এম আর আমিন, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম নগরজুড়ে মশার উপদ্রব, বাড়ছে জনভোগান্তি। প্রায় সব এলাকায় মশার উপদ্রব উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে মশার উৎপাত এতটাই বেড়েছে যে দিনের বেলাতেই মশার যন্ত্রণা শুরু হয়। আর সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এর উপদ্রব আরও তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে ঘরের ভেতর-বাইরে সর্বত্রই মশার উৎপাত সহ্য করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে নানা ধরনের ভোগান্তি।
বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে সেহেরি ও ইফতারের সময় মশার যন্ত্রণায় অনেকেই চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেক পরিবারের সদস্যরা জানান, মশার কারণে নির্বিঘ্নে বসে সেহেরি বা ইফতার করাও এখন কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই প্রতিদিন মশার কয়েল, স্প্রে কিংবা ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহার করছেন।
নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, ড্রেন, নালা-নর্দমা ও জলাবদ্ধ স্থানে মশার বংশবিস্তার বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং কিছু স্থানে জমে থাকা পানিও মশার বংশবৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।
নগরীর প্রতিটি এলাকায় আগে সন্ধ্যার দিকে কিছুটা মশার উপদ্রব থাকলেও এখন দিনের বেলাতেও ঘরের ভেতর ও বাইরে মশার উৎপাত দেখা যাচ্ছে। ফলে ছোট শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা বেশি কষ্ট পাচ্ছেন।চসিকের নগরীর বেশির ভাগ এলাকায় কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে মশার উপদ্রব বাড়তে থাকায় ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন নগরবাসী। তাদের মতে, সময়মতো কার্যকর মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার না করলে সামনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সৃত্রে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় ক্র্যাশ প্রোগ্রাম। চলতি বছরেও তা অব্যাহত আছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ওষুধ ছিটানোর কথা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে।
তবে কিন্তু নগরবাসীর অভিযোগ পরিচ্ছন্নকর্মীদের দেখা মেলে না। এবছর মার্চ মাস চললেও নগরীর বড় অংশেই চসিক কর্মীদের পা পড়েনি। দেখা যায়নি মশক নিধনের কার্যকর তৎপরতা।
নগরবাসীর অভিযোগ,নগরের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। মার্চ হতে চললেও নগরীর বড় অংশেই এখনো চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পরিচ্ছন্নকর্মীদের তেমন উপস্থিতি চোখে পড়েনি। ফলে ড্রেন ও আশপাশের পরিবেশ অপরিষ্কার থাকায় মশার উপদ্রব দিন দিন বাড়ছে।চসিকের বড় পরিসরে ফগার মেশিন নিয়ে ওষুধ ছিটানোর দৃশ্য চোখে তেমন পড়ে না।
তবে চসিক বরাবরের মতো দাবি করে আসছে, ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চলছে। ছিটানো হচ্ছে মশক নিধনের নতুন ও পুরোনো ওষুধ। পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মীরা ওয়ার্ড ভিত্তিক কার্যক্রম নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গত বছরের ১ ডিসেম্বর নগরীর ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ড কার্যালয়ের সামনে দেশে প্রথমবারের মতো মশা নিয়ন্ত্রণে বিটিআই ব্যবহার করে চসিক। পাউডার আকারে এই ওষুধ প্রথমে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানিতে মিশিয়ে ফগার মেশিন দিয়ে নালায় স্প্রে করা হয়। চসিক কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে বিদেশি এই ওষুধের ব্যবহার নিয়মিতভাবেই চলছে।
চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, নগরীতে মশক নিধনে দীর্ঘদিন ধরে লার্ভিসাইড ওষুধ ‘টেমিপোস ফিফটি’ ব্যবহার করা হতো। এর রেজিস্ট্যান্স এখনও ক্রিয়েট হয়নি। চসিক মেয়রের একান্ত ইচ্ছায় এবার বিশ্বের সবচেয়ে দামি ও কার্যকর পরীক্ষিত ইউএসএতে তৈরি ওষুধ ব্যবহার শুরু করা হয়েছে।
বিদেশি নতুন ধরনের এই ওষুধ একবার ছিটালে ১৫ দিন ওই জায়গা নিরাপদ। তবে পুরো নগরীতে ব্যবহারের সক্ষমতা এখনও তৈরি হয়নি। সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুর প্রজনন হয় এমন জায়গায় আপাতত ছিটানো হচ্ছে।
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু আছে কি না জানতে চাইলে চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের ম্যালেরিয়া ও মশক নিধন কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন ১০০ ফগার মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। ২০০ পরিচ্ছন্নকর্মী যুক্ত আছেন মশক নিধনকাজে। নতুন বিদেশি প্রজাতির ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।
নগরীতে মশার উপদ্রব কমাতে আগামী সপ্তাহ থেকে ৪১টি ওয়ার্ডজুড়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে মশক নিধনে বিশেষ ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে সমন্বিতভাবে কাজ করে মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।তিনি বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে কেবল সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে।
চট্টগ্রাম জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তার অনেকটাই বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। সাধারণত প্রতি বছর এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টিপাত বেশি হয় এবং এ সময়ই ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বাড়তে দেখা যায়। তবে গত বছর চট্টগ্রামে প্রায় সারা বছরই বৃষ্টিপাত ছিল। ফলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপও বছরজুড়ে লক্ষ্য করা গেছে।
নগরবাসীর অভিযোগ আশপাশের নালা নর্দমাগুলো ভরাট হয়ে আছে। এখনও বৃষ্টির মৌসুম শুরু হয়নি। দ্রুত এসব পরিষ্কার না করলে এবার গত বছরের চেয়ে বেশি ডেঙ্গুর প্রকোপ হতে পারে।
চসিক পরিচ্ছন্নতা বিভাগ ও মশক নিধন কর্মীদের তদারকির অভাব এবং গাফিলতির কারণে নগরীতে মশার প্রকোপ,অপর্যাপ্ত ওষুধ ছিটানো, অনিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং জনবল সংকটের কারণে নগরবাসী ডেঙ্গু ও মশকজনিত রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মশক নিধনে তৎপরতা জোরদার করা এখন খুবই জরুরি। এতে অন্তত আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে এবং মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও অনেকটা কমানো যাবে।