শিরোনাম
◈ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা, দক্ষিণ আফ্রিকায় চীন, রাশিয়া ও ইরানের যৌথ নৌ মহড়া ◈ কিশোরগঞ্জে হোটেলের লিফটে বরসহ ১০ জন আটকা, দেয়াল ভেঙে উদ্ধার করেছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ◈ তেহরানে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে এক রাতেই ২০০-র বেশি বিক্ষোভকারী নিহত ◈ মিত্র হারিয়ে কোণঠাসা খামেনি: ভেনেজুয়েলা থেকে তেহরান—ইরানের শাসন কি শেষ অধ্যায়ে? ◈ নির্বাচনের আগে টার্গেট কিলিংয়ের ছোবল, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা ◈ অ‌স্ট্রেলিয়ান বিগ ব‌্যাশ, রিশাদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে শীর্ষস্থানে হোবার্ট ◈ যুদ্ধবিমান নিয়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তান আলোচনা, প্রতিক্রিয়ায় যা জানাল ভারত (ভিডিও) ◈ টানা ছয় হার কাটিয়ে জয়ের মুখ দেখল নোয়াখালী এক্সপ্রেস ◈ বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলা না চাওয়ায় যা বলল ভারত ◈ তারেক রহমানের উত্তরাঞ্চল সফর স্থগিত

প্রকাশিত : ১৩ আগস্ট, ২০২১, ০৩:৩২ রাত
আপডেট : ১৩ আগস্ট, ২০২১, ০৩:৩২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

প্রবীর বিকাশ সরকার: তানাকা মাসাআকি, জাপানি ইতিহাসবিদ : ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু জাপানে যাওয়ার পর যে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তার পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন তিনি

প্রবীর বিকাশ সরকার: তানাকা মাসাআকি, (ফেব্রুয়ারি ১১, ১৯১১-জানুয়ারি ৮, ২০০৬) জাপানের ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক দার্শনিক, আধুনিক ইতিহাস সমালোচক, লেখক এবং সংবাদপত্র সম্পাদক। তাছাড়া এশিয়ান মুক্তি আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, জেনারেল ইওয়ানে মাতসুই এর একান্ত সচিব হিসেবে গ্রেটার এশিয়া অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদকীয় পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি, তাকুশোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব কনস্ট্রাকশন অ্যালায়েন্সের মহাসচিব এবং আন্তর্জাতিক শান্তি সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন। এশিয়ার একাধিক দেশ ভ্রমণ করেছেন। ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের দুর্ধর্ষ বিপ্লবী রাসবিহারী বসু জাপানে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন ১৯১৫ সালে, তখন তানাকার বয়স মাত্র ৪ বছর। কিন্তু তরুণকালে রাসবিহারীকে দেখেছেন টোকিওর শিনজুকু, গিনজা প্রভৃতি শহরে। আমাকে বলেছিলেন, গিনজা ছিল বিহারী বসুর খুব প্রিয় জায়গা, সেখানে একটি সুশির দোকানে সময় পেলেই যেতেন এবং নিহোন শুউ (জাপানি মদ) পান করে গান গাইতেন। স্বদেশের স্বাধীনতা ছিল তার কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। স্বাধীনতা ছিলো তার জীবন বাজি রাখা স্বপ্ন।

দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জাপানে। দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে। যুদ্ধের পর দেখেছেন টোকিওর মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল (১৯৪৬-৪৮), যার ১১জন বিচারপতির অন্যতম ভারতীয় প্রতিনিধি বাংলাদেশে জন্ম বিচারপতি রাধাবিনোদ পালকে। পরবর্তী সময়ে বিচারপতি পালের স্নেহধন্য হয়ে ওঠেন। বিচারপতি তাঁকে নিজের পুত্রবৎ মনে করতেন। তিনিই তাঁর গুরুজন শিমোনাকা ইয়াসাবুরোওকে পরিচয় করিয়ে দেন বিচারপতি পালের সঙ্গে। শিমোনাকা জাপানে স্বনামধন্য একজন ব্যক্তি, যিনি একাধারে মর্যাদাসম্পন্ন প্রকাশনা সংস্থা হেইবোনশা পাবলিশার কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষাবিদ, মৃৎশিল্পী এবং শান্তিবাদী প্যান-এশিয়ানিস্ট। পাল-শিমোনাকা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জাপানের আধুনিক ইতিহাসে এক কিংবদন্তিতুল্য অধ্যায়। প্রকৃতপক্ষে, তারা সবাই মনীষী ওকাকুরা তেনশিনের ভাবশিষ্য এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভক্ত। সুতরাং বাঙালির ভাতৃপ্রতিম বন্ধু। পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অধীন এশিয়ার মুক্তি এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের একনিষ্ঠ সমর্থক। ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো, তানাকা মাসাআকি বিচলিত হলেন। তাদেরই রাজনৈতিক সমমনা সহযাত্রী একাধিক বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদ, ক্ষমতাসীন দল এলডিপির সাংসদ মুক্তিযুদ্ধকে প্রত্যক্ষ সমর্থন দিয়ে টোকিওর রাজপথে নামেন, জনমত গঠন করেন এবং ভারতে আশ্রিত শরণার্থীদের জন্য অর্থ তহবিল গঠনে নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন প্রাক্তন মন্ত্রী ও সাংসদ এলডিপি তথা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হায়াকাওয়া তাকাশি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলে পরে ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে একদল সাংসদ ও বিশিষ্ট ব্যক্তি ঢাকায় যান বঙ্গবন্ধুকে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানাতে, হায়াকাওয়ার নেতৃত্বে সরকারিভাবে। এই দলের অন্যতম প্রতিনিধি ছিলেন তানাকা মাসাআকি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইম্পেরিয়াল সেনাবাহিনির বিশেষ ফোর্স ‘এফ-কিকান’ ইন্টেলিজেন্স অপারেশন প্রধান লে. জেনারেল ফুজিওয়ারা ইওয়াইচি। জেনারেল ফুজিওয়ারা ছিলেন নেতাজির ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা। ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে করমর্দনরত ঐতিহাসিক আলোকচিত্র তোলা হয়েছিলো। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু জাপানে এলে পরে যে বিপুল সংবর্ধনা প্রদান করা হয় তার পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন তানাকা। আবেগে, আনন্দে আপ্লুত হয়েছিলেন।

তিনি আমাকে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর যোগ্য উত্তরসূরি। এই বিরলতম ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম ১৯৯৯ সালে ডিসেম্বর মাসের এক রোববারে, তার বাসভবনে। ফোনেই যখন বলছিলাম, আমি বাংলাদেশের নাগরিক, আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই। ভীষণ চমকে উঠেছিলেন। অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল, কোনো বাঙালি তার খোঁজ করবে এতো বছর পর! ১৯৭৫ সালের পর ২৪ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে তখন। তাকে বাংলাদেশ ভুলে গেলেও তিনি বাংলাদেশ ও বাঙালিকে ভুলে যাননি।

অনুরূপ, অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার বঙ্গবন্ধুর বড়মাপের জাপানি বন্ধু ফুকিউরা তাদামাসা স্যারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময়ও। তানাকা মাসাআকি স্যার আমাকে পেয়ে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন আমার মুখের দিকে। শেখ মুজিবুর রহমানের দেশের লোক তার বাড়িতে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেÑ স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিলো। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সংবাদ পেলে পরে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে বাংলাদেশ দূরে সরে যেতে লাগল মিলিটারি শাসনের কারণে। আওয়ামী লীগ এরপর ক্ষমতায় এলেও কেউ কোনোদিন তাকে বা তাদের কাউকে স্মরণ করেননি, বলে আমার কাছে অভিযোগ করেছিলেন। প্রায় দুই ঘণ্টা তার বাসভবনে ছিলাম, নানা কথা হয়েছিল তার কিছু আমার ‘জানা অজানা জাপান’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত আছে। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশের পথে ‘বঙ্গবন্ধু এবং জাপান সম্পর্ক’ গ্রন্থেও থাকবে।

লেখক : রবীন্দ্রগবেষক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়