প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শরিফুল হাসান: অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বানানোর লড়াইয়ে হারলে আমাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ!

শরিফুল হাসান: পূজামপে যে কোনো হিন্দু কোরআন শরীফ রাখবে না, এটা বোঝার জন্য জ্ঞানী হতে হয় না। কমনসেন্স কাজে লাগালেই হয় যেটা এ দেশে আমাদের নেই। এই যে দেখেন, কুমিল্লায় মপে কোরআন শরীফ রাখা ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন (৩৫)। বাড়ি কুমিল্লা নগরের সুজানগর এলাকায়। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ইকবাল হোসেনকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। অথচ এই ঘটনার জের ধরে জেলায় জেলায় হিন্দু বাড়িঘরে হামলা ভাঙচুর আগুন দেওয়া হলো। শত শত প্রতিমা ভাঙা হলো। এর দায় এখন কে নেবে? জানি কেউ নেবে না। আর শুধু এবার কেন এ দেশে গত ৫০ বছরে একটা ঘটনার কথাও কেউ বলতে পারবে না যেখানে কোনো একজন হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান ইসলাম ধর্ম অবমাননা করে কথা বলেছে। আমি আমার ২০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে অনেক ঘটনা কাভার করেছি। সব জায়গায় দেখেছি একই ঘটনা। শুধু একটা গুজব বা মিথ্যাকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে। আচ্ছা আপনাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ঘটনা মনে আছে? ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর সকালে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ এনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ১৫টি মন্দির ও শতাধিক বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পরদিনই আমি সেখানে গিয়েছিলাম। চেষ্টা করেছিলাম আসল ঘটনা খুঁজে বের করতে। শুনে অবাক হবেন রসরাজ নামের একজন জেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো তিনি নাকি কাবা শরীফকে কট‚ক্তি করে ফটোশপ বানিয়ে পোস্ট দিয়েছিলেন। রসরাজ তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলে। আমি বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহায়তায় জেলে গিয়ে রসরাজের সঙ্গে ঘণ্টাখানেক কথা বলেছিলাম। এতোই মূর্খ মানুষ রসরাজ, ছবি এডিট তো পরের কথা নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টও নিজে খুলতে পারবে বলে মনে হয়নি। ঘটনা যখন ঘটে সে মাছ ধরতে বিলে ছিলো। কিন্তু তাকে দিনের পর দিন জেলে থাকতে হয়েছে। এ মামলায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) রসরাজের ফেসবুক, মুঠোফোন ও মেমোরি কার্ডসংক্রান্ত ফরেনসিক প্রতিবেদন দিয়েছিলো। তাতে বলা হয়েছিলো, রসরাজের ফেসবুক, মুঠোফোন ও মেমোরি কার্ড থেকে পোস্ট দেওয়ার কোনো আলামত পায়নি পিবিআই। অথচ দেখেন দাঙ্গা কিন্তু হয়ে গেছে। প্রতিটা ঘটনার চরিত্র একইরকম। রামুর ঘটনা বলেন কিংবা যেকোনো ঘটনা! আমি আজ পর্যন্ত কখনো শুনিনি কোনো হিন্দু বা বৌদ্ধ কটাক্ষ করে এই বাংলাদেশে ইসলাম নিয়ে কোনো পোস্ট দিয়েছেন।

অথচ দেখেন বারবারই এই ধরনের গুজব বা মিথ্যা থেকে হামলা হয়েছে। ফেসবুকে আপনারা যতোই অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেন বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। প্রতি বছর পূজা এলেই শুনবেন ওমকু জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুর, হামলা। আমি এখন বুঝি একদল লোক বসেই থাকে হামলা করার জন্য। তাদের কোনো তথ্য উপাত্ত লাগে না। তারা জানে এই দেশে হিন্দুদের ওপর হামলা করলে কোনো বিচার হবে না। এই যে কুমিল্লার ঘটনায় বের হলো একজন মুসলমান কোরআন রেখেছে তাতে কিন্তু কারও বোধদয় হবে না। এসব কারণে মানুষ হিসেবে, এই রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে, একজন মুসলমান হিসেবে তাই লজ্জায় আমার মাথা নিচু হয়ে আসে। ভাবতে কষ্ট লাগে অসাম্প্রদায়িক এই বাংলাদেশের জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছে। আর আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসে হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসবে ঘটলো কলঙ্কজনক সব ঘটনা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, গত ৯ বছরে এ দেশে ৩৬৮৯ বার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হয়েছে। যারা সংখ্যাটি কতো ভয়ানক অনুভব করতে পারছেন না তাদের অন্যভাবে বলা সম্ভব, এ দেশে গড়ে প্রতিদিন একবার কিংবা তার বেশি দেশের কোথাও না কোথাও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হয়েছে! আসলে আমরা রাষ্ট্রের ধর্ম ঠিক করে দেবো, ইচ্ছামতো হিন্দুদের নির্যাতন করবো, তাদের বাড়িঘর দখল করবো, তৃতীয় সারির নাগরিকের মর্যাদা দেবো, ওঠতে বসতে মালাউন আর ভারতের দালাল বলে গালি দেবো, নারী হলে ধর্ষণ করবো, যাকে যখন প্রয়োজনে কান ধরে ওঠবস করাবো, দেশছাড়া করতে বাধ্য করবো, কিন্তু তারা কোথাও বিচার চাইতে পারবে না। এমকি প্রতিবাদও করতে পারবে না। সেই চল্লিশের দশক থেকে এসব চলছেই! ধর্ম নিয়ে খেলতে খেলতে দেশটাকে যে কতোটা সাম্প্রদায়িক আমরা করেছি, সেটা এখনো বুঝতে পারছি না। এখন আর এ দেশে সত্যিকারের কোনো অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল নেই। বরং সবাই একটু একটু করে সাম্প্রদায়িক হয়েছে।

সাম্প্রদায়িকতাই এ দেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলোর সবচেয়ে বড় অবলম্বন। একবার ভাবুন তো কতোটা অসহায় হলে একজন মানুষ নিজের স্বদেশ ছাড়তে চায়। একবার শুধু ভাবুন ১৯৪৭ সালে যারা ছিলো ৩৩ শতাংশ আজ সেটা কমে হয়েছে আট শতাংশ। একদিন শুনবেন নামতে নামতে প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। তখন দেখবেন মারামারি হচ্ছে নিজেদের মধ্যে। যেমন হচ্ছে আফগানিস্তান, পাকিস্তান কিংবা অন্য কোনো দেশে। সম্মিলিতভাবে লড়তে না পারলে দেখবেন সামনে আরও কঠিন দিন আসছে। কাজেই রাষ্ট্রকে বলবো, প্রতিটি নাগরিককে বলবো বিষয়টিকে সিরিয়াসলি নেন। এ দেশের স্বার্থেই আমাদের এ ধরনের হামলা বন্ধ করতে হবে। মুসলমান হোক, হিন্দু হোক, বৌদ্ধ হোক, খ্রিস্টান হোক, আদিবাসী হোক এ দেশে সবার অধিকার একইরকম হতে হবে। কারণ দেশটা স্বাধীন করতে সবাই একসঙ্গে লড়াই করেছে। কাজেই একসঙ্গে মিলে বাঁচতে হবে। একসঙ্গে মিলে লড়তে হবে। মনে রাখবেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বানানোর লড়াইয়ে হারলে আমাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ! সবাই ভালো থাকুন। ভালো থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ! Shariful Hasan’র ফেসবুক ওয়ালে লেখাটি পড়ুন।

সর্বাধিক পঠিত