কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল হকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং আয়কর ফাঁকির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের হেড অফিসে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগটি ইতোমধ্যে কমিশনের নজরে এসেছে এবং বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে। লিখিত অভিযোগে বলা হয়, সরকারি চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কুমিল্লা ট্রমা সেন্টার
হক বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হন। অভিযেগ অনুযায়ী, তিনি কুমিল্লা শহরে বড় দুটি ট্রমা সেন্টার ও একটি জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ ও পরিচালনা করছেন। এছাড়া কুমিল্লা সদর উপজে-লার ঠাকুরপাড়া এলাকার মদিনা মসজিদ রোডে তার মালিকানায় সাততলা একটি ভবন রয়েছে। এসব স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের বাইরে তার নামে এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শত কোটি টাকার ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ডা. মো. আব্দুল হকের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক আশীদার ইউসুফ চৌধুরী বাবুল, যিনি পূর্বে সরকারি সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ইউসুফ চৌধুরী বাবুলের বিরুদ্ধেও অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও আয়কর ফাঁকির অভিযোগে বর্তমানে দুদক কুমিল্লা অফিসে তদন্ত চলমান রয়েছে। ওই তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক অভিযোগে ডা. মো. আব্দুল হকের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের তথ্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়।
পারিবারিক সম্পর্কের দিক থেকেও ইউসুফ চৌধুরী বাবুল ডা. মো. আব্দুল হকের ভগ্নিপতি। অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় দুজনই দুর্নীতিলব্ধ অর্থ ব্যবহার করে শেয়ারসহ বিভিন্ন খাতে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। সরকারি বিধি অনুযায়ী একজন সরকারি চিকিৎসকের পক্ষে এ ধরনের বেসরকারি হাসপাতাল ও বৃহৎ ব্যবসার মালিক হওয়া স্বাভাবিক নয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এর পেছনে সরকারি পদে থেকে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
আয়কর সংক্রান্ত গুরুতর অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে অভিযোগপত্রে। ডা. মো. আব্দুল হকের ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তার বিপুল সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই বলে অভিযোগকারীদের দাবি। অবৈধ আয়ের অর্থ বিভিন্ন কৌশলে আয়কর ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈধ করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কুমিল্লাবাসীর পক্ষ থেকে দুদকের কাছে তার আয়কর নথি ও সম্পদের উৎস বিস্তারিতভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় তদন্ত সম্পন্ন করার দাবি জানানো হয়েছে।
এদিকে, ডা. মো. আব্দুল হকের মালিকানাধীন কুমিল্লা ট্রমা সেন্টার হাসপাতালের ভবন নির্মাণ নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সিটি করপোরেশনের শর্ত অমান্য করে নির্মাণ করা ওই ভবনের অংশ অপসারণের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়ার প্রায় সাত মাস পার হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর আগে তিন দফা নোটিশ দেওয়া হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেগুলোর কোনো সন্তোষজনক জবাব দেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট কুমিল্লা ট্রমা সেন্টারের ১৫ তলা ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে অনুমোদিত নকশার শর্ত উপেক্ষা করেই ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়। বিষয়টি নজরে আসার পর ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রথম নোটিশ প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে দ্বিতীয় ও তৃতীয় নোটিশ দেওয়া হলেও সেগুলোর কোনো কার্যকর জবাব পাওয়া যায়নি।
সবশেষ গত বছরের ২১ মে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সায়েম ভূইয়ার স্বাক্ষরে চূড়ান্ত নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশে বলা হয়, সরেজমিন তদন্ত ও নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ইমারতের সীমানা ও সেটব্যাক রুল অনুসরণ না করে ভবনের আকার ও আকৃতি পরিবর্তন করে নির্মাণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবৈধ অংশ স্বেচ্ছায় অপসারণ না করলে নকশা অনুমোদন বাতিল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
তবে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সিটি করপোরেশনের শর্ত ভঙ্গ করে নির্মিত ট্রমা সেন্টারের পাশাপাশি দুটি ভবন আগের মতোই অক্ষত রয়েছে। ভবনের কোনো অংশ ভাঙা বা পরিমার্জনের চিহ্ন দেখা যায়নি। হাসপাতালের সামনে যত্রতত্র যানবাহন পার্কিং করে রাখার ফলে নগরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে হাসপাতাল ভবনের মালিক পক্ষের দাবি, নোটিশ পাওয়ার পর সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং লিখিত।