প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: বিশাল অংকের অবৈধ সম্পদটা কী নুরুল ইসলামের নাকি অন্য কারো?

দীপক চৌধুরী: নুরুল ইসলামের অর্থের উৎস নিয়ে হৈচৈ শুরু হয়েছে। নানারকম প্রশ্ন উঠেছে যে, সে কী এক-দুই বছরে এতো টাকার মালিক বনেছে? রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ৩৭টি প্লটের মালিক হওয়া বা ক্রয় করা দু-চার বছরের বিষয় নয়। এক্ষেত্রে অন্য কারো সাহায্যে রয়েছে কি-না তাও দেখা দরকার। কিংবা প্রশ্ন উঠেছে এতোদিন কী এনবিআর এ ব্যাপারে কোনো খোঁজই পায়নি? শুল্ক বিভাগের কাজটি কী? সেরা করদাতাকে সম্মাননা জানানো হয়। কিন্তু নুরুলের মতো একটি ‘সেরা চোরের’ টিকিটি স্পর্শ করা গেলো না কেনো? দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখেও পড়েনি কেনো? এসব প্রশ্ন এখন অনেকের সামনে। আসল গলদ কোথায় এটা বের করতে হবে।

কে এই নুরুল ইসলাম। টেকনাফ স্থল বন্দরে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দিনে ১৩০ টাকা বেতনে চাকরি করতেন নুরুল ইসলাম নামে একচল্লিশ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। এই চাকরিকে পুঁজি করে তিনি ২০ বছরে ‘অবৈধভাবে’ সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে র‌্যাব। গত সোমবার মধ্যরাতে তাকে বাংলাদেশি জাল নোট, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও ইয়াবাসহ রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব কর্মকর্তারা। ২০০৯ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। তারই আস্থাভাজন একজনকে এ পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

পেশা শুরু করেছিলেন একজন চুক্তিভিত্তিক কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে। র‌্যাব তার কাছ থেকে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ জাল নোট, ৩ লাখ ৮০ হাজার মিয়ানমারের মুদ্রা, নগদ ২ লাখ ১ হাজার ১৬০ টাকা ও ৪ হাজার ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন। তিনি জানান, নুরুল ইসলাম ইতোমধ্যে ঢাকা শহরে ৬টি বাড়ি ও ১৩টি প্লট কিনেছে। এছাড়াও সাভার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন, ভোলাসহ বিভিন্ন জায়গায় নামে বেনামে তার মোট ৩৭টি জমি, প্লট, বাগানবাড়ি ও বাড়ি আছে। তার নামে বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ১৯টি অ্যাকাউন্ট আছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নুরুল বন্দরে কর্মরত থাকাকালীন তার অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে চোরাকারবারী, শুল্ক ফাঁকি, অবৈধ পণ্য খালাস, দালালি এসবের কৌশল রপ্ত করেন । তার অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি বন্দরে বিভিন্ন রকম সিন্ডিকেটে যুক্ত হন।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, নুরুল ইসলাম একটি ক্ষমতাধর সিন্ডিকেটের মূল হোতা। এ হোতা ২০০১-এ চাকরিতে ঢোকেন। চাকরি ছেড়ে দেন ২০০৯ সালে। কিন্তু চাকরিরত অবস্থায় অবৈধ চুরি ও সম্পদ গড়ার মাঠঘাট দেখেন ও তা পরবর্তীকালে কাজে লাগান। কিন্তু এ দীর্ঘ সময় তার ভয়ংকর রাক্ষুসেরুপ কী কেউ দেখেনি? শোনা গেছে, একবার তদন্ত করা শুরু হয়েছিল কিন্তু ধাপাচাপা পড়ে যায় একটি স্বার্থান্বেষী দুর্নীতিবাজ চক্রের হাতের থাবায়। তাহলে কী সর্ষের ভিতরই ভূত! আমরা স্বাস্থ্যের সালাম ড্রাইভারের ক্ষমতা ও সীমাহীন অবৈধ সম্পদের কথা জানি। সে এখন নাকি জেলে আছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের আকতারুজ্জামান, ক্যাসিনো বাণিজ্যের সূত্রে সূত্রাপুরের আওয়ামী লীগ করা এনু-রুপম দুই ভাইয়ের টাকার গুদাম, বা ‘গোল্ডেন মনির’ কী একদিনে তৈরি হয়েছিল? এদের লালন-পালন করা হয়েছে। আজিমপুর ম্যাটারনিটি হাসপাতালে সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে। কিন্তু যারা দুর্নীতিবাজদের ধরার কথা তারাই যোগসাজশ করে ঘটনা ধামা চাপা দিতে চেয়েছেন। দুদকের পরিচালক কীভাবে ঘুষের বিনিময়ে ডিআইজি মিজানকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন তা শুনে অনেকেই বিস্মিত। দুর্নীতি করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক এনামুল বাছিরের জেল খাটছেন। পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমান কারাবন্দি। কারাগারে দেখভাল করার কাজে কর্মরত একদল কারা কর্মকর্তার ব্যাপারে তদন্ত শুরু হয়েছিল সেটা নাকি থেমে গেছে। এটি একটি বড় রহস্য। ডিআইজি প্রিজন বজলুর রশীদ সীমাহীন ঘুষবাণিজ্যে নিমগ্ন ছিলেন।

এসব সংবাদ মানুষকে পীড়া দেয়। তারা এখন বিচারের মুখে। আমরা এটা দেখেছি, সুযোগসন্ধানীরা অতি কৌশলে রাতারাতি ‘ধনী’ হয়ে যান। দেশের ভেতর ‘দুর্নীতির শিরোমণি’ হিসেবে পরিচিতরা সুযোগ পেলেই বিদেশে চলে যান দিব্যি। দুর্নীতিবাজ এমপি পাপলু আরব দেশে গিয়ে ধরা খেয়েছেন। এটা কে না জানে, ঘুষ ও দুর্নীতি যা আগাছার মতো সব ভালো গাছকে মেরে ফেলতে চায়। এই কোবিড-১৯ আমলেও জুম মিটিংয়ে কীভাবে চা-নাস্তা সিঙাড়ার জন্য লাখ লাখ টাকা বিল হয়? এটা ভাবতে হবে! সরকারের ভাল ভাল কাজগুলোকে বিতর্কিত করছে এখন এসব দুর্নীতিবাজরা। কেন দুর্নীতিবাজদের ‘লাগাম’ টেনে ধরা যাচ্ছে না- এ প্রশ্ন এখন প্রায়ই শোনা যায়। তবে এটাও সত্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে বিচার হচ্ছে। ছাড় দেওয়া হচ্ছে না, দুর্নীতিবাজদের বিচার তো হচ্ছেই। আরেকটু বলা দরকার যে, বাংলাদেশে এখন একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন তারা নিজেদের ‘ফেরেস্তা’ হিসেবে প্রচার করে থাকেন। তারা উঁচু চেয়ারে বসে সময়-সময়, কথায় কথায়, বক্তৃতার লাইনে-লাইনে রাজনীতিবিদের মতো ‘রাজনৈতিক’ বক্তৃতা দিয়ে থাকেন। যা রাজনীতিকরা দিতে পারেন তারা নয়, যেনো ভুলেই যান তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি। এটা প্রমাণিত, সুযোগসন্ধানী এসব ব্যক্তি কখনো বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুভাকাক্সক্ষী নয়।স্বীকার করতেই হয় যে, ইস্পাত কঠিন মনোবলে পর্বতসম বাধা ডিঙ্গিয়ে ক্রমেই এগিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত