চব্বিশের অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিন কিছু মানুষের হামলা ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত কুমিল্লার বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন দুই বছরেও ক্ষত কাটিয়ে সচল হতে পারেনি।
সমতটের ঐতিহ্যের এই স্মারক প্রায় দেড়শত বছর পুরনো মিলনায়তন ও পাঠাগার সংস্কারের কাজ এক বছর আগে হাতে নিলেও এখনো ব্যবহার অনুপযোগী।
মিলনায়তনটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রতিনিয়ত মুখর থাকলেও; এখন একেবারেই নিরব। পাঠাগারের বইয়ের আলমারিগুলো মেরামত ও রং করে রাখা হলেও তাকে নেই বই। ধুলোবালি মাখা টেবিলে বসেই দৈনিক পত্রিকা পড়েন পাঠকরা।
ঠিকাদারের গাফিলতিতে টাউন হলের সংস্কার কাজ খুবই ধীর গতিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও মিলনায়তনের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা। তারা দ্রুত সংস্কারের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ব্যবস্থাপনা কমিটিতে পদাধিকারবলে সভাপতি হিসেবে রয়েছেন জেলা প্রশাসক রোজি আক্তার। তিনি নবাগত হওয়ায় তার পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “অগাস্ট মাসের ১৫-২০ তারিখের মধ্যে উদ্বোধন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন ঠিকাদার।
“তবে এরপর সাউন্ড এবং মঞ্চ লাইটিংয়ের কাজ বাকি থাকবে। আমরা ঠিকাদারকে বারবার বলছি যেন কাজটি সময়মত শেষ করেন।”
১৮৮৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক এফ এইচ স্ক্রাইন ত্রিপুরা জেলার চাকলা রোশনাবাদের জমিদার নরেশ মহারাজ বীরচন্দ্র মানিক্য বাহাদুরের কাছে পাঠাগারের জন্য জমিদানের অনুরোধ জানান। মহারাজ কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ে ১০ বিঘা জমির উপর নিজস্ব অর্থায়নে একটি ভবন করে দেন।
১৮৮৫ সালের ৬ মে প্রতিষ্ঠিত ভবনটি কুমিল্লার বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন নামে পরিচিতি পায়। এ ছাড়া ১৯৩৩ ও ২০০৩ সালে এই ভবনটির সংস্কার করা হয়। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এখানকার লাইব্রেরিতে অন্তত ৩০ হাজার মূল্যবান বই সংরক্ষিত ছিল।
নামাজের স্থান, মুক্তিযোদ্ধা কর্নার ছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল দ্বিতলবিশিষ্ট মিলনায়তন; যা মূলত ‘টাউন হল’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া নির্মাণশৈলী ভবনটিকে কুমিল্লার স্মারক হিসেবে তুলে ধরে। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রামসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ টাউন হল।
পাঠাগারের লাইব্রেরিয়ান মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, হামলায় ১১ হাজার বই ধ্বংস হয় ও খোয়া যায়। ৭৫টি আলমারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; যার মধ্যে অন্তত ২০টি একেবারে বিনষ্ট হয়। কম্পিউটার ও স্টিলের আলমারিসহ নথিপত্র নষ্ট হয়। মিলনায়তনের চেয়ার, এসি, ফ্যান, কাঠের দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনায় থানায় একটি জিডি করা হয়েছে।
একবছর পর ২০২৫ সালের মে মাসে জেলা পরিষদের অর্থায়নে টাউন হলের সংস্কার কাজ শুরু হয়। মেসার্স প্যারেন্ট অ্যান্ড সন্স ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে টেন্ডারের মাধ্যমে উন্নয়ন কাজের দায়িত্ব পায়। আগামী অগাস্টে তাদের কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে।
শরীফুল ইসলাম বলেন, টাউন হল এখনও ব্যবহার উপযোগী হয়নি। স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর কাছে বই ও আসবাবপত্রের চাহিদার আবেদন দেওয়া হয়েছে। টাউন হল মিলনায়তনের দ্রুত সংস্কার শেষ হওয়ার পর পুরোদমে কাজ শুরু করা যাবে।
প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে সাতজন কাজ করেন। এর মধ্যে একজন লাইব্রেরিয়ান ও একজন সহকারী লাইব্রেরিয়ান। এ ছাড়া কেয়ারটেকার, দারোয়ান, সুইপার রয়েছেন। মিলনায়তনে আগে ৪৫০টি চেয়ার ছিল, বর্তমানে ৩৬৮টি চেয়ার বসবে। আগে ছিল ৬৪ টন এসি, বর্তমানে ৫ টনের ৯টায় ৪৫ টন এসি লাগানো হচ্ছে। আগে ছিল ৯৮টি ফ্যান, বর্তমানে লাগানো হবে ৩৯টি।
বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম শান্ত বলেন, কুমিল্লার যে কোনো গণআন্দোলন ও দাবি আদায়ের কেন্দ্রস্থল এই টাউন হল। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যে কোনো কর্মসূচিতে টাউন হলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য কুমিল্লার পরিচয় বহন করে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানটির মেরামত ও সংস্কার নিয়ে যত টালবাহানা। দুই বছর যাবত কুমিল্লার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি- যেগুলো টাউন হল মিলনায়তনে হওয়ার কথা ছিল সেগুলো বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
জহিরুল ইসলাম শান্ত বলেন, “দুঃখের বিষয় হচ্ছে, পাঠাগার থেকে যেসব বই লুট হয়ে গেল, সেগুলো আর ফেরানো গেল না। যা গেছে তা যদি ফিরে না আসে, তারপরও সরকারি উদ্যোগে এই সমৃদ্ধ পাঠাগারটি আবারও ভরপুর হতে পারত। বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন শুধু কোনো ইট-পাথরের দালান নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব ও পরিচয়।”
বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব মো. সাজ্জাদুল কবির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম, নির্ধারিত সময়ে টাউন হলের সব ধরনের সংস্কার কাজ যেন শেষ হয়। কিন্তু এক দফা সময় বাড়িয়েও দ্বিতীয় দফার সময়ে পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হবে কিনা এ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও মিলনায়তন ব্যবহার করার জন্য মানুষ মুখিয়ে আছে, কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি।”
তিনি বলেন, “ঠিকাদার কাজ ধীর গতি করেছে, আর তাদের জন্য কথা শুনতে হচ্ছে আমাদের। আমরা চাই, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বিষয়টি আরও নজর দিয়ে দেখবে।”
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স প্যারেন্ট অ্যান্ড সন্সের পক্ষে নিয়োজিত প্রকৌশলী লয়েট সরকার বলেন, ২০২৬ সালের অগাস্ট পর্যন্ত সংস্কার কাজের সময় বর্ধিত করা হয়েছে। টেন্ডার হয়েছিল ২০২৫ সালের মার্চ মাসে। দুই কোটি ৭৫ লাখ টাকায় প্রাথমিক টেন্ডারে কাজ শুরু হয় এবং সংশোধিত বাজেটে এটি তিন কোটির বেশি হচ্ছে। জেলা পরিষদ এর অর্থায়ন করছে। বর্তমানে পুরোদমে কাজ চালু আছে।
কাজের স্থবিরতার বিষয়ে প্রকৌশলী লয়েট সরকার বলেন, “আমরা কাজ করতে গিয়ে দেখেছি- আরও নতুন নতুন সমস্যা বের হচ্ছে। আমাদের সেগুলোও করতে হচ্ছে। তবে অগাস্টের মধ্যেই কাজ শেষ করতে পারব।”
সূত্র : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম