ক বিভাগ। মাফুজ খান লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৭২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ কিলোমিটার সড়কের কাজ বাস্তবায়ন করছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৭ সালের জুন মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়

সোমবার বিকেলে জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

দিনব্যাপী কর্মসূচিতে মোংলা বন্দর, জ্বালানি নিরাপত্তা, সড়ক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক উঠে আসে। সবগুলো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মোংলায় এফআরএসইউ স্থাপন, ১২ মিটার নাব্যতা নিশ্চিত, বড় জাহাজ চলাচলের সুযোগ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন—সব মিলিয়ে সুন্দরবনঘেঁষা এই অঞ্চলের উন্নয়নে নতুন দিগন্তের সূচনা হতে পারে। এর প্রভাব শুধু মোংলা বন্দরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাগেরহাটসহ গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়