প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘খালেদা জিয়া ভালো নেই’ মারুফ কামালের ফেসবুক স্ট্যাটাস

মারুফ কামাল খান: রেডিও, টেলিভিশন ও পত্র-পত্রিকায় জোর প্রচার, খালেদা জিয়া বিদেশে চলে যাচ্ছেন। এক-এগারোর জামানা তখন। তিনি তখন ঢাকা সেনানিবাসে শহীদ মইনুল রোডে শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিমাখা বাড়িটিতে কার্যত গৃহবন্দী। বহির্জগতের সংগে প্রায় সব রকমের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।খুব প্রভাবশালী একজন স্বজন এক সন্ধ্যায় কম্পিউটারে কম্পোজ করা একটা বিবৃতি পাঠালেন আমার কাছে বিশ্বস্ত লোক মারফত। সেই সাথে হাতে লেখা একটা চিরকুট। ওই বিবৃতিটি যেন আমার কাছে রেখে দিই। ম্যাডাম দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাবার পর আমি যেন সই করে তাঁর নামে এটি মিডিয়ায় পাঠাবার ব্যবস্থা করি।

আমার মাথার ভেতরে তখন ঘূর্ণিঝড় বইছে। ম্যাডামের সরাসরি নির্দেশ ছাড়া এ কাজ আমি করতে পারি না। কিন্তু তাঁকে ফোনে জিজ্ঞেস করা আর মাইক্রোফোনে ঘোষণা করে দেয়ার মধ্যে তো কোনো তফাত নেই। সিভিলিয়ানদের কারো হাতে তখন কোনো ক্ষমতা নেই। আমার খুব ভালো জানাশোনা এমন তিনজন মেজর জেনারেলকে পরপর ফোন করলাম। তিন জনই খুব গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন তখন। প্রথম জন খুব গম্ভীর হয়ে আমার কথা শুনলেন। তারপর বললেন, “দেখি যদি আমি কিছু করতে পারি তবে জানাবো।” দ্বিতীয় জন পরিহাস তরল কণ্ঠে বললেন, “জ্বী ভাই এক্স পিএম-এর সঙ্গে আপনার দেখা করার ব্যবস্থা অবশ্যই করে দিতে পারবো। তবে এই দেখা করার পর আপনার নিজের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা দেয়া কিন্তু আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।” তৃতীয় জন বললেন, “দেখুন, আপনার একজন ওয়েল উইশার হিসেবে আমি অনুরোধ করছি উনার সঙ্গে এখন ভুলেও দেখা করার চেষ্টা করবেন না। বিপদে পড়ে যাবেন।”

তবুও ঝুঁকি নিয়েই গিয়েছিলাম। আড়াই ঘণ্টা গেটে বসিয়ে রাখলো। বহু দেন-দরবার হলো প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার কর্তাদের সাথে। বললাম, উনার অধীনে কাজ করেছি। জীবনে আর কোনো দিন দেখা হবে কিনা জানি না। উনি তো চলেই যাচ্ছেন। একটু দেখা করে বিদায় জানাবার সুযোগ পাবো না?
অবশেষে দেখা করে কয়েক মিনিটের মধ্যে ফেরার শর্তে মিললো অনুমতি সন্ধ্যা পেরিয়ে যাবার পর।

খবর পেয়ে ম্যাডাম ড্রইং রুমে এসে প্রথমে আমাকে ভর্ৎসনা করেছিলেন। “আপনি কেন এসেছেন? কী-করে এলেন? বিপদে পড়ে যাবেন তো। ঠিক করেননি। জলদি চলে যান।” ম্যাডামের সামনে বসেই সেদিন উনার এক আত্মীয়ের সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হয়েছিল। বলেছিলাম, “বেগম জিয়ার পরিচয় কেবল তিনি কার কী আত্মীয় সেটা নয়। তিনি কোটি কোটি মানুষের নেত্রী। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার উৎস। তিনি জাতির সম্পদ। তাঁর ওপর অগণিত মানুষের আস্থা। তাদের আবেগ-অনুভূতির বিপরীতে ম্যাডামের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার কারুর নেই। তিনি স্বজন বা নেতা যাই-ই হোন।”

ম্যাডাম সেদিন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছিলেন, “কোথাও যাবো না আমি। এ দেশেই থাকবো। তাতে যা-হবার হবে।” তার পর কতো ইতিহাসই তো হয়ে গেলো। দেড় দশক পেরিয়ে গেছে। অকুতোভয়চিত্ত ম্যাডামের সেই মনোবল ও সেই দৃঢ়তা এখনো রোগকাতরতা সত্বেও অটুট আছে বলেই বিশ্বাস করি। তবে আমার নিজের সেই সাহস ও অধিকার এখন অতীতের অন্তর্গত।

ম্যাডামের ব্যাপারে উনার অসংখ্য অনুসারীর মতন অন্ধকারে ও দূরে থেকে আমি আজ বেদনার্ত কণ্ঠে আবারও সেই বাক্যটি উচ্চারণ করতে চাই, বেগম খালেদা জিয়া কিন্তু এখনো অগণিত নেতা-কর্মীসহ কোটি কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার উৎস। কাজেই উনার যে-কোনো ব্যাপার লুকিয়ে চুরিয়ে, গোপন করে, কুক্ষিগত করে রাখার চিন্তা ছাড়ুন। সবাই না জানলেও বেমালুম বুঝতে পাচ্ছে, তিনি ভালো নেই। তাঁর দেহ থেকে ‘ম্যালিগন্যান্ট’ বলে সন্দেহভাজন লাম্প অপারেশন করে অপসারণ করা হয়েছে। এটা খুবই গুরুতর ব্যাপার। এই সার্জারির সিদ্ধান্ত হুট করে একদিনে নেয়া হয়নি। কিন্তু তা গোপন রাখা হয়েছিল। অপারেশনের পরেও সবকিছু স্বাভাবিক ও খুব হালকা করে দেখানো হচ্ছে। এর পেছনে কী যুক্তি আমার মাথায় আসে না।

যারা সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক তাদের প্রতি আমার সবিনয় নিবেদন পর্দার অন্তরালে রেখে উনাকে বিস্মৃতি ও অকার্যকারিতার দিকে ঠেলে দেবেন না দয়া করে। ম্যাডামের শারীরিক অবস্থা অসংখ্য মানুষের উদ্বেগের বিষয়। তাই স্বচ্ছতার সঙ্গে সবকিছু রাখুন পাদপ্রদীপের আলোয়। কেবল নিজেরা ইতিহাসের দায় না নিয়ে।

ম্যাডামের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে দায়িত্বশীলদের দিয়ে নিয়মিত বুলেটিন প্রচারের ব্যবস্থা রাখুন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেদনার্ত হওয়া ও দোয়া করা ছাড়া আমার তেমন কিছু করার নেই। সেই সাথে সকলের কাছে মিনতি করি উনার জন্য অন্তরের সকল আকুতি ঢেলে প্রার্থনা করার।

লেখক: বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত