প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গ্যাস স্বল্পতায় শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত

বণিক বার্তা: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ডায়িং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং কারখানা এসএম (প্রকৃত নাম নয়)। পাঁচদিন ধরে কারখানাটিতে সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত গ্যাসের চাপ থাকছে দশমিক ৪ পিএসআই। বিকাল ৫টার পর পর্যায়ক্রমে গ্যাসের চাপ বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কারখানার মালিক।

নারায়ণগঞ্জের মতো গাজীপুরেও রয়েছে গ্যাসের চাপ নিয়ে সমস্যায় থাকা কারখানা। সংশ্লিষ্ট কারখানা মালিকরা বলছেন, ১৫ দিন ধরে গ্যাসের চাপ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পরিচালকের সঙ্গে দেখা করে সমস্যার কথা জানানো হয়েছে; কিন্তু সমস্যার কোনো সুরাহা নেই।

গাজীপুর এলাকার সংশ্লিষ্ট কারখানার সূত্র বলছে, তিন মাস ধরেই গ্যাসের চাপ নিয়ে এ সমস্যা চলছে। গাজীপুরের বেশকিছু কারখানায় সকাল থেকে কখনো শূন্য, কখনো এক ও দুই পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে। তবে সন্ধ্যার পর পিএসআই বাড়তে থাকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কারখানা মালিক বলেন, যোগাযোগ করা হলে তিতাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এলএনজির সংকটে গ্যাসের চাপে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। কারখানার উৎপাদন গড়ে এখন ২৫ শতাংশ কম। এ অবস্থা চলতে থাকলে কয়েকদিন পর কারখানা রুগ্ণ হয়ে যাবে। এলএনজির ঘাটতি থাকলে তা বাস্তবতা। কিন্তু এ সংকট কেন থাকবে? আর ভুল পরিকল্পনার মাশুল শিল্প মালিকদের কেন দিতে হবে।

এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির দৈনিক গ্যাস উৎপাদন প্রতিবেদনে জানা গেছে, ১ আগস্ট দৈনিক ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে। ২৮ আগস্ট পর্যন্ত সরবরাহ কমে ৬৭৭ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।

প্রতিদিন দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে অন্তত ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানীকৃত এলএনজি সরবরাহ করার কথা। কিন্তু কয়েক মাস ধরে তা ৬৫০-৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এলএনজি সংকটে দেশের শিল্প-কলকারখানা থেকে শুরু করে আবাসিকেও গ্যাস সংকট প্রকট হচ্ছে।

তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী ইকবাল মো. নুরুল্লাহ বলেন, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাস সংকট শুরু হয়েছে। দাম বেশি থাকায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা যায়নি। যে কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। গ্যাসের সংকট আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকতে পারে।

তিনি বলেন, তিতাসের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৭০০-৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে জিটিসিএল থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে ৫০০-৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রতিদিন প্রায় ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকছে। যতটুকু গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তা গ্রাহকদের মধ্যে সমন্বয় করে দিতে হচ্ছে। এতে কারো ক্ষেত্রে গ্যাসের সংকট প্রকট হয়ে উঠছে।

জানা গেছে, গত এপ্রিল থেকেই গ্যাসের চাপস্বল্পতায় বড় সংকটে রয়েছে দেশের শিল্প খাত। বিশেষ করে শিল্প এলাকায় নির্ধারিত চাপের কম গ্যাস সরবরাহ হওয়ায় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। গাজীপুরের শ্রীপুরে স্থাপিত সুতা উৎপাদনকারী একটি কারখানার অনুমোদিত গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই। গত ৬ এপ্রিল রাত থেকে হঠাৎ করে গ্যাসের চাপ অনেক কমে যায়। এরপর বেশ কিছুদিন গ্যাসের চাপ ৩ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫ পিএসআই পর্যন্ত ওঠে।

শিল্প অধ্যুষিত গোটা গাজীপুর এলাকায় কম-বেশি গ্যাসের চাপের অপ্রতুল সমস্যা রয়েছে গত এপ্রিল থেকেই। এতে ভুগতে হয়েছে পোশাক শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বস্ত্র খাতের সুতা-কাপড় উৎপাদনকারী কারখানাগুলোকে। এলাকাগুলোয় স্থাপিত টেক্সটাইল মিলগুলোর গ্যাসের প্রেশার ১৫ পিএসআইয়ের পরিবর্তে তখন ৩-৫-এ নেমে আসে।

বস্ত্র খাতের শিল্প মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সদস্যদের দেয়া তথ্যমতে, বড় স্পিনিং, উইভিং ও ডায়িং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং মিলগুলোতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। এ মেশিনারিজের নিরাপদ ও সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজস্ব খরচে অবকাঠামো নির্মাণপূর্বক গ্যাস দিয়ে অত্যাধুনিক জেনারেটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনের মাধ্যমে মিল পরিচালনা করে আসছে। ক্যাপটিভ পাওয়ার জেনারেশনের জন্য গ্যাসই হচ্ছে মুখ্য জ্বালানি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশকিছু মিলের জন্য খোলা রাখাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

জানতে চাইলে পোশাক শিল্প মালিক সংগঠন বিজিএমইএ সহসভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বলেন, গ্যাসের তীব্র সংকটের বিষয়ে আমরা জানতে পেরেছি। দু-একদিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের কাছে চিঠি দিয়ে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানানো হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৮-২০ সাল পর্যন্ত উপদেষ্টা কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে তিতাস থেকে পাঁচ হাজারের ওপরে নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়েছে। এটা বড় ধরনের গ্যাসের চাহিদায় চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেই গ্যাসের সংকট রয়েছে তিতাসের।

তিতাসের একটি সূত্র বলছে, সংস্থাটি চাহিদামাফিক সরবরাহ পাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, যে পরিমাণ এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে সেটি পর্যাপ্ত নয়। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে এ ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এর বাইরে তিতাসের গ্যাসের চাপ বাড়াতে বিভিন্ন পয়েন্টে ওয়েলহেড কমপ্রেশার বসানো হয়। কিন্তু কূপ থেকে গ্যাস পাওয়া না গেলে ওয়েলহেড কমপ্রেশার বসিয়ে লাভ হচ্ছে না।

গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, গ্যাসের প্রেশার কম পাওয়া নিয়ে এর আগে কয়েকদফা জিটিসিএলকে চিঠি দিয়েছিল তিতাস। এর পরও গ্যাসের সরবরাহ সংকট কাটেনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিতাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস সংকট নিরসনে আশাবাদ জানালেও তেমন কোনো পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়। দেশের স্থলভাগ কিংবা সমুদ্রসীমায় গত পাঁচ বছরে নতুন করে কোনো গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সরকারের তথ্য বলছে, বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাসের মজুদ আছে, তা দিয়ে সর্বোচ্চ ১১ বছর চলতে পারে। গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে গেলে পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় কোনো ধরনের ভবিষ্যৎ ব্যবসা পরিকল্পনাই নেই রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের।

দেশের গ্যাসের সরবরাহ সংকট কাটাতে গত দুই মাসে অন্তত তিনটি চুক্তি করেছে সরকার, যা করা হয়েছে মূলত বিদ্যমান গ্যাস সংকট সামাল দিতেই। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় বর্তমান সংকট নিয়ে আগেই পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল।

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত