প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডিজিটাল যুগেও বেওয়ারিশ লাশ!

কালের কণ্ঠ: রাজধানীর মুগদার একটি মেসের ভাড়াটিয়া মো. মহসীন (৪৫) নামের এক সিএনজি চালিত অটোরিকশাচালক আগারগাঁওয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর তাঁর কোনো আত্মীয়-স্বজনের পরিচয়, মোবাইল নম্বর কিছুই না পাওয়ায় তাঁর লাশের ওয়ারিশ নিয়ে বিপাকে পড়েন মেস মালিক। পুলিশের সহায়তায় মহসীনের ব্যবহার করা মোবাইল ফোন দিয়ে শত চেষ্টা করেও পরিচয় উদ্ধার সম্ভব হয়নি। মোবাইলের সিমটি অপরিচিত একজনের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারেও নেই তাঁর আঙুলের কোনো ছাপ। অবশেষে ১০ দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে রেখে গত ২৩ জানুয়ারি মর্গ কর্তৃপক্ষ পুলিশের নির্দেশনায় লাশ তুলে দেয় আঞ্জুমান মুফিদুলের হাতে। আঞ্জুমান মুফিদুল কিছু চিহ্নিত আলামত রেখে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দাফন করে জুরাইন কবরস্থানে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ও মাইম অ্যাকশনের সাধারণ সম্পাদক হাফিজ মারা যাওয়ার আট দিনেও পুলিশ লাশ শনাক্ত করতে পারেনি। এ বিষয়ে পুলিশের গাফিলতি ছিল বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে তাঁর স্বজনরা লাশ শনাক্ত করে। তবে মর্গ কর্তৃপক্ষ আর দুই দিন পরই মরদেহ আঞ্জুমান মুফিদুলের কাছে তুলে দিতেন। সাধারণত চার-পাঁচ দিনের বেশি বেওয়ারিশ লাশ মর্গে রাখা হয় না। ফ্রিজ খালি ছিল তাই হাফিজের লাশ বেশি সময় রাখা হয়েছে। পরে পরিচয় শনাক্ত হয়েছে।

শুধু মহসীন বা হাফিজের ক্ষেত্রেই নয়, পরিচয় না পাওয়ায় বেওয়ারিশ লাশ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে দাফনের আগে বা দাফনের পর ওয়ারিশের সন্ধান পাওয়া যায় হাজারে তিন থেকে চারজনের। পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভবঘুরে, ট্রেনে কাটা, ছিনতাইকারী-সন্ত্রাসীদের হাতে খুনসহ অন্যান্য দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া অনেক ব্যক্তির পরিচয় খুবই কম শনাক্ত হচ্ছে।

জানা যায়, ২০১৪ সাল থেকে গত জুন মাস পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে আট হাজার ৩৬৩ জনের বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। সেই হিসাবে গড়ে বছরে এক হাজার ১৯৫টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। আঞ্জুমান মুফিদুল ও মারকাজুলসহ সব সংস্থা মিলে বছরে প্রায় দেড় হাজারের মতো বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে থাকে। তবে বেওয়ারিশ লাশের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ মানুষের লাশই বেশি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগের চেয়ে এখন বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা কিছুটা কমেছে।

এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ গত সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) অনন্ত ৬০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ শনাক্তের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয় তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে। এর মধ্যে বেশির ভাগ মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানায় পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা করে প্রাথমিক তদন্ত শেষে ছবি তুলে মরদেহ তুলে দেয় আঞ্জুমান মুফিদুলের হাতে। পরে পরিচয় শনাক্তের জন্য সারা দেশের থানাগুলোতেও পাঠানো হয়। কিন্তু এর কার্যকারিতা তেমন হয় না। এভাবেই ডিজিটাল যুগে এসেও দেশে এভাবে লাশ বেওয়ারিশ হয়ে যাচ্ছে। সরকারের নানা ডিজিটাইজেশন পদ্ধতিও ঠেকাতে পারছে না এই বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নানা অবহেলার কারণে অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টি খুবই উদ্বেগের।

জানতে চাইলে আঞ্জুমান মুফিদুলের কাকরাইল অফিসের সহকারী পরিচালক (সেবা) নূরুল আলম রিপন বলেন, করোনাকালেও বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া যাচ্ছে। তবে এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বায়োমেট্রিক পদ্ধতি এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লাশের পরিচয় বেশি শনাক্ত করতে পারছে। তাই আগের তুলনায় সংখ্যা কিছুটা কমেছে। মূলত কেন্দ্রীয় কোনো ডাটায় তথ্যসূত্র অর্থাৎ লাশের সঙ্গে কোনো লিখিত পরিচয়পত্র বা মোবাইল ফোন না থাকলেই লাশ বেওয়ারিশ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় বেওয়ারিশ কোনো মরদেহ নেই। সবারই শনাক্তকরণের জন্য নিজস্ব পরিচিতি আছে। ওই দেশগুলোতে পুলিশ দুর্ঘটনার স্পটে গিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে লাশের পরিচয় শনাক্ত করে ফেলে। কিন্তু বাংলাদেশে পুলিশ শনাক্তের কাজটি করলে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। কারণ এখনো দেশের সব নাগরিককে কোনো নির্দিষ্ট ডিজিটাল ডাটাবেইসে আনা যায়নি। ফলে এখানে ভবঘুরেসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনার লাশ বেওয়ারিশ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো জন্ম নিবন্ধনেও আঙুলের ছাপ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা দরকার। যারা এনআইডির অন্তর্ভুক্তির বাইরে আছে তাদের আওতায় নিয়ে আসতে নির্বাচন কমিশনকে আরো সক্রিয় থাকতে হবে। এ ছাড়া সবাই তাদের সঙ্গে পরিচয়পত্র/ঠিকানা রাখলে কোনো দুর্ঘটনায় লাশ বেওয়ারিশ হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না। এ ক্ষেত্রে পরিবার, হাসপাতাল, পুলিশ ও ইসিকে আরো সক্রিয়তার পরিচয় দিতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত সবার জন্য বাধ্যতামূলক কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেইস নেই। যখন কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হয়, প্রথমে পরিবারকে থানাসহ সংশ্লিষ্ট জায়গায় জানাতে হয়। না জানালে এটা কারো নজরে আসার সুযোগ নেই। কিন্তু পরিবার অনেক সময় পাঁচ-সাত দিন পরে থানায় জিডি করে। এ ক্ষেত্রে মামলার মতো ভালোভাবে তদন্ত হয় না। মূলত এসব কারণে অনেক লাশ নিখোঁজ থেকে যায়। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, যারা ভ্রাম্যমাণ, যাদের দৃশ্যমান কোনো অভিভাবক নেই। তারা ছাড়াও অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই। মূলত এসব লোকজনই পরিবার থেকে নানা কারণে দূরে গিয়ে মারা গেলে তাঁদের পরিচয় নিয়ে সংকটে পড়েন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা।

রাজধানীর প্রায় ৯৫ শতাংশ বেওয়ারিশ লাশ ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে আনা হয়। এসব লাশের বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি মওদূত হাওলাদার বলেন, ‘কোনো বেওয়ারিশ মরদেহ পেলে প্রথমে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে দেখি তাঁর এনআইডি সার্ভারে তথ্য আছে কি না। সার্ভারে থাকলে সহজে শনাক্ত হয়। অন্যথায় নানা পদ্ধতি করেও অনেক লাশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তাই সবার জন্য কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেইস থাকলে সহজেই পরিচয় শনাক্ত হবে।’

তিনি জানান, গত ৩০ মে ময়না মিয়া নামের এক যুবকের ছয় টুকরো লাশ রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে পরিচয় শনাক্ত করে পুলিশ। শুধু এনআইডির সার্ভারে তাঁর নাম ছিল বলেই পরিচয় শনাক্ত হয়েছে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের যেকোনো মৃতদেহ কোনো না কোনোভাবে তদন্ত সংস্থাগুলো শনাক্ত করে ফেলে। আমাদের দেশে দুর্বল দিকগুলো হলো ছোট-বড় সবার জন্য কেন্দ্রীয় কোনো ডাটাবেইস না থাকা। এতে অনেক লাশের ওয়ারিশ খুঁজতে গিয়ে হিমশিম খায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। বেওয়ারিশ শব্দটি শুনতে খুবই খারাপ শোনা যায়। কারণ সবারই ওয়ারিশ আছে। সেটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা উচিত। আর এ শনাক্তের কাজটা শতভাগ নিশ্চিত হবে তখনই, যখন সবার জন্য বাধ্যতামূলক আঙুলের ছাপ নিয়ে ডিজিটাল ডাটাবেইস তৈরি করা যাবে।’

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে শতভাগ মানুষের এনআইডি বা কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেইসের আওতায় আঙুলের তথ্য থাকলে পুলিশ সহজেই ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে অজ্ঞাত লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে পারত। এখন যেসব অজ্ঞাতপরিচয় লাশ পাওয়া যায়, এগুলো এনআইডির আওতায় থাকলে সহজেই আঙুলের ছাপ নিয়ে পরিচয় শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো যায়। অন্যথায় তাদের ছবিসহ ডিএমপির সাইট ও সব থানায় তথ্য পাঠানো হয়। তার পরও পরিচয় শনাক্ত না হলে আঞ্জুমান মুফিদুলে দাফনের জন্য তুলে দেওয়া হয়। তবে কোনো লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলে তা সুরতহাল করে ময়নাতদন্ত করা হয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশ একটি অপমৃত্যুর মামলা করে তদন্তে করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর পেছনে জড়িত অপরাধীদের খুঁজেও পাওয়া যায়।’

বেওয়ারিশ লাশ নির্মূল করার উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, শতভাগ মানুষের জন্মের পাঁচ বছর পর থেকে এনআইডি অথবা কোনো ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় আঙুলের ছাপ নিয়ে যদি কেন্দ্রীয় ডাটাবেইস করা যায় তাহলে যেকোনো লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে সহজ হবে। কোনো লাশ বেওয়ারিশ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।’

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত