প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইলিশে রেকর্ডের প্রত্যাশা, ভিন্নমত জেলেদের

বণিক বার্তা: ২২ দিন নিষিদ্ধ থাকার পর গত ২৫ অক্টোবর দেশের নদ-নদীগুলোয় ইলিশ আহরণ শুরু করেছেন জেলেরা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এবার ভালো পরিমাণে ইলিশ আহরণের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) চাঁদপুর কার্যালয়ের গবেষকদের দাবি, প্রজনন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে এবার রেকর্ড হারে ডিম ছেড়েছে মা-ইলিশ। সে হিসেবে মাছটির উৎপাদন বৃদ্ধির ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রেখে এবার ইলিশ আহরণে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে পৌনে ছয় লাখ টনে পৌঁছতে পারে।

যদিও জেলে ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা বলছেন, এবার ইলিশের আহরণ নিষিদ্ধের সময় একটু আগেভাগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। এখনো নদীতে পেটে ডিমসহ প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। এত ডিমওয়ালা ইলিশ আগে কখনই ধরা পড়েনি। সে হিসেবে এবার ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির যে সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তার বাস্তব প্রতিফলন না-ও দেখা যেতে পারে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর কার্যালয়ের দেয়া তথ্যমতে, কয়েক বছর ধরেই নদ-নদীগুলোয় ইলিশের ডিম ছাড়ার হার বাড়ছে। ২০১৬ সালে দেশের নদ-নদীগুলোয় ডিম ছাড়ার সুযোগ পেয়েছিল ৪৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ ইলিশ। এরপর ক্রমাগত বেড়ে গত বছর তা দাঁড়ায় ৫১ দশমিক ২ শতাংশে। চলতি বছর তা আরো বেড়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫১ দশমিক ৭ শতাংশে। সে হিসেবে এবার দেশে মা-ইলিশের ডিম ছাড়ার হার বেড়েছে দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট।

 

বিএফআরআইয়ের চাঁদপুর কার্যালয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, ইলিশের অভয়াশ্রম ও প্রজনন মৌসুমে সংরক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে প্রতি বছর দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। এ বছর মা-ইলিশ রেকর্ড হারে ডিম ছেড়েছে। জাটকা মৌসুমে সঠিকভাবে সুরক্ষা দিতে পারলে আগামীতে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে এবং মাছটির উৎপাদন পৌনে ছয় লাখ টনে পৌঁছাবে।

অন্যদিকে জেলেরা বলছেন, প্রজনন মৌসুমে ইলিশ আহরণের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সময়টি সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। এবার নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরতে গেলে প্রচুর ডিমওয়ালা মা-ইলিশ ধরা পড়েছে। এর আগে নিষেধাজ্ঞা শেষে কোনো বছরই জেলেদের জালে এবারের মতো এত ডিমওয়ালা মা-ইলিশ তাদের জালে ধরা পড়েনি।

এ বিষয়ে বরিশাল মৎস্য আড়তদার সমিতির সদস্য মো. জহির সিকদার বলেন, ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সময় নির্ধারণের বিষয়ে কখনই জেলে বা মৎস্য ব্যবসায়ীদের মতামত নেয়া হয় না। সঠিক সময় নির্ধারণ না করায় এ বছর ভরা মৌসুমে নদীতে ইলিশ সংকট ছিল। একই কারণে সরকারের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার পরেও জেলেরা নদীতে গিয়ে প্রচুর মা-ইলিশ পেয়েছেন। জেলে ও ব্যবসায়ীদের মতামত নিলে এমন অবস্থা হতো না।

একই মতামত দিচ্ছে বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশও। ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশের মৎস্যবিজ্ঞানী মো. জলিলুর রহমান বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়িয়ে ১৬ বা ১৭ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করলে এবার ইলিশের ডিম ছাড়ার পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পেত। এ বছর নদীতে মা ইলিশের ডিম ছাড়ার হার আগের তুলনায় অনেক কম হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

তবে জেলে ও ব্যবসায়ীসহ বিশেষজ্ঞ মহলের এ বক্তব্য মানতে নারাজ খাতসংশ্লিষ্টরা। অন্যান্য বছরের মতো এবারো ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা সফল হয়েছে বলে দাবি করছেন তারা। এ বিষয়ে বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস বলেন, ইলিশ সারা বছরই ডিম ছাড়ে। এ বছর ইলিশ প্রজনন মৌসুমের সময় ঠিকই ছিল। জেলেদের দাবি সঠিক নয়। নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ ঠিকমতোই ডিম ছেড়েছে। ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা সফল হয়েছে।

দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন নতুন অভয়াশ্রম গড়ে তোলার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হচ্ছে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র। মা ইলিশ সংরক্ষণ ও জাটকা নিধন বন্ধে নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে বিশেষ অভিযান। একই সঙ্গে মৎস্যজীবীদের মধ্যে বাড়ানো হচ্ছে সচেতনতা। ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নদীতে জাল ফেলা বন্ধ রাখতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তাদের দেয়া হচ্ছে চাল ও আর্থিক সহায়তা। মা-মাছের ডিম ছাড়ার হারসহ ইলিশের সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে এসব বিষয় প্রভাব ফেলছে বলে অভিমত খাতসংশ্লিষ্টদের।

নদ-নদীর নাব্য হ্রাস, পরিবেশ বিপর্যয়, নির্বিচারে জাটকা নিধন ও মা-মাছ আহরণের ফলে একটা সময় নদীতে আকাল দেখা দিয়েছিল ইলিশের। দ্রুত উৎপাদন কমে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল জাতীয় মাছটি। গত কয়েক বছরে সে চিত্র অনেকটাই বদলেছে। নানামুখী উদ্যোগে আবারো নদীতে ফিরতে শুরু করেছে ইলিশের ঝাঁক। দেশে ইলিশ উৎপাদনের পরিসংখ্যানেও এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ৯০ লাখ টন। এর এক দশক পর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জাতীয় মাছটির উৎপাদন বেড়ে ৫ দশমিক ৩৩ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। এর পর ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫০ হাজার টনে। গত অর্থবছরেও দেশের নদ-নদীগুলো থেকে প্রায় একই পরিমাণ ইলিশ আহরণ হয়েছে বলে বিভিন্ন উৎসে প্রকাশিত তথ্যে জানা গিয়েছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত