মো. কামরুল ইসলাম, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)প্রতিনিধি : একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রামবাংলায় সহজলভ্য ছিল দেশীয় ফল ডেউয়া। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফল ছিল গ্রামের মানুষের মৌসুমি খাদ্যতালিকার পরিচিত অংশ। শিশু-কিশোরদের শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠান এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ডেউয়া এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে উপজেলার হাতে গোনা কয়েকটি গ্রাম ছাড়া খুব একটা দেখা মেলে না এই ফলের গাছ। অঞ্চলভেদে ডেউয়া ফলটি ডেওয়া, ডেউফল, বনকাঁঠাল, ঢেউয়া কিংবা ডহুয়া নামেও পরিচিত।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, একসময় বর্ষা ও গ্রীষ্ম মৌসুমে গ্রামের বাড়ির আঙিনা, রাস্তার পাশ, খোলা জমি ও বাগানে স্বাভাবিকভাবেই জন্মাত ডেউয়া গাছ। ডেউয়া ছাড়াও গাব, ডুমুর, আতা, মেওয়াসহ নানা দেশীয় ফল ছিল সহজলভ্য। মৌসুম এলেই শিশু-কিশোরেরা গাছের নিচে পড়ে থাকা পাকা ডেউয়া কুড়িয়ে খেত। কাঁচা ফল লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়া হতো, আর পাকা ফল দিয়ে তৈরি হতো আচার, চাটনি ও নানা মুখরোচক খাবার।
ডেউয়া দেখতে কিছুটা কাঁঠালের মতো হলেও এর স্বাদ ও গন্ধ ভিন্ন। কাঁচা অবস্থায় টক এবং পাকা হলে টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফল বেশ জনপ্রিয় ছিল গ্রামীণ জনপদে। তবে সময়ের পরিবর্তন, নগরায়ণ, বন-জঙ্গল উজাড়, বসতবাড়ি নির্মাণ এবং বিদেশি ফলের প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ায় দেশীয় এই ফলের গাছ দ্রুত কমে যাচ্ছে।
উপজেলার শ্রীঘর গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “ছোটবেলায় প্রায় প্রতিদিনই বন্ধুদের নিয়ে ডেউয়া কুড়িয়ে খেতাম। তখন প্রায় প্রতিটি গ্রামেই এই গাছ ছিল। এখন খুব কম দেখা যায়। বর্তমান প্রজন্মের অনেক ছেলে-মেয়ে ডেউয়া চিনেই না।”
একই গ্রামের গৃহিণী মিলি বেগম বলেন, “ডেউয়া পাকার সময় বাড়িতে আচার বানানো হতো। এই ফলের স্বাদ অন্য কোনো ফলে পাওয়া যায় না। এখন গাছ কমে যাওয়ায় আগের মতো আর পাওয়া যায় না।”
সরেজমিনে দেখা যায়, নবীনগর উপজেলার কয়েকটি গ্রামে এখনও কিছু পুরোনো ডেউয়া গাছ টিকে আছে। মৌসুমে স্থানীয় হাট-বাজারে সীমিত পরিসরে ফলটি বিক্রি হলেও আগের মতো আর সহজলভ্য নয়। অনেক তরুণ-তরুণী এই ফলের নামও জানেন না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে রাস্তার পাশ, পতিত জমি ও বাড়ির আঙিনায় স্বাভাবিকভাবেই জন্মাত ডেউয়া গাছ। এখন এসব জায়গায় ঘরবাড়ি, দোকান কিংবা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ হওয়ায় গাছের সংখ্যা কমে গেছে। পাশাপাশি দেশীয় ফলের গাছ লাগানোর প্রবণতাও আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, “ডেউয়া একটি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ দেশীয় ফল। এতে ভিটামিন, খনিজ ও খাদ্যআঁশ রয়েছে। দেশীয় ফল সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষকে বেশি করে এসব গাছ রোপণে উৎসাহিত করতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশীয় ফলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।”
পুষ্টিবিদদের মতে, ডেউয়ায় রয়েছে ভিটামিন বি ও সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, জিংক এবং খাদ্যআঁশ। এসব উপাদান রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে, হজমশক্তি উন্নত করতে এবং শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, দেশীয় ফল সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বাড়ির আঙিনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তার পাশ ও খাসজমিতে ডেউয়া গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হলে হারিয়ে যেতে বসা এই ফলকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
একসময় গ্রামবাংলার পরিচিত মুখ ছিল ডেউয়া। সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিত দৃশ্য হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের আশা, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সচেতনতা বাড়লে আবারও গ্রামবাংলার প্রকৃতিতে ফিরে আসবে হারিয়ে যেতে বসা এই দেশীয় ফল।