রাজধানী ঢাকার যানজট, দূষণ ও সময় অপচয়ের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে যে কয়েকটি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প নেয়া হয় তার মধ্যে মেট্রোরেল অন্যতম। ইতোমধ্যেই উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল শুরু হওয়ায় নগরবাসীর যাতায়াতে এসেছে স্বস্তি। তবে বহুল প্রতীক্ষিত মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অংশ চালু হলে রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। ঢাকার অন্যতম বড় সমস্যা যানজট। এই অংশ চালু হলে শুধু যাতায়াতই সহজ হবে না বরং দেশের প্রধান রেলস্টেশন কমলাপুরের সঙ্গে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে। যা সামগ্রিকভাবে নগর ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। সড়কে অতিরিক্ত যানবাহন, অপরিকল্পিত পার্কিং ও সংকীর্ণ রাস্তার কারণে প্রতিদিনই সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর ইতোমধ্যে উত্তরা-মতিঝিল রুটে যানজট কিছুটা কমেছে। মতিঝিল-কমলাপুর অংশ চালু হলে এই সুবিধা আরো বিস্তৃত হবে। মেট্রোরেল একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গণপরিবহন ব্যবস্থা, যা একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম। ফলে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমবে এবং সড়কের ওপর চাপ কমবে। মেট্রোরেলের সম্প্রসারণ শুধু যাতায়াত সহজ করবে না বরং অর্থনৈতিক কর্মকা-েও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। মতিঝিল বাংলাদেশের আর্থিক কেন্দ্র, আর কমলাপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র। এই দুই এলাকার মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে। মতিঝিল-কমলাপুর অংশ চালু হলে আরো বেশি মানুষ মেট্রোরেল ব্যবহার করবে, ফলে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কমবে এবং বায়ুদূষণ হ্রাস পাবে বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা মহানগরী ও তৎসংলগ্ন পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসনে ও পরিবেশ উন্নয়নে অত্যাধুনিক গণপরিবহন হিসেবে ৬টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)-এর আওতায় একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার নিমিত্ত সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ২০৩০ গ্রহণ করা হয়। উত্তরা উত্তর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি-৬ এর নির্মাণ কাজ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পুরোদমে এগিয়ে চলছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উত্তরা উত্তর হতে মতিঝিল পর্যন্ত অংশের বাস্তব গড় অগ্রগতি ৯৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অংশের পূর্ত কাজের অগ্রগতি ৭২ দশমিক ০৯ শতাংশ।
এমআরটি-৬ এর মোট ৮টি প্যাকেজে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্যাকেজভিত্তিক বাস্তবায়ন অগ্রগতিতে দেখা গেছে, প্যাকেজ-১ (ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন): এই প্যাকেজের বাস্তব কাজ গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখ শুরু হয়ে নির্ধারিত সময়ের ৯ মাস পূর্বে ৩১ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখ সমাপ্ত হয়। এই প্যাকেজের বাস্তব অগ্রগতি ১০০ শতাংশ। প্যাকেজ-২ (ডিপো এলাকার পূর্ত কাজ): এই প্যাকেজের বাস্তব কাজ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখ শুরু হয়ে গত ২০ জুন ২০২২ তারিখ শেষ হয়। এই প্যাকেজের সার্বিক বাস্তব অগ্রগতি ১০০ শতাংশ। প্যাকেজ-৩ ও ৪ (উত্তরা উত্তর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও ৯টি স্টেশন নির্মাণ): উভয় প্যাকেজের কাজ ১ আগস্ট ২০১৭ তারিখ শুরু হয়ে গত ৩০ নভেম্বর ২০২২ তারিখ শেষ হয়। এই প্যাকেজ দুইটির পূর্ত কাজের সমন্বিত বাস্তব অগ্রগতি ১০০ শতাংশ।
মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট ও ১টি স্টেশন নির্মাণ: এমআরটি লাইন-৬ মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার বর্ধিত করার কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সকল পাইলক্যাপ, পিয়ার এবং সকল স্টেশন কলাম নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। উত্তরা কন্সট্রাকশন ইয়ার্ডে ২৯৮টি প্রিকাস্ট সেগমেন্টের মধ্যে শতভাগ প্রিকাস্ট সেগমেন্ট কাস্টিং সম্পন্ন হয়েছে। মোট ২৭টি স্প্যান এর মধ্যে ২৫টি স্প্যান উত্তোলন সম্পন্ন হয়েছে। মোট ১৮০ মিটার দৈর্ঘ্যরে কনকোর্স ছাদের মধ্যে ১৮০ মিটার, ১৮০ মিটার ট্র্যাক সø্যাব এর মধ্যে ১৮০ মিটার ট্যাক সø্যাব এবং ১৮০ মিটার প্ল্যাটফর্ম সø্যাবের মধ্যে ১৮০ মিটার প্ল্যাটফর্ম সø্যাব ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ৮২৪টি প্রিকাস্ট প্যারাপেট ওয়াল এর মধ্যে সকল প্রিকাস্ট প্যারাপেট ওয়াল তৈরি সম্পন্ন হয়েছে। স্টেশনের স্টিল রুফ স্ট্রাকচার এর ৫৩৩ টন স্টিলের মধ্যে ৪৯৯ টন স্টীল ইরেকশনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কনকোর্স লেভেলের ২৮০০ বর্গমিটার ব্রিক ওয়াল ও প্লাস্টারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। স্টেশনের আর্কিটেকচারাল এবং এন্টি-এক্সিট এর কাজ চলমান রয়েছে। এই পর্যন্ত কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৭২ দশমিক ০৯ শতাংশ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন হবে কমলাপুরে যেখানে দেশের অন্যতম ব্যস্ত রেলস্টেশন রয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী এখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করেন। ফলে মেট্রোরেলের সঙ্গে এই স্টেশনের সংযোগ স্থাপন হলে যাত্রীদের জন্য তৈরি হবে নির্বিঘœ ও দ্রুতগতির যাতায়াতের সুযোগ।
রাজধানীর বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে যানজটের কারণে ভোগান্তির শিকার। তারা দ্রুত কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালুর দাবি জানাচ্ছেন। ইতোমধ্যে উত্তরা থেকে আগারগাঁও এবং পরে মতিঝিল পর্যন্ত আংশিক চালু হওয়া এই মেট্রোরেল সেবা রাজধানীর যাতায়াতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। তবে উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ রুট চালু না হওয়ায় এখনও অনেকটাই অসম্পূর্ণ থেকে গেছে এই স্বপ্নের প্রকল্প। ফলে নগরবাসী এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন পুরো রুট চালুর জন্য।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী বেলায়েত হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, আমি প্রতিদিন কমলাপুর বাসা থেকে আগারগাঁও অফিসে যাতায়াত করি। আগে যানজটে কখনো কখনো এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগতো। মেট্রোরেল চালু হলে এই সময় অনেক কমে আসে। এখন মতিঝিল থেকে আগারগাঁও অফিসে যাই। কিন্তু মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে আগারগাঁও থেকে সরাসরি বাসায় ফিরতে পারবো।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রফেসর ড. হাদিউজ্জামান ইনকিলাবকে বলেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। মেট্রোরেল শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয় এটি একটি জীবনধারার পরিবর্তন। এটি মানুষের সময় বাঁচায়। মেট্রোরেল পুরোপুরি চালু হলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে কমলাপুর ও মতিঝিল এলাকায় ব্যবসার প্রসার ঘটবে। মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে। এমআরটি-৬ এর উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ চালু হওয়া শুধু একটি প্রকল্পের সমাপ্তি নয় বরং এটি ঢাকার নাগরিক জীবনে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে।
সূত্র: ইনকিলাব