নোয়াখালী প্রতিনিধি: নোয়াখালীর এক বিএনপি নেতাকে ঢাকায় পরিকল্পিতভাবে অপহরণের পর একটি বহুতল ভবনের কক্ষে অবরুদ্ধ রেখে জোরপূর্বক অশ্লীল ছবি ও ভিডিও ধারণ, এরপর ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর আদায়ের মাধ্যমে হানিট্র্যাপ ও ব্ল্যাকমেইলের এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে যুব মহিলা লীগ নেত্রী নাজমুন নাহার পারভীনের বিরুদ্ধে।
শুক্রবার দুপুরে নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার জনতা বাজারের স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ে ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন এসব অভিযোগ তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে মোশারফ হোসেন বলেন, শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ১০ রমজানে তিনি ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে যান। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পর দুইজন ব্যক্তি এসে তাকে বলেন, “ভাই, আপনার বাড়ি ধানসিঁড়ি ইউনিয়নে না? আপনি কি বিএনপির সেক্রেটারি মোশারফ মেম্বার?” তিনি তাদের কথায় সাড়া দিলে তারা তাকে চা খাওয়ার প্রস্তাব দেন। পরে চায়ের দোকানে যাওয়ার কথা বলে পিছন থেকে অস্ত্র ঠেকিয়ে তাকে গাড়িতে তুলে একটি বহুতল ভবনের কক্ষে নিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখে।
মোশারফ হোসেনের অভিযোগ, কিছুক্ষণ পর একজন হিজড়া নারীকে সঙ্গে নিয়ে ওই কক্ষে প্রবেশ করেন নোয়াখালী জেলা যুব মহিলা লীগের সদস্য ও সেনবাগ উপজেলা যুব মহিলা লীগের আহ্বায়ক নাজমুন নাহার পারভীন। কক্ষে ঢুকেই তিনি উত্তেজিত হয়ে গালিগালাজ শুরু করেন এবং বলেন, “৫ আগস্টের পর বিএনপি আমার বাসাবাড়ি লুট করে আমাকে নোয়াখালী থেকে বিতাড়িত করেছে, ওকে ধর।” এরপর তারা জোরপূর্বক তার পরনের শার্ট ও প্যান্ট খুলে ওই হিজড়া নারীকে পাশে দাঁড় করিয়ে অশ্লীল ছবি ও ভিডিও ধারণ করে।
তিনি বলেন, এ সময় তিনি বাধা দিলে তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সামনে কিছু ইয়াবা ট্যাবলেট রেখে হুমকি দেওয়া হয়- “কথা বললে গুলি করে দেব, না হলে ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে তুলে দেব।” পরে নিরুপায় হয়ে তিনি চুপ থাকেন। একপর্যায়ে তার মোবাইল থেকে এনআইডি কার্ড নিয়ে ৩০০ টাকার ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, প্রথমে তার কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে তার কাছে থাকা নগদ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়া হয় এবং ৪৭ মিনিটের মধ্যে তাকে দিয়ে ফোন করিয়ে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে আরও ৯০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। বাকি টাকা পরিশোধের শর্তে ঘটনাটি কাউকে জানালে তাকে প্রাণে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়।
মোশারফ হোসেন অভিযোগ করেন, পরবর্তীতে পারভীন ও তার চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন সময় হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে টাকা দাবি করতে থাকে। তিনি একাধিকবার বিভিন্ন অঙ্কের টাকা পরিশোধ করেন। সাম্প্রতিক সময়ে তারা পুনরায় টাকা চাইলে তিনি দিতে ব্যর্থ হন। পরে একাধিক ফেসবুক আইডি থেকে ওই ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্মান ক্ষুণ্ন করা হয়। এ বিষয়ে তিনি কবিরহাট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলেও জানান।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার দল বিএনপির নাম ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানান এবং অভিযুক্ত নাজমুন নাহার পারভীনকে দ্রুত গ্রেফতার করে শাস্তির দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুস ছালাম মেম্বার, যুবদলের আহ্বায়ক মো. সালাউদ্দিন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রেদোয়ান হোসেন সুমন, সেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আব্দুর রহিম, যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেনসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় নেতৃবৃন্দ বলেন, নলুয়া আশ্রয়ন প্রকল্পের সাধারণ বাসিন্দা থেকে নাজমুন নাহার পারভীনের উত্থান শুরু হয়। ২০১০ সালের দিকে তিনি নোয়াখালী শহরের হাউজিং এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করে যুব মহিলা লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অল্প সময়ে নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন। তারা অভিযোগ করেন, প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে বিপুল অর্থ-সম্পদ অর্জন করেছেন তিনি এবং একাধিক ব্যক্তিকে বিয়ের ফাঁদে ফেলে সর্বস্বান্ত করেছেন।
তারা আরও বলেন, গত ৫ আগস্টের পর নানা অভিযোগের মুখে তিনি নোয়াখালী ছেড়ে ঢাকায় যান এবং সেখানে একটি সংঘবদ্ধ হানিট্র্যাপ চক্র গড়ে তোলেন। এই চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ফাঁদে ফেলে অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে তারা দাবি করেন।
নেতৃবৃন্দ দ্রুত অভিযুক্ত ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।