প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রভাষ আমিন: বাংলাদেশের কেউ কি ‘রেইনট্রি হোটেলে কেউ যায়ইনি’ নামে একটা সিনেমা বানাতে পারেন?

প্রভাষ আমিন: ঘটনার ৩৮ দিন পর মামলা করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন কামরুন্নাহার। পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ৭২ ঘণ্টা পর যেন কোনো ধর্ষণ মামলা নেওয়া না হয়। কী ভয়ঙ্কর নির্দেশনা। এমনিতেই বাংলাদেশে ধর্ষণের বিচার চাওয়া নিয়ে অনেক ট্যাবু আছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ধর্ষণের ঘটনার মাত্র ২৩ শতাংশ থানা-আদালত পর্যন্ত যায়। ধর্ষণের পর ভিকটিম প্রথম প্রতিক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে গোসল করে সব প্রমাণ মুছে ফেলে। আর সমাজ, এমনকি নিজের পরিবারও ধর্ষণের ঘটনা আড়াল করে রাখতে চায়। ধর্ষিতার কোনো অপরাধ না থাকলেও তাকেই সমাজে হেয় করা হয়, ধর্ষিতাকে কেউ বিয়ে করে না, এমনকি ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ের মতো অমানবিক ঘটনাও ঘটে। ধর্ষণের ট্রমা কাটতে অনেক সময় লাগে, থানায় যাবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নিতেও অনেক সময় লাগতে পারে। আর সাহস করে বিচার চাইতে গেলেও ধর্ষিতাকে থানা, মেডিকেল, আদালতে এক ভয়ঙ্কর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ধর্ষণের যেহেতু সাক্ষী থাকে না, তাই প্রমাণ করা কঠিন। কঠিন বলেই ধর্ষণের বেশিরভাগ ঘটনাই আড়ালে থেকে যায়। ধর্ষিতা যাতে ন্যায়বিচার পায়, সেজন্য তদন্ত প্রক্রিয়া, হাসপাতালে পরীক্ষা, আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সংবেদনশীলতা দরকার, সেখানে কামরুন্নাহারের মতো অসংবেদনশীল মানুষ ধর্ষিতাকে বিচার চাইতে নিরুৎসাহিত করছেন। তার জানা উচিত ছিলো, ফৌজদারি অপরাধ কখনো তামাদি হয় না। ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে ৪৫ বছর পর, সেখানে ধর্ষণের মামলা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে করার নির্দেশ ছিলো হাস্যকর। এটা ঠিক, যতো দেরি হবে, অপরাধ প্রমাণ ততো কঠিন হবে। কিন্তু ধর্ষণের বিচার অন্য অপরাধের মতো নয়। হাইকোর্টের এক রায়ে বলা হয়েছে, শুধু ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়ার কারণে ধর্ষণ প্রমাণ হয়নি বলা যাবে না বা আসামি খালাস পেতে পারে না। ভিকটিমের মৌখিক সাক্ষ্য ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ভিত্তিতেই আসামিকে সাজা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কামরুন্নাহার বোধহয় হাইকোর্টের এ নির্দেশনা সম্পর্কে জানতেনই না। তিনি মেডিকেল রিপোর্ট ধরে এ মামলায় আসামিদের নির্দোষ বলে দিয়েছেন।

এ মামলার মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয়েছিলো, ‘কোনো ফোর্সফুল সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স (জোরপূর্বক যৌন সঙ্গম) আলামত পাওয়া যায়নি। তবে তারা যৌন সঙ্গমে অভ্যস্ত।’ আর এই মেডিকেল রিপোর্টের বরাত দিয়ে বিচারক বলেছেন, ‘এতে প্রমাণিত হয়, তারা রেগুলার শারীরিক সম্পর্ক পারফর্ম করে। তাই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে।’ নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক করলেই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে? তাদের ধর্ষণ করা জায়েজ হয়ে যাবে। রায়ে কামরুন্নাহার বলেছেন, ‘একসঙ্গে মদ্যপ অবস্থায় ড্যান্স করলেন, পরে এক বিছানায় চারজন মিলে শুয়ে থাকলেন, এখানে ধর্ষণ কীভাবে হলো? তারা ছিলেন উইলিংলি পার্টনার (স্বেচ্ছায় শয্যাসঙ্গী)। উত্তেজনাবশত শারীরিক সম্পর্ক করলে সেটা ধর্ষণ হয় কীভাবে? সেখানে শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে, কিন্তু সেটা ধর্ষণ নয়। আর ওই হোটেলে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করা যায় না বলে কর্মচারীরা সাক্ষ্যে বলেন। সুতরাং অস্ত্রের মুখে কীভাবে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলো?’ রেইনট্রি হোটেলের ঘটনার পর অনেকেই বলছিলেন, মেয়ে দুটি হোটেলে গেলো কেন, মদ খেলো কেন, নাচলো কেন? তার মানে তাদের চরিত্র খারাপ। তার মানে তাদের ধর্ষণ করা ভুল হয়নি। কী বিস্ময়কর, সেই একই সুর বিচারকের কণ্ঠেও। কামরুন্নাহারের দায়িত্ব ছিলো বিচার করা, কারও চারিত্রিক সার্টিফিকেট দেওয়া নয়।

কোনো প্রমাণ ছাড়াই চার্জশিট দিয়ে আদালতের পাবলিক টাইম নষ্ট করায় তদন্ত কর্মকর্তাকে ভর্ৎসনা করেছেন বিচারক কামরুন্নাহার। তার অভিযোগ, অন্য কোনো পক্ষ কর্তৃক প্রভাবিত হয়ে তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিট দিয়ে মামলাটি বিচারের জন্য পাঠিয়েছেন। কিন্তু আমার তো সন্দেহ বিচারকই কোনো পক্ষ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই ‘ঐতিহাসিক’ রায় দিয়েছেন।

আইন তার নিজের গতিতে চলে, এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর কিছু নেই। অর্থ, প্রভাব, ক্ষমতা- আইনকে প্রভাবিত করার মতো অনেক উপাদানই আছে। কে কীভাবে প্রভাবিত হয় কে জানে। তবে আইন সম্পর্কে সিনিয়র সাংবাদিক মহসিন আল আব্বাসের কাছ থেকে শোনা একটি কথা বলি- যখন গরিবে গরিবে আইনি লড়াই হয়, তখন দুই পক্ষই নাই হয়ে যায়। যখন ধনী আর গরিবে আইনি লড়াই হয়, তখন গরিব নাই হয়ে যায়। আর যখন ধনীতে ধনীতে আইনি লড়াই হয়, তখন আইন নাই হয়ে যায়। রেইনট্রির ঘটনায় দুই দুর্বল ভিকটিমকে তো ‘চরিত্রহীন’ বলে নাই করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, একইসঙ্গে নাই করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তবে এখনো মানুষের শেষ ভরসা সুপ্রিম কোর্ট এই চেষ্টা রুখে দিয়েছেন। আশা করি উচ্চ আদালতে ভিকটিমরা ন্যায়বিচার পাবেন।

শুরুতে হিন্দি সিনেমা ‘পিঙ্ক’র কথা বলেছিলাম। বাংলাদেশে এমন একটা সিনেমা হয় না কখনো। বিচার ব্যবস্থা নিয়ে আরেকটি হিন্দি সিনেমার কথা বলে লেখাটি শেষ করছি। ‘নো ওয়ান কিল্ড জেসিকা’ নামে সিনেমাটিতে জেসিকা নামে এক তরুণী খুন হয়েছিলো। কিন্তু রেইনট্রির মতো জেসিকার খুনিরাও প্রভাবশালী ছিলো। তাই আদালতে তারা বেকসুর খালাস পেয়েছিলো। অবশ্য পরে জেসিকার খুনিদের বিচার হয়েছিলো। রেইনট্রির ঘটনায় বিচারক বলেছেন, ভিকটিমরা যে রেইনট্রি হোটেলে গিয়েছিলো সেটাই তদন্তে প্রমাণ করা যায়নি। এখন বাংলাদেশের কেউ কি ‘রেইনট্রি হোটেলে কেউ যায়ইনি’ নামে একটা সিনেমা বানাতে পারেন?

লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত