এম এ কুদ্দুস, বিরল (দিনাজপুর) প্রতিনিধি : রাস্তার ধুলোবালি আর অনিশ্চয়তা যাঁদের নিত্যসঙ্গী, সমাজ তাঁদের নাম দিয়েছে 'মানসিক ভারসাম্যহীন'। তেমনই এক নামপরিচয়হীন অসহায় নারীর কোল আলো করে গত ৫ জুন ভোরে দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলা স্বাস্থ্য কমেেপ্লক্সে জন্ম নিয়েছিল এক ফুটফুটে পুত্র সন্তান। জন্মের পর থেকেই শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে যে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, অবশেষে তার অবসান ঘটেছে। সব আইনি প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে শিশুটিকে তুলে দেওয়া হয়েছে এক স্নেহময়ী দম্পতির (বিকল্প পরিচর্যাকারী) কোলে।
উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের বরহানগর এলাকায় সম্প্রতি প্রায় ১০ দিন ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী এক গর্ভবতী নারী। তাঁর পরনে ছিল জীর্ণ পোশাক, মুখে ছিল না কোনো স্পষ্ট ভাষা। গত ৪ জুন রাতে হঠাৎ তাঁর তীব্র প্রসব ব্যাথা শুরু হয়। বিষয়টি স্থানীয় বাসিন্দা মোছা: রিতার চোখে পড়লে তিনি কালবিলম্ব না করে প্রতিবেশীদের সহায়তায় পরদিন ভোরে ওই নারীকে বিরল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। সেখানে চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জন্ম নেয় এক সুস্থ ও সুন্দর ছেলে শিশু।
পরিচয়হীন মায়ের এই সন্তানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। শিশুটিকে এক নজর দেখতে এবং নিজের সন্তানের মতো লালন-পালনের দায়িত্ব নিতে হাসপাতালে ভিড় জমান শত শত মানুষ। নিঃসন্তান অনেক দম্পতি শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার আকুল আবেদন নিয়ে ছুটে যান বিরল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা ভারসাম্যহীন মা হয়তো পৃথিবীর অনেক নিয়ম বোঝেন না, কিন্তু সন্তানের প্রতি তাঁর অবুঝ মমতার কোনো কমতি ছিল না। তবে নিজের ভরণপোষণের সামর্থ্য না থাকায় এবং শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রশাসন আইনি পন্থায় বিকল্প অভিভাবক খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু করে।
শিশুটির সুন্দর ভবিষ্যৎ, সঠিক শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন ও শিশু কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে আবেদনসমূহ যাচাই-বাছাই করা হয়। সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অবশেষে এক যোগ্য ও স্নেহশীল বিকল্প পরিচর্যাকারী দম্পতির কাছে শিশুটিকে হস্তান্তর করা হয়েছে। হস্তান্তরের সেই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল হাসপাতালের এক কোণে এক অসহায় মায়ের কোলে, সে আজ থেকে এক নতুন পরিবারের চোখের মণি। নতুন বাবা-মা শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন, নিজেদের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসায় আগলে রাখবেন এই উপহারকে।
এদিকে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো: রাজুল ইসলাম জানান, নবজাতকের নতুন ঠিকানা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জন্মদাত্রী অসহায় মা যেন সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পান, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। বিরলের এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল পৃথিবীতে নামপরিচয় বা রক্তের বন্ধনই শেষ কথা নয়; মানবিকতা, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের মাধ্যমে যেকোনো দেওয়াল ভেঙে একটি শিশুর জন্য সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজাউল ইসলাম, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: পার্থ জময় সরকার, হাসপাতালের নার্স ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।