শাহাজাদা এমরান, স্টাফ রিপোর্টার,কুমিল্লা: কুমিল্লার প্রাণপ্রবাহ গোমতী নদী আজ ভয়াবহ দূষণের মুখে। দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, নষ্ট হচ্ছে সৌন্দর্য, বেড়েই চলছে দুর্গন্ধ। এ দূষণের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গোমতী নদীর পাড়ঘেঁষা বিবিরবাজার রোড এলাকার অসংখ্য চায়ের দোকান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব চায়ের দোকান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য—চায়ের কাপ, প্লাস্টিক, পলিথিন, খাবারের উচ্ছিষ্ট ও অন্যান্য আবর্জনা নির্বিচারে নদীর পাড়ে কিংবা সরাসরি নদীর পানিতে ফেলা হচ্ছে।
ফলে গোমতী নদীর পানির গুণগতমান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীতীরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। নদীতীরে বর্জ্যের স্তূপ, গোমতীতে গড়িয়ে যাচ্ছে ময়লা
সরেজমিনে দেখা যায়, বিবিরবাজার রোড সংলগ্ন নদীতীর এলাকায় চায়ের দোকানগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। অনেক দোকানের সামনে ডাস্টবিন নেই, আবার কোথাও থাকলেও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। ফলস্বরূপ চা পান শেষে কাপ, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলেই চলে যান অনেক ক্রেতা। এসব বর্জ্য জমে নদীতীরজুড়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ভাগাড়।
বৃষ্টির দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নদীর পাড়ে জমে থাকা বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে গড়িয়ে সরাসরি নদীতে মিশে যায়। আবার অনেক দোকানদার ও ক্রেতাকে নদীতে সরাসরি ময়লা ছুড়ে ফেলতেও দেখা গেছে।
দুর্গন্ধে নাকাল পথচারী, নষ্ট হচ্ছে সৌন্দর্য : নদীপাড় দিয়ে চলাচলকারী স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় গোমতীর তীরে দাঁড়ালে প্রশান্তি লাগত। এখন দুর্গন্ধে দাঁড়ানোই কঠিন। বিশেষ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নদীর ধারে ভিড় বাড়ে, একই সঙ্গে বাড়ে বর্জ্যের পরিমাণ। এতে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে এবং নদীতীরের পরিবেশ বসবাস ও ভ্রমণের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,“গোমতী নদী কুমিল্লার অহংকার। কিন্তু এখন নদীর ধারে গেলে মনে হয় কেউ দেখার নেই। চায়ের দোকান আছে, মানুষ আছে—কিন্তু ময়লা ফেলার কোনো ব্যবস্থা নেই। সব শেষ পর্যন্ত নদীতেই যাচ্ছে।”
পরিবেশকর্মীদের উদ্বেগ : বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কুমিল্লা জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক শাহাজাদা এমরান বলেন, গোমতীর দূষণ শুধু সৌন্দর্য নষ্টের বিষয় নয়—এটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। প্লাস্টিক ও পলিথিন নদীর পানিতে মিশে গেলে পানি দূষিত হয়, মাছসহ জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব ঝুঁকিতে পড়ে। পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহও ব্যাহত হয়। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে গোমতী আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
পরিবেশ কর্মী শাহাজাদা এমরান আরো বলেন, গোমতী নদীকে বাঁচাতে হলে , নদীতীর এলাকার সব দোকানে বাধ্যতামূলক ডাস্টবিন ব্যবস্থা করতে হবে, নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে, নদীতে বর্জ্য ফেললে জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গোমতী নদী রক্ষায় সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিতে হবে।
চায়ের দোকানদারদের দায় ও কর্তৃপক্ষের করণীয় : স্থানীয়রা বলছেন, শুধু দোকানদার নয় ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে। তবে দোকানগুলোর সামনে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে এই সমস্যা সমাধান হবে না। পাশাপাশি গোমতী নদীর পাড়ে অবৈধভাবে ময়লা ফেলাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষের নিয়মিত মনিটরিং ও অভিযান প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, গোমতী নদী শুধু পানি নয়—এটি কুমিল্লার ঐতিহ্য, পরিবেশ ও প্রাণপ্রবাহ। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই নদী একদিন কেবল দূষণের ভারে ধুঁকে ধুঁকে অস্তিত্ব হারাবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপ পরিচালক মোসাব্বের হোসেন রাজিব বলেন, বিষয়টি
আমি জানতাম না। যেহেতু জেনেছি অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব। বর্জ্য গুলো যাতে নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলা হয় এজন্য তাদের নোটিশ করা হবে। সরেজমিনে পরিদর্শন করে কি করা যায় সেটা করব।