শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৫ জুলাই, ২০২১, ০২:৪২ রাত
আপডেট : ০৫ জুলাই, ২০২১, ০২:৪২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

আর রাজী: বিশ্ববিদ্যালয় পাস দেওয়া আমার প্রিয় ভাই-বোন-বন্ধু     

আর রাজী: মোহ মিথ্যা অহমিকা আপনার চক্ষু অন্ধ করিয়া রাখিয়াছে কি? যৌবনের আবেগময় স্মৃতি আপনার বিরূপ অতীতের ওপরে মিষ্টি প্রলেপ দিয়া রূঢ় সত্যকে কোমল বা আড়াল করিতেছে কি? সনির্বন্ধ অনুরোধ, চক্ষু মেলিয়া অতীতের দিকে তাকাইয়া দেখুন। আপনারা প্রত্যেকে যার যার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একটিবার নির্মোহ চিত্তে সত্য সন্ধানের মন লইয়া ফিরিয়া তাকান। দেখুন, বিশ্ববিদ্যালয় হইতে আপনি কী পাইয়াছেন আর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজে কী করিয়াছেন? খেয়াল করিয়া দেখুন আদৌ কোনো শিক্ষা-দীক্ষা বা বিদ্যা আপনার বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে দিয়াছিলো কিনা? আপনি আসলেই এমন কী কী পাইয়াছিলেন যাহা আপনার জীবনকে আলোকিত করিয়াছে?

মানুষ হিসাবে আপনাকে উন্নততর করিয়াছে? এমন কিছু কি বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে দিয়াছে যাহা স্বজাতির কল্যাণে-মঙ্গলে আপনাকে সম্পৃক্ত করিতে পারিয়াছে? কিছু কি পাইয়াছেন যাহা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা ব্যতীত অর্জন সুদূর পরাহত হইতো? নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দিকে ফিরিয়া তাকান, খেয়াল করুন, আপনার কতোজন সহপাঠী প্রকৃতই বিদ্যা-সাধনা করিয়াছেন? খেয়াল করিবার চেষ্টা করুন, একই এ্যাসাইনমেন্ট কতোজন নকল করিয়া নম্বর পাইয়াছে? মনে করিয়া দেখুন, কেবল পরীক্ষার আগের রাত্রি কিংবা পরীক্ষার আগের দুই-চারি রাত্রমাত্র জীর্ণ সনাতন সামান্য কয়টি চৌথার অনুলিপি পাঠ করিয়া, পরীক্ষা কেন্দ্রে নকল করিয়া, তোলা তুলিয়া আপনার কতো শত সহপাঠী ডিগ্রি লইয়া চলিয়া গিয়াছেন? ভাবিয়া দেখুন, বিদ্যাচর্চা ব্যতীত শতবিধ কর্মে-অপকর্মে, মিছিল মিটিংয়ে; আড্ডা, টিউশানি, মাস্তানি, আয়রোজগারের ধান্ধা আর প্রেম-বন্ধুত্বের চর্চায় আপনাকে কত রাত্রি কতো দিন উৎসর্গ করিতে হইয়াছে?

স্মরণ করুন, কয়টি পাঠ্যপুস্তক আপনি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আয়ত্ত্ব করিতে সাধনা করিয়াছেন? স্মরণ করুন, এমন কোনো শিক্ষা আপনি শ্রেণিকক্ষে পাইয়াছেন যাহা আজও আপনার পাথেয় হইয়া আছে? স্মরণ করুন, যৌবনের প্রারম্ভে দাড়াইয়া কী সব অখাদ্য-কুখাদ্য খাইয়া আপনি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাঁচিয়া ছিলেন! স্মরণ করুন, ছাত্রাবাসে রাত্রি যাপনের কথা, স্মরণ করুন অমন জনঘন কক্ষে বাস করিয়া, ঘুমানোর নাটক করিয়া সুষ্ঠু-স্বাভাবিকভাবে লেখাপড়া সম্ভব ছিলো কিনা?

স্মরণ করুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ডাইনিং-ক্যান্টিনের খাবারের কথা, যেখানে যেন ব্লেড দিয়ে কাটিয়া মাছ-মাংসের টুকরা করা হইতো! স্মরণ করুন সেই সব টয়লেট-বাথরুমের কথা যাহা ভাসিয়া যাইত মল-মূত্র-ময়লা পানিতে! হলের মাস্তান-পাতিমাস্তানদের অন্যায়-অত্যাচারের কথা, রাতভর গোলাগুলি আর বিবিধ অনিশ্চয়তার কথা একবার স্মরণ করিতে চেষ্টা করুন। ওই পরিবেশে বিদ্যা-সাধনা সম্ভব ছিল, বন্ধুগণ?

