প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: ঝুমন দাশের মুক্তি দাবি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বর্তমান বাস্তবতা

দীপক চৌধুরী: ঝুমন দাশের জামিন হয় না। কারণ ঝুমন সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক। বড় বড় নামিদামি উকিল-ব্যারিস্টার ধরার সামর্থ্য নেই। এতে তো প্রচুর অর্থ-কড়ির দরকার! জেলে পড়ে আছে । তার পক্ষে সেরকম তদ্বিরও নেই। এটিই অনেকে বিশ্বাস করে থাকেন। ‘চাপ’ সৃষ্টি করতে হবে, ‘তদ্বির’ লাগবে। একটা কিছু তো লাগবে! এসব কথাও উঠেছে। কারণ তার সঙ্গে যারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সবাই জামিন পেয়েছেন। আমরা দেখলাম, ঝুমনের স্ত্রী-সন্তান ঢাকা এসেছিলেন। কিন্তু আমাদের সমাজ কী এই অসহায় মা-শিশুকে কোনো উপকার করতে পেরেছে?

ঝুমনের ব্যবহৃত ভাষা অনেকে পছন্দ করতে পারেন আবার না-ও করতে পারেন। ফেসবুকে তিনি হেফাজত নেতা মামনুল হক নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কিন্তু এটাও সত্য যে, সে যা কিছুই লিখুক বা ফেসবুকে পোস্ট করুক এটার জন্য এতো দীর্ঘদিন জেলে আটক রাখা হবে কেনো ? এমন প্রশ্ন করে অনেকে আমাকে ঝুমন দাশ নিয়ে লিখতে অনুরোধ করেছেন। অনুরোধকারী অনেকের অভিমানের কণ্ঠ। ‘ঝুমন তো আপনার এলাকার ছেলে, তাকে নিয়ে লিখেন না কেনো?’ অথচ তার মুক্তি চেয়ে আমি এই “নির্বাচিত কলামে”ও লিখেছি। যাকগে মূল কথায় আসি।

হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন নেতা মামুনুল হককে নিয়ে ফেসবুকে ‘আপত্তিকর পোস্ট’ দেওয়ার অভিযোগে সুনামগঞ্জের শাল্লা থানায় করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে ঝুমন। ১৬ মার্চ রাতে ঝুমনকে আটক করা হয়। তাকে ১৭ মার্চ ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত সেদিন ঝুমনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। ১৬ মার্চ ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ তুলে ১৭ মার্চ নোয়াগাঁও গ্রামে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা-লুটপাট চালানো হয়।

গত ২২ মার্চ শাল্লা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে পুলিশ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাকে ‘গ্রেপ্তার করা’ নিয়ে নানান খবর প্রচার হয়েছে। বিভিন্ন প্রাবন্ধিক, আলোচক ও সাংবাদিকদের অনেকেই ঝুমনকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে মতামত দিয়ে লেখালেখি করেছেন। কিন্তু বিভিন্ন ঘটনায় আমরা বুঝতে পারছি, দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ থেকে জঙ্গি নির্মূল হলেও তাদের প্রেতাত্মারা এখনো রয়ে গেছে। তারা উসকানি দিয়ে দেশে অপ্রীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করতে চায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো দ্বিতীয় কেউ আসবে এটা মনে করি না। তাঁর মতো দেশপ্রেমিক, সৎ, মানবতাবাদী ও দূরদর্শী নেত্রী আমরা পাবো বলেও মনে করি না।

কিন্তু এসব অপকর্মের খবর কেনো তাঁর কাছে যায় না এ প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা যায়, শাল্লার সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাজু ভাস্কর্য চত্বরে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে ঝুমন দাশের মুক্তির দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ঝুমন দাশের মুক্তির দাবি করেছেন ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতারা। অবিলম্বে তাকে মুক্তি দেওয়া না হলে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতারা। হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে প্রায় ছয় মাস আগে আটক হয়েছিলেন ঝুমন এর পর থেকে কারাগারে আটক আছেন তিনি। সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হল সংসদের সাবেক ভিপি হোসাইন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূলনীতি হওয়া সত্ত্বেও বারবার ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর আঘাত এসেছে।

হোসাইন আহমেদ আরো বলেন, ‘ অবিলম্বে তাকে মুক্তি না দেওয়া হলে আমরা আবারও রাজপথে নামবো। ধর্মীয় উগ্রবাদকে আমরা লাল কার্ড দেখাব।’ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর সাবেক সদস্য রফিকুল ইসলাম ঝুমন দাশের গ্রাম উল্লেখ করে বলেন, ‘যারা সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িতে আগুন লাগিয়েছিল, তাদের বিচার হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন রাখছি। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকারীদের বিচার হচ্ছে না, অথচ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে পোস্ট দেওয়ায় ঝুমন দাশকে কারাবরণ করতে হচ্ছে। এটি দুঃখজনক।’ বিজয় একাত্তর হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও হল সংসদের সাবেক এজিএস আবু ইউনূস বলেন, ‘ধর্ম অবমাননার সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। আমরা ঝুমন দাশের মুক্তি চাই।’ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাহিত্য সম্পাদক এস এম রাকিব সিরাজী, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি কামাল উদ্দিন, একই হলের সাবেক ভিপি সাইফুল্লাহ আব্বাসী, মাস্টারদা সূর্যসেন হল সংসদের সাবেক জিএস সিয়াম রহমান, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের সাবেক জিএস মেহেদী হাসানসহ অনেকেই তীব্র প্রতিবাদ বক্তব্য দেন।

বিষয়টি নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। চিন্তা করা জরুরি। আমরা কী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মধ্যে আছি? যিনি এ রাষ্ট্রের জন্মদাতা তাঁকে আমরা ভুলে যাবো কীভাবে? যিনি সাম্প্রদায়িকতাকে ঘৃণা করতেন তাঁর দেখানো পথে আমরা কী হাঁটতে পারি না? আসল সমস্যা কোথায়? বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে কী সবকিছু দেখা ও খোঁজ-খবর রাখা সম্ভব? নাকি কোথাও কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বাসা বেঁধে আছে এটা খুঁজে বের করা দরকার।

ঘোষণা দিয়ে ঝুমন দাশের গ্রামের হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ, বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাট ও অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। কী রকম ভয়াবহ ঘটনা। বিনা বাধায়, বিনা প্রতিরোধে এমন বর্বরোচিত কাণ্ডটি করা হয়েছিল। বিষয়টি একপক্ষীয়। কারণ, কোনো বাধা নেই, প্রাণ নিয়ে পলাচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষরা। যদি সেখানে প্রতিরোধ করা হতো, যদি সেখানে তারা ( হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা) দেশীয় এককাঠ্যা, কোচা-লাঠি, রানদাসহ অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতো তাহলে কী রকম ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারতো তা কী একবার আমরা কল্পনা করতে পারি? কেউ কেউ এ ঘটনাটিকে বা আক্রমণ ও অত্যাচারকে সাধারণ মাত্রার হিসেবে দেখার চিন্তা করছেন। আমাদের সমাজের কর্ণধারেরা এ ধরনের আক্রমণ-নির্যাতনকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলেই আখ্যায়িত করে থাকেন। আসলেই কী তা? মোটেই তা নয়।

আমরা দেখছি, ২০১৩ সালে ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলে হেফাজত ইসলামের তাণ্ডব, সন্ত্রাস ও সহিংসতা। তারা পুলিশ-র‌্যাবসহ আইনশৃংখলাবাহিনীর ওপর তাণ্ডব চালিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের লক্ষ্য ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে জীবনবাজি রেখে কাজ করতে হয়েছে। হেফাজত নেতা মামুনুলের কীর্তিও ভয়াবহতা মানুষ জানে। সংগতকারণেই বুঝতে হবে ঝুমন দাশ এমন পোস্ট কেন লিখেছিলেন। দুর্বৃত্তপনা ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের জন্য স্বয়ং রাষ্ট্রকর্তৃক অভিযুক্ত মামুনুল হক। বহুবার তাকে পুলিশ রিমান্ডে নিতে হয়েছে। সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের হোতা হিসেবে সরকারের রেকর্ডে আছে মামুনুলের নাম। দেশের এক জেলখানা থেকে অন্য কারাগারে নিতে হচ্ছে তাকে। একের পর এক হেফাজত নেতা মামুনুলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড প্রকাশ হচ্ছে। মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে হেফাজতে ইসলামের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগ।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক