এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি: বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের আদলে বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় গড়ে উঠছে এক অনন্য প্রাকৃতিক বনাঞ্চল—যাকে স্থানীয়রা ডাকছেন ‘মিনি সুন্দরবন’ নামে। প্রবহমান চিত্রা নদীর দুই তীর ঘেঁষে প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বন প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে।
নদীপাড় জুড়ে চোখে পড়ে ছোট-বড় নানা প্রজাতির গাছের সারি। ডালে-ডালে পাখির কলরবে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো নদীপথ। সুন্দরী, গোলপাতা, কেওড়া সহ সুন্দরবনের আদলে গড়ে ওঠা নানা প্রজাতির উদ্ভিদে ঘেরা এই এলাকা যেন মূল সুন্দরবনেরই এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।
সবুজ-শ্যামল এই জনপদের মানুষের জীবনও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেছে। এখানকার মানুষ রাত হলে পাখির ডাকে ঘুমিয়ে পড়েন, আবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পাখির কূজনেই তাদের ঘুম ভাঙে। শীত মৌসুমে দূর-দূরান্ত থেকে আগত অতিথি পাখিরা এই বনকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয়।
এই মিনি সুন্দরবনে দেশীয় প্রজাতির পাখির মধ্যে রয়েছে ঘুঘু, শালিক, টিয়া, মাছরাঙা, পানকৌড়ি, বক, দোয়েল, ঘড়িয়াল, টুনটুনি সহ প্রায় অর্ধশতাধিক প্রজাতির পাখি। শুধু পাখিই নয়, বনের ঝোপঝাড়ের ভেতরে দেখা মেলে বাঘডাসা, খাটাশ, বিষধর সাপ, তক্ষক, বনবিড়াল, শিয়াল, গুঁইসাপসহ নানা বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর।
সুন্দরবনের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই বনটি বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে যাওয়া চিত্রা নদীর দুই কূলে বিস্তৃত। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মেই এখানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে এই বনাঞ্চল, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এ বিষয়ে চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “মিনি সুন্দরবন নামে একটি বনের কথা শুনেছি। সময় নিয়ে সেখানে পরিদর্শনে যাবো। প্রয়োজন হলে বনটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে।”
স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক হরেন্দ্রনাথ মন্ডল, ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোক্তার হোসেন সরদারসহ এলাকাবাসীর অনেকেই বলেন, “যেহেতু সুন্দরবনের আদলে এটি গড়ে উঠছে, তাই এই বনের সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
চিতলমারী প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি সহিদুল হক টিপু বলেন, “এ যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য লীলাভূমি। এই বনকে ঘিরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার কর্মীদের ভিড় বাড়ছে। নতুন সুন্দরবন এক নজর দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসছেন।”
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে বন বিশেষজ্ঞদের একটি দল এই এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এতে একদিকে যেমন এলাকাবাসীর মধ্যে আশার আলো দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষায় এই বন এখন আশীর্বাদ স্বরূপ হয়ে উঠেছে।