অনাবাসিক বন্ধুগণ, আপনারা আপনাদের যাওয়া-আসার আমোদ বা মজার কথা এতো বেশি বলেন যে তাহাতে মনে হয় চল্লিশ জনের স্থলে একসঙ্গে একশ জনের যাতায়াতে একের দেহের সাথে অপরের দেহ পিষিয়া যাওয়া, দুই জনের আসনে চার জন বসিয়া যাওয়া, একের মাথার ওপরে অন্যে বসিয়া দিনের পর দিন যাতায়াত বিদ্যার্থীর জন্য বড়ই সহায়ক পরিবেশ! এই যানজটের ধুলিধূসর, কর্দমাক্ত বা জলনিমগ্ন রাস্তায় নিজেদের পরিবহণ থাকাকে আপনারা বিপুল সৌভাগ্য বলিয়া গণ্য করেন জানি কিন্তু ভাবুন তো, এক ঘণ্টার কোনো যাত্রায় অমন পরিবেশে একটি বই মেলিয়া পড়িবারও কোনো অবকাশ ছিল কিনা? শান্তিমত এক মুহূর্তের জন্যও নিজের সঙ্গে নিজেও কোনো আলোচনায় রত হইতে পারিতেন কিনা?

আপনাদিগের শিক্ষকদিগের কথাও স্মরণ করুন। খেয়াল করিয়া দেখুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোটাগ্রস্ত না হইলে কেউ নিজের বিভাগ বা অনুষদ তো দূরের কথা, নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েও সন্তানকে পড়াইতে যান না। কারণ তিনি স্পষ্টতই জানেন, লেখাপড়ার নামে তাহারই ‘দুঃসহকর্মীরা’ কীভাবে শিক্ষার্থীদের জীবন-যৌবন ধ্বংস করিয়া কেবল ‘চাকুরীগত প্রাণ’ মাত্র করিয়া তোলেন!

দেশে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন কোনো অবিচার সংঘটিত হইয়াছে, প্রিয় বন্ধুগণ, তখন কি আপনাদের শিক্ষকদিগের মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করিবার সুযোগ আপনাদের হইয়াছিল কখনো? কখনো কি দেশের কষ্টে, দশের কষ্টে তাহাদের চোখেমুখে কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বা চিন্তার ছাপ দেখিয়াছেন? নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর উপুড় হইয়া পড়িয়া থাকা রক্তাক্ত লাশ তাহাদের জীবনযাত্রায় সামান্য বিঘ্ন ঘটাইয়াছে, এমন দেখিয়াছেন বা শুনিয়াছেন কখনো? নিশ্চয়ই স্মরণ করতে পারেন সেই সব শিক্ষকদিগের মধ্যে কতোজন মহাত্মা ছিলেন আর কতোজন বোধহীন চাকুরিজীবী? আপনি স্মরণ করিয়া দেখুন, শিক্ষার্থীদের মন ও দেহের খবর, তাহাদের পরিবারের খবর কতোজন শিক্ষক রাখিতেন? আপনার কি অনুমান, শিক্ষকরা যাহাদের ‘পড়াইতেন’ তাহাদের অন্তরের বা বাহিরের কোনো খবর তাহারা জানিতেন বা জানিবার চেষ্টা করিতেন? শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে এই অজ্ঞতা নিয়া শিক্ষকতা সম্ভব?

বন্ধুগণ, বুকে হাত রাখিয়া বলুন, যেসব শিক্ষক পাইয়াছেন তাহাদের কত জনের শ্রেণি-বক্তৃতা সত্য সত্যই আপনাকে জ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট করিয়াছে? কতোজনের জীবনদর্শন আপনার চেতনাকে নবরূপে উদ্বোধিত করিয়াছে? কতোজন চোথা দেখিয়া জাবর কাটিয়াছেন আর কতোজন যেকোনো একটি পুস্তক বা স্থান হইতে কিছু একটা টুকাইয়া আনিয়া পাঠদান চালাইয়া গিয়াছেন দিনের পর দিন? কতোজন কেবলি গালগল্প করিয়া পার করিয়াছেন শ্রেণিকক্ষের সময়?

বন্ধুগণ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন লইয়া আপনাদের আহ্লাদিত স্মৃতি-মন্থন সত্যকে রুদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয় লইয়া আপনাদের মিথ্যা আত্মপ্রসাদ মিথ্যা অহঙ্কার এক ভয়ঙ্কর পরিণতি তৈরি করিয়াছে। সত্য গোপন করিয়া আপনি কেবল আপনার উত্তর-পুরুষের গ্লানিময় জীবন নিশ্চিত করিতেছেন। আপনারা যদি বাস্তবতা স্বীকার না করেন, যদি সত্য উপলব্ধি করিতে না পারেন তবে জানিবেন, এই দেশে এই সব অবিচার ও দুরবস্থার অবসান কোনো কালে হইবে না। কোনো দিন এই সব বিশ্ববিদ্যালয় মনুষ্যযোগ্য ক্ষেত্র হইয়া উঠিবে না। সত্য উচ্চারণ না করা পর্যন্ত আপনার সন্তানরা আপনারই মতো কেবলই সংসার-সঙ্গম আর শয়তানী করিয়া জীবন পার করিয়া দিবেন। সৃষ্টির সুখ, জ্ঞানের মাধুর্য্য, পরহিতের আনন্দ, স্বজাতির কল্যাণ তাহদেরও অধরাই থাকিয়া যাইবে। মানুষ হিসেবে নিখিল বিশ্বে মর্যাদার আসন সুদূর পরাহতই থাকিয়া যাইবে।                                      লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়