ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। এ নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কঠোর বার্তাও কাজে আসছে না। কমছে না সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের বেপরোয়া আচরণ। মব সন্ত্রাস (উচ্ছৃঙ্খল মানুষের বিশৃঙ্খলা), খুনোখুনি, লেগেই আছে। টার্গেট কিলিং থেকে শুরু করে নানা অপরাধে ব্যবহার হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র। অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘ডেভিল হান্ট ফেজ ২’ নামে বিশেষ অভিযান চলছে। এর মধ্যেই পিটিয়ে ও গুলি করে প্রকাশ্যেই চলছে হত্যা-সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুলি। এতে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে আগামী নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোটের ক্ষেত্রে ভয় জাগাচ্ছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক আগেই আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। ভেঙে পড়া সেই আস্থা মেরামত করতে হলে প্রথমেই মব সন্ত্রাসের লাগাম টানতে হবে সরকারকে। এ ছাড়া সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি অবলম্বন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে সমন্বিত ও জোরালো অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এর মাধ্যমে অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের সুস্পষ্ট কঠোর বার্তা দিতে হবে। তা না হলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোটের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, তফশিলের পরে টার্গেট কিলিংয়ের বেশকিছু ঘটনা ঘটেছে। সংঘাত সহিংসতার ঘটনাও দেখছি। এ ধরনের অপরাধ পরিস্থিতি প্রার্থী, কর্মী, সমর্থকদের পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করার প্রশ্নে লুণ্ঠিত অস্ত্র ঝুঁকি তৈরি করছে। এখনও ২৫ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধারের বাইরে আছে। মব সন্ত্রাস অব্যাহত রয়েছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক যে ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দরকার সেখানে যেমন ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, সব অপরাধের ঘটনা বিশেষ করে টার্গেট কিলিংয়ের প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে হবে। এ ছাড়া অপারেশন ডেভিল হান্ট অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ দমনে শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে দেখলে হবে না। অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে হবে।
রাজনৈতিক বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, আধিপত্যের লড়াই, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দখল, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানা কারণে খুনের শিকার হচ্ছে মানুষ। ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। ১১ ডিসেম্বর তফশিল ঘোষণা হওয়ার পরের দিনই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। এরপর থেকে একের পর এক টার্গেট কিলিং, গুলি, মব সন্ত্রাস লেগেই আছে। যা নতুন বছরেও থেমে নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা রয়েছে। বর্তমানে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ চলমান রয়েছে। অভিযানে প্রতিদিনই নানা অপরাধে যুক্ত অপরাধীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে।
গত বুধবার রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় বিএনপির অঙ্গসংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর আগের দিন মঙ্গলবার রাজধানীর কদমতলী এলাকায় শাহাবুদ্দিন (৪০) নামে এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ৫ জানুয়ারি পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে চট্টগ্রাম, যশোর এবং নরসিংদীতে তিনটি খুনের ঘটনা ঘটে। ওইদিন যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক ব্যবসায়ীকে মাথায় গুলি ও ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। চট্টগ্রামের রাউজানে জানে আলম সিকদার নামে যুবদল নেতাকে মাথায় গুলি করে এবং নরসিংদীর পলাশে গুলি করে খুন করা হয় মনি চক্রবর্তী নামে এক ব্যবসায়ীকে।
নতুন বছরের প্রথম ৮ দিনে অন্ত ৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৬ জনকেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে এখন অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য আসছে। কিন্তু অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জোরালো কোনো অভিযান দেখা যাচ্ছে না। এখনও লুুণ্ঠিত ১৩৩৩টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। সীমান্তের ১৮টি পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ অস্ত্র আসারও খবর পাওয়া যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে সাধারণত, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্যাডার ও সন্ত্রাসীদের কদর বেড়ে যায়। এবারও এমন খবর মিলছে। সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অনেকেই পেশিশক্তি বাড়াতে কম দামে ভারতীয় পিস্তল, রিভলবার কিনে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা গতকাল বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। মাঠে তাদের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের তদারকিও বৃদ্ধি করতে হবে। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে আরও জোরদার অভিযান চালাতে হবে। সেই সঙ্গে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে যাতে অবৈধ অস্ত্র দেশে ঢুকতে না পারে এ জন্য বিজিবিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক ঘটনার আগাম তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি করা কঠিন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে তিন হাজার ৫০৯ জন খুন হন। ২০২৩ সালের খুনের সংখ্যা তিন হাজার ২৩ জন এবং ২০২২ সালে তিন হাজার ১২৬ জন খুন হন। পুলিশ গত ২৯ ডিসেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নভেম্বর মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভার পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের ৩৩৭টি খুনের মামলা রুজু হয় সারাদেশের থানাগুলোয়। ওই সময় ৩৫৫ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। গত বছরের অক্টোবরে ৩১৯টি খুনের মামলা রুজু হয়। খুনের শিকার হন ৩২৯ জন। গত বছরের নভেম্বরে ২৭৯টি খুনের মামলা হয় সারাদেশের থানাগুলোয়। এ সময় মোট মারা যান ২৯৩ জন।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর ২০২৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন বলছে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ১২৮ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময়কালে কমপক্ষে ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন।
আসক বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি চরম ও ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে, যা ২০২৫ সালে আরও বিস্তৃত ও সহিংসতর হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হয়েছেন। দুর্বৃত্তদের হামলা, নির্যাতন ও গুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ১১১ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।
অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনে গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে সারাদেশে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ শুরু হয়। ইতোমধ্যে এই অভিযানে প্রায় ১৬ হাজার জন জন গ্রেপ্তার হয়েছে। এর আগে গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি অপারেশন ডেভিল হান্ট বিশেষ অভিযানে ১২ হাজার ২২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।