চট্টগ্রাম প্রতিদিন প্রতিবেদন: চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রম শাখায় নিবন্ধিত প্রায় সাত হাজার শ্রমিক-কর্মচারীকে নিয়মিতভাবে বুকিং দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলোর জিম্মিদশার মুখে বন্দর সচল রাখতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা’ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ডাকা কর্মবিরতিতে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ও রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) বন্দরের কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ার পর কর্তৃপক্ষ আরও কঠোর অবস্থান নেয়।
শ্রম শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, বার্থ অপারেটর, টার্মিনাল অপারেটর ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের অধীনে থাকা নিবন্ধিত শ্রমিকদের সরাসরি বুকিং দেওয়া গেলে শ্রমিক সংগঠনের চাপ এড়িয়ে বন্দরের স্বাভাবিক কাজ চালু রাখা সম্ভব হবে।
শ্রম শাখার চিঠি, নিয়মিত বুকিংয়ের অনুরোধ
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শ্রম শাখা থেকে ৩১ জানুয়ারি তারিখে জারি করা এক চিঠিতে বার্থ, টার্মিনাল ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের কাছে অনুরোধ জানানো হয়, বন্দরের সচলতা বজায় রাখতে শ্রম শাখায় নিবন্ধিত শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়মিতভাবে বুকিং দিতে হবে। চিঠিতে বলা হয়, অপারেশন সচল রাখাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
চিফ ওয়েলফেয়ার অফিসারের স্বাক্ষরিত ওই নথির অনুলিপি বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য, পরিচালক (প্রশাসন), পরিচালক (ট্রাফিক), সচিব, সিঃ ওয়েলফেয়ার অফিসার, ওয়েলফেয়ার অফিসার, বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং এন্ড বার্থ অপারেটরস্ এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান, বার্থ ও টার্মিনাল অপারেটর ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি, সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড এবং চেয়ারম্যানের পিএর কাছেও পাঠানো হয়েছে।
এক মাস সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ
বন্দর এলাকায় আমদানি-রপ্তানি নির্বিঘ্ন রাখতে এক মাসের জন্য সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও মানববন্ধন নিষিদ্ধ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজের স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ০১ মিনিট থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত বন্দরসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং ‘১(ক)’ শ্রেণির অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ এখান দিয়ে সম্পন্ন হয় এবং প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। সভা-সমাবেশের কারণে যানজট সৃষ্টি হলে আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হয়, যা জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ২৯ ও ৩০ ধারার ক্ষমতাবলে বারেক বিল্ডিং মোড়, নিমতলা মোড়, ৩ নম্বর জেটি গেট, কাস্টমস মোড়, সল্টগোলা ক্রসিংসহ বন্দরসংলগ্ন এলাকায় অস্ত্র, লাঠি, বিস্ফোরক বহন এবং সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এ অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।
এদিকে বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত আরেক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অফিস চলাকালে মিছিল, মহড়া বা আন্দোলনে অংশ নিলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপিপন্থীদের নেতৃত্বে আট ঘণ্টা অচলাবস্থা
এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ডাকে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ও রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) কর্মবিরতি পালিত হয়। সকাল আটটা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত স্থায়ী কর্মচারী ও বেসরকারি শ্রমিকদের একাংশ এতে অংশ নেন। ফলে কার্গো বার্থ, সিসিটি ও এনসিটিতে স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়।
এ সময় এনসিটিতে কেবল বেসরকারি ডিপো থেকে আনা রপ্তানি কনটেইনার জাহাজে তোলার কাজ সীমিতভাবে চলে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বন্দরের ভেতরে জাহাজ চলাচল ও নৌ-চ্যানেল স্বাভাবিক ছিল, তবে অপারেশনাল কার্যক্রমে পরিকল্পিতভাবে অচলাবস্থা তৈরির ঘটনা নজরে এসেছে।
এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে করা রুল হাইকোর্ট খারিজ করে দেন।
চার নেতাকে বদলি, তদন্ত কমিটি
কর্মবিরতির কারণে জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ ব্যাহত হওয়ায় নেতৃত্বদানকারী চার কর্মচারীকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনালে বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মবিরতির ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বন্দরের চিফ পারসোনাল অফিসারের স্বাক্ষরিত আদেশে যাদের বদলি করা হয়েছে তারা হলেন অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির, নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন, অর্থ ও হিসাব বিভাগের উচ্চ হিসাব সহকারী মো. আনোয়ারুল আজিম এবং প্রকৌশল বিভাগের এস এস খালাসী মো. ফরিদুর রহমান। চারজনই বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। তাদের রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টার আগে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে।
বন্দরের সদস্য প্রকৌশল কমোডর মো. মাযহারুল ইসলাম জুয়েলকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।