উত্তরাঞ্চলের মানুষের বহুদিনের স্বপ্ন ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর। একসময় অভ্যন্তরীণ আকাশপথে যোগাযোগের অন্যতম সম্ভাবনাময় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বিমানবন্দরটি দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। রানওয়ের ওপর জন্মেছে ঘাস। জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে টার্মিনাল ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা।
চলতি বছরের ২০ মে ঠাকুরগাঁওয়ের পরিত্যক্ত বিমানবন্দর পরিদর্শন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা) এবং প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তারা বিমানবন্দরের বর্তমান অবস্থা ঘুরে দেখেন এবং দ্রুত এটি চালুর বিষয়ে আশ্বাস দেন। সেই ঘোষণার পর আবারও আশায় বুক বাঁধছেন ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার মানুষ।
১৯৪০ সালে ৫৫০ একর জমির ওপর নির্মিত হয় ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বিমানবন্দরের জমি ‘আর্মি স্টেট’ হিসেবে ঘোষণা দিলে ১১১ একর জমি বুঝে পায় সিভিল অ্যাভিয়েশন। এই ১১১ একর জমির ওপরে বিমানবন্দরের ভবন ও রানওয়ে অবস্থিত।
‘১৯৪০ সালে ৫৫০ একর জমির ওপর নির্মিত হয় ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বিমানবন্দরের জমি ‘আর্মি স্টেট’ হিসেবে ঘোষণা দিলে ১১১ একর জমি বুঝে পায় সিভিল অ্যাভিয়েশন। এই ১১১ একর জমির ওপরে বিমানবন্দরের ভবন ও রানওয়ে অবস্থিত’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করেছিল বিমানবন্দরটি। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় বিমানবাহিনী এখানে হামলা করলে বিমানবন্দরটির রানওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীনের পর বাণিজ্যিক কাজ পরিচালনা করার জন্য বিমানবন্দরটি ১৯৭৭ সালে সংস্কার করা হয়। দীর্ঘদিন বাণিজ্যিক ফ্লাইটও পরিচালিত হয় এই বন্দরে। কিন্তু ১৯৮০ সালে যাত্রী সংখ্যা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরটি কার্যত পরিত্যক্ত। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে রানওয়ে ও অবকাঠামো।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানবন্দর
ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুরসহ আশপাশের জেলার মানুষের রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে সড়কপথে ঢাকা যেতে ১০-১২ ঘণ্টা সময় লাগে। ট্রেনেও দীর্ঘ ভ্রমণ করতে হয়। বিমানবন্দর চালু হলে মাত্র ৫০-৬০ মিনিটেই রাজধানীতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। ব্যবসায়ী, রোগী, শিক্ষার্থী, সরকারি কর্মকর্তা, প্রবাসী পরিবারের সদস্যসহ সব শ্রেণির মানুষ এর সুফল পাবেন।
ঠাকুরগাঁও দেশের অন্যতম কৃষি সমৃদ্ধ জেলা। এখানে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে আলু, ধান, গম, ভুট্টা, আম, লিচু, সরিষা ও বিভিন্ন সবজি উৎপাদিত হয়। বর্তমানে দ্রুত পরিবহন সুবিধার অভাবে অনেক কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারে না। ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। বিমানবন্দর চালু হলে উচ্চমূল্যের ও দ্রুত নষ্ট হওয়া কৃষিপণ্য অল্প সময়ে ঢাকাসহ দেশের বড় বড় বাজারে পাঠানো যাবে। ভবিষ্যতে কার্গো সুবিধা চালু হলে বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে কৃষকের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষিভিত্তিক শিল্পও গড়ে উঠবে।
‘ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুরসহ আশপাশের জেলার মানুষের রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে সড়কপথে ঢাকা যেতে ১০-১২ ঘণ্টা সময় লাগে। ট্রেনেও দীর্ঘ ভ্রমণ করতে হয়। বিমানবন্দর চালু হলে মাত্র ৫০-৬০ মিনিটেই রাজধানীতে পৌঁছানো সম্ভব হবে’
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কৃষক মো. আব্দুল কাদের জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর অনেক আলু, ভুট্টা, আম, লিচু ও বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করি। কিন্তু দ্রুত পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় ন্যায্য দাম পাই না। ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু হলে অল্প সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিপণ্য পাঠানো সম্ভব হবে।’
সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে অনেক বিনিয়োগকারী আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বিমানবন্দর চালু হলে শিল্প কারখানা স্থাপন, কোল্ড স্টোরেজ, লজিস্টিক হাব, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, হোটেল ও সেবাখাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
ঠাকুরগাঁও চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি আরমান হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু হলে জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়বে। কৃষিভিত্তিক শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ, লজিস্টিক হাব, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, হোটেল ও পর্যটন খাতে নতুন নতুন বিনিয়োগ আসবে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, ব্যবসার পরিধি বাড়বে এবং জেলার অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। বিমানবন্দরটি চালু হলে ঠাকুরগাঁও উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।’
‘সম্প্রতি বিমানবন্দর পরিদর্শনের সময় আমরা অবকাঠামো, রানওয়ে ও প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজ পর্যালোচনা করেছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিমানবন্দরটি চালুর লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে’—বিমানমন্ত্রী
পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
উত্তরাঞ্চলে পর্যটনের সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে। পঞ্চগড়ের চা-বাগান, কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন, ঠাকুরগাঁওয়ের টাঙ্গন ব্যারেজ, নেকমরদ প্রত্নস্থল, হরিপুর রাজবাড়ি, রানীশংকৈলের ঐতিহাসিক স্থাপনাসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে। বিমানবন্দর চালু হলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা সহজেই এই এলাকায় আসতে পারবেন। এতে পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙা হবে।
ভ্রমণপিপাসু ও পর্যটন উদ্যোক্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু হলে উত্তরাঞ্চলের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকরা খুব অল্প সময়ে এখানে পৌঁছাতে পারবেন। এতে টাঙ্গন ব্যারেজ, নেকমরদ প্রত্নস্থল, হরিপুর রাজবাড়িসহ ঠাকুরগাঁওয়ের দর্শনীয় স্থানগুলোতে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়বে। পাশাপাশি পঞ্চগড়ের চা-বাগান ও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আসা পর্যটকরাও সহজে এই অঞ্চলে ভ্রমণ করতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘পর্যটক বাড়লে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, হস্তশিল্প ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটবে, যা সামগ্রিকভাবে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষা ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নিতে ঢাকায় যান। আবার জটিল রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে নিতে হয়। বিমান চালু হলে জরুরি রোগী দ্রুত চিকিৎসা পাবেন। শিক্ষার্থী ও চাকরীপ্রার্থীদের ভোগান্তিও কমে যাবে। যদিও ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, কিন্তু সেগুলো দৃশ্যমান ও বাস্তবায়ন সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।
ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—উভয় খাতেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে জানান শিক্ষাবিদ মনতোষ কুমার দে।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা, চাকরির পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন একাডেমিক কাজে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করেন। দ্রুত বিমান যোগাযোগ চালু হলে তাদের সময়, খরচ ও ভোগান্তি অনেকটাই কমে যাবে। একইভাবে জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হবে, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
এই শিক্ষাবিদের ভাষ্য, ঠাকুরগাঁওয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম শুরু হলেও সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সময় লাগবে। তাই বিমানবন্দর চালু হলে এই অঞ্চলের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সার্বিক উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাড়বে কর্মসংস্থান
বিমানবন্দর চালু হলে শুধু বিমান চলাচলই শুরু হবে না, এর সঙ্গে যুক্ত হবে শত শত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান। নিরাপত্তাকর্মী, গ্রাউন্ড স্টাফ, প্রকৌশলী, পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, ট্রাভেল এজেন্সি, কার্গো সার্ভিস, পর্যটন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বাসিন্দা রাকিব হাসান বলেন, ‘আমাদের মতো অনেক শিক্ষিত তরুণ চাকরির অভাবে বেকার বসে আছি। বিমানবন্দর চালু হলে শুধু বিমানবন্দরেই নয়, এর আশপাশে গড়ে ওঠা হোটেল, পরিবহন, কার্গো, পর্যটন ও বিভিন্ন সেবাখাতেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এতে আমাদের মতো তরুণরা নিজ জেলাতেই কাজের সুযোগ পাবেন। আমাদের দাবি, বিমানবন্দরটি যেন দ্রুত চালু করা হয়।’
ঠাকুরগাঁও চেম্বার অব কমার্সের নির্বাহী পরিচালক রোফিকুল ইসলাম রোহান জাগো নিউজকে বলেন, ‘উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়। বিমানবন্দর চালু হলে উত্তরাঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ আসবে।’
অপেক্ষা বাস্তবায়নের
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকার ও জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর আশ্বাস মিললেও তা বাস্তবে রূপ পায়নি। তবে এবার নির্বাচনের সময় ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বর্তমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে চলতি বছরের ২০ মে ঠাকুরগাঁওয়ের পরিত্যক্ত বিমানবন্দর পরিদর্শন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা) এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু করা আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার। উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।’
তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরটি চালু হলে ঠাকুরগাঁওসহ আশপাশের জেলার অর্থনীতি, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।’
ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে বলে জানান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা।
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি বিমানবন্দর পরিদর্শনের সময় আমরা অবকাঠামো, রানওয়ে ও প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজ পর্যালোচনা করেছি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিমানবন্দরটি চালুর লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
সূত্র: জাগো নিউস ২৪