প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, ফাল্গুনী ডটকমের সিইও পাভেল গ্রেপ্তার

সুজন কৈরী: [২] প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সহযোগীসহ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ফাল্গুনী শপ ডটকমের সিইও মো. পাভেল হোসেনকে আটক করেছে র‌্যাব-৪। আটক অন্যরা হলেন- সাইদুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল হাসান ও ফারজানা আক্তার মিম।

[৩] সম্প্রতি কতিপয় ক্ষতিগ্রস্থ ভুক্তভোগীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে বুধবার বিকেল থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় থেকে ১টি বিদেশী পিস্তল, ১টি ম্যাগজিন, ২ রাউন্ড গুলি, ২৪ ক্যান বিয়ার, ৪ বোতল দেশি মদ, ১টি প্রাইভেট কার, কম্পিউটার, প্রিন্টার, বিপুল পরিমান এন-৯৫ মাস্ক, ১০০টি ইনভয়েস, ৩০ চেক বহি, ৮০টি সীল ও বিপুল পরিমান বিজ্ঞাপনের স্ক্রীনশট উদ্ধার করা হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের ওয়ার হাউজ থেকে ৪২৩ কেজি চা পাতা, ৭১৫ কেজি চাউল, ৪১২ কেজি মসুর ডাল, ২৬০ কেজি ফুলক্রিম মিল্ক, ৮টি বাই-সাইকেল, ৪৫০ লিটার সয়াবিন তেল, ২১৪ লিটার সরিষার তেল, ৫০ কেজি লবন, ১১০ কেজি হুইল পাউডার, গ্লাস ক্লিনার, হারপিকসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়।

[৪] বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, ফাল্গুনী শপ ডটকম কারসাজির মূলহোতা পাভেল। তিনি প্রতিষ্ঠানটির সিইও এবং আটক সাইদুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ আল হাসান, এবং ফারজানা আক্তার মিম তার অন্যতম সহযোগী।
পাভেল ১৯৯১ সালে গোপালগঞ্জ সদর থানা এলাকায় জন্মগ্রহণ করে। ৮ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। তার বাবা গোপালগঞ্জ জেলার একটি সরকারী অফিসের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হিসেবে কর্মরত। পাভেল ২০০৭ সালে গোপালগঞ্জের স্থানীয় একটি স্কুল থেকে এসএসসি, ২০০৯ সালে ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ২০১৪ সালে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন বলে জানা যায়। ২০০৯ সালে এইচএসসি অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি একটি অস্ত্রসহ র‌্যাবের কাছে আটক হন এবং তার বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় একটি অস্ত্র মামলা রয়েছে।

[৫] ২০১৪ সালে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর রাজবাড়ীতে লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রজেক্টে ৩০-৪০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন। পরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন ঠিকাদার হিসেবে কাজ করার সময় তার পরিচিত একজন তাকে অনলাইন ব্যবসা করার পরিকল্পনা দেন। ২০১৯ সালের শুরুতে পাভেল, জনৈক দিদারুল আলম, কানিজ ফাতেমা ও রহমতুল্লাহ শওকত মিলে ফাল্গুনী শপ ডটকম নামে একটি অনলাইন বিজনেস প্লাটফর্ম তৈরি করেন। শুরুতে তারা উত্তরা এলাকায় একটি ভাড়াকৃত স্পেসে আউটলেট খুলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেন। ব্যাবসার শুরুতেই পাভেলের অংশীদাররা তার গ্রাহক ঠকানোর বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং তারা তার বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেন। পাশাপাশি এফিডেবিট করে উকিল নোটিশ পাঠিয়ে যৌথ ব্যবসা থেকে সড়ে যান। তারা এ বিষয়টি জয়েন্ট স্টক অথোরিটিকেও অবহিত করেন। এরপরও পাভেল তাদের নামে জাল সীল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে গ্রাহকদের প্রতারিত করতেন। এমনকি তাদের নাম ব্যবহার করে যৌথনামে চেক পর্যন্ত ইস্যু করতেন। চলতি বছরের মে মাসে প্রতারণার অভিযোগে কয়েকজন গ্রাহক পাভেলের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় প্রতারণার মামলা দায়ের করলে পাভেল সিআইডি কর্তৃক গ্রেপ্তার হয়ে ২১দিন জেলে থেকে জামিনে বের হন। তিনি আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে উঠে। কিছু সংখ্যক গ্রাহক ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে অভিযোগ করলে অধিদপ্তর একাধিকবার ফাল্গুনী শপ ডটকমের আউটলেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে চলতি বছরের জুলাইয়ে পাভেল বনশ্রী এলাকায় ‘অরিমপো ডটকম’ ও ‘টেক ফেমিলি ডটকম’ নামে নতুন অফিস স্থাপন করেন। এর আড়ালেই ফাল্গুনী শপ ডটকমের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। অরিমপো ডটকম ও টেক ফেমিলি ডটকমে পাভেল নিজে এমডি এবং তার স্ত্রী রিতা আক্তার চেয়ারম্যান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

[৬] মোজাম্মেল হক বলেন, এই প্রতারক চক্রের সদস্যরা করোনা মহামারিতে লকডাউন চলাকালীন সময়ে অনলাইনে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী স্বল্প মূল্যে বিক্রির চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। তাদের এই বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে ক্রেতারা তাদের সাথে যোগাযোগ করে বিপুল পরিমান অর্ডার দিতে থাকেন। পরে প্রতারক প্রতিষ্ঠানটি কিছু কিছু ক্রেতাকে আংশিক, কিছু কিছু ক্রেতাকে নিম্নমানের পণ্য আবার কিছু কিছু ক্রেতাদের কোনও পণ্য সরবরাহ না করে সকল টাকা আত্মসাৎ করে।

[৭] যেসব ক্রেতা তার এই অনলাইন শপ ফাল্গুনী ডটকমে পণ্যের অর্ডার করতো তাদের পাভেল পণ্যের মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করতে বলতেন। তখন সাধারণ লোকজন তার কথা বিশ্বাস করে মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন গেটওয়ের মাধ্যমে চাহিত পন্যের মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করতো। পরে পাভেল মার্চেন্ট একাউন্ট ও অনলাইন গেটওয়ে থেকে টাকা অন্যত্র স্থানান্তর বা জমি বা প্লট কিনে টাকা লেয়ারিং করতেন।

[৮] চক্রটির প্রতারণার কৌশলের বিষয়ে র‌্যাব কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, পাভেল শুরু থেকেই তার অনলাইন শপ ফাল্গুনী শপ ডটবিডি এবং ফেইসবুক পেইজ ফাল্গুনী বিডি’র মাধ্যমে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বাজার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রির কথা বলে অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রচার করে সাধারণ লোকজনদের আকৃষ্ট করতেন। সাধারণ লোকজন বিজ্ঞাপন দেখে স্বল্প মূলে পন্য পাওয়ার আশায় তার সাথে যোগাযোগ করতো। ক্রেতারা যোগাযোগ করলে পাভেল পণ্যের মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করতে বলেন। তখন ক্রেতারা পাভেলের কথা বিশ্বাস করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে চাহিত পন্যের মূল্য চক্রের মূলহোতা পাভেলকে অগ্রিম পরিশোধ করতো। টাকা পেয়ে পাভেল ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য না দিয়ে নিম্নমানের পন্য পাঠিয়ে দিতেন। আবার কিছু কিছু সময় কোনো পণ্যই পাঠাতেন না। পরে পাবেল আর ওই ক্রেতাদের সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ করতেন না। এতে করে চক্রের মূলহোতা পাভেল তার সহযোগীদের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতারনা মূলকভাবে সাধারণ লোকজনের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। প্রতারণার আরেক কৌশল হিসেবে পাভেল কোনো প্রকার অবগতি ছাড়া তার অফিসের ঠিকানা পরিবর্তন করেন, যাতে প্রতারিত গ্রাহকরা তার অফিসে এসে কোনো প্রকার অভিযোগ না করতে পারে। আটক পাভেল নিজেও একজন মাদকসেবী। তিনি অনলাইন ব্যবসারা আড়ালে মাদক ব্যবসাও করতেন।

[৯] জিজ্ঞাসাবাদে আটকরা জানিয়েছেন, শুরুতে তারা উত্তরা এলাকায় একটি ভাড়াকৃত স্পেসে আউটলেট খুলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেন এবং বর্তমানে বনশ্রী এলাকায় ভাড়াকৃত স্পেসে তাদের এই কার্যক্রম চলমান চলছে। ওইস্থানে তারা ২টি ওয়ার হাউজ চালু করেন। বর্তমানে পাভেলের কোম্পানীতে ১০-১২ জন কর্মচারী রয়েছেন। যাদের পাভেল মাসে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা বেতন পরিশোধ করেন। অনলাইন শপ ফাল্গুনী শপ ডটকমের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব নেই। পাভেলের ৪টি বিভিন্ন ব্যাংকে নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ টাকা রয়েছে।
র‌্যাব জানায়, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সাল থেকে পাভেল নিজস্ব ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ৪ কোটির বেশি টাকা লেনদেন হয়েছে। তার নামে ফাল্গুনী শপ ডটকম, ফাল্গনী শপ এবং ফাল্গুনী শপ বিডিসহ মোট ২৮টি নামসর্বস্ব কোম্পানীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফাল্গনী শপ ডটকম ছাড়া বাকি ২৭টির কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পাভেল অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির। তিনি অনলাইন শপের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব না খুলে তার নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অন্যত্র স্থানান্তর বা জমি বা প্লট কিনে টাকা লেয়ারিং করতেন।
ওই অনলাইন শপের সিইও পাভেল নিজে এবং তার স্ত্রী পলাতক রিতা আক্তার তার অন্যতম ব্যবসায়িক পার্টনার। বর্তমানে তার স্ত্রী টেক ফ্যামিলি ডটকমসহ আরও ৭-৮টি কোম্পানী খোলার পায়তারা করছেন বলে জানা যায়।

[১০] র‌্যাব জানায়, পাভেলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও প্রতারণা মামলা রয়েছে। তার কাছে কোনো ভুক্তভোগী পণ্য অথবা তাদের পরিশোধ করা টাকা চাইতে অফিসে গেলে পাভেল তাদের পণ্য ও টাকা দিতেন না। ক্রেতাদের অস্ত্র দেখিয়ে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতিসহ তার নিজস্ব টর্চার সেলে লাঠি পেটা, বৈদ্যুতিক শকসহ অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে অফিস থেকে তাড়িয়ে দিতেন।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত