প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কামরুল হাসান মামুন: আমরা বিজ্ঞান পড়তে গিয়েও বিজ্ঞানকে ধর্মের লেন্স দিয়ে বিচার করি

কামরুল হাসান মামুন : ইউনিভার্স সৃষ্টি রহস্যের এখন পর্যন্ত সেরা মডেল “Big Bang” থিওরি। পৃথিবী হলো এই ইউনিভার্সের হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ গ্রহ নক্ষত্রের কেবল একটি গ্রহ মাত্র। ইউনিভার্স সৃষ্টির পরে প্রথমে এলিমেন্টারি পার্টিকেল তৈরী হয়। তারপর একটু কমপ্লেক্স এলিমেন্টস এবং মলিকিউল তৈরী হয়। এরপর এরপর পৃ-বাইওটিক কম্পিউন্ডস তৈরী হয়। এরপর মলিক্যুলার ডাইভারসিটি অর্থাৎ নানা ধরণের মলিকিউল তৈরী হয়। এরপর ধীরে ধীরে কমপ্লেক্স মলিকিউল তৈরী হয়। এই কমপ্লেক্সিটির মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পেতে একসময় অর্গানিজম বা এক-কোষী প্রাণীর জন্ম। সেই থেকে ডাইভারসিটি আর কমপ্লেক্সিটি যোগ হতে হতে আজকের জীব বৈচিত্র। এইতো হলো আমাদের গ্রহের প্রাণীকুলের সৃষ্টি রহস্যের এখনকার জ্ঞান যার মুলে হলো বিবর্তন তত্ব। তবে এটাই শেষ কথা না। আবার এইটাকে অবিশ্বাস করে আমরা জ্ঞানের সিঁড়িতে থাকতে পারবো না। আর জ্ঞানের সিঁড়িতে না থাকলে জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নত হতে পারব না এবং ঠিক এইখানেই আমাদের সমস্যা। সেই সমস্যার কিছু নমুনা দিচ্ছি।

গত ২৬-শে জুন বিখ্যাত নিউ সায়েন্টিস্ট ম্যাগাজিনে “ড্রাগন ম্যান” নামের ১.৫ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ বছর আগের প্রাচীন মানুষের একটা নতুন প্রজাতি পাওয়া যাওয়ার বিজ্ঞানীদের দাবি নিয়ে একটি পোস্ট দেই। তার প্রেক্ষিতে কমেন্ট থ্রেডে কিছু কমেন্ট কাট ্ পেস্ট করছি। (১) ” আদম আঃ পৃথিবীর প্রথম মানুষ, তাহলে আমাদের পূর্বসূরিরা আসল কিভাবে?” (২) “বিবর্তনের মতো গোঁজামিলের তত্ত্ব এই মহাবিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই”। (৩) “বিবর্তন যদি সত্য হয়,তাহলে এখন কেন বিবর্তন হয়না?” (৪) “বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের সৃষ্টি তা সত্য নয়। অনেক অনেক তথ্য, সংগ্রহ করেও বিবর্তন মতকে সঠিক হিসেবে পাইনি।” (৫) “বিবর্তন একটা অবৈজ্ঞানিক এবং গাঁজাখুরি ত্বত্ব।” (৬) “ধরেন কয়েক বালতি বিভিন্ন রং আর একটা ক্যানভাস। এগুলো কোটি কোটি বছর ধরে একটা রুমে রেখে দেয়া হলো।তারপর সেগুলো থেকে অটোমেটিক বিবর্তনে মোনালিসা বা The last supper বা আমাদের জয়নুল আবেদিনের “মনপুরা-৭০” আকা হয়ে গেলো। উপরুক্ত ঘটনাটা ঘটার সম্ভাব্যতা যত, স্যার বিবর্তন ঘটার সম্ভাবনাও তত।”
চার্লস ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব নিয়েও আলোচনা সমালোচনা এখনো আছে।

গত সপ্তাহেই বিশ্বসেরা ম্যাগাজিন “Science”-এর একটি আর্টিকেলে ডারউইনকে তুলাধুনা করে ছেড়েছে। কিন্তু তার মূল তত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন বা সমালোচনা যা আছে সেটা হলো ফাইন ডিটেইলস নিয়ে। সমালোচনা আছে ডারউইনের বর্ণবাদী মানসিকতা নিয়ে। সমালোচনা আছে নারীর প্রতি তার অসম্মান নিয়ে। সমালোচনা আছে ডারউইনের আরো অন্যান্য মতবাদ নিয়ে। কিন্তু বিবর্তনের স্পিরিট নিয়ে কোন প্রকার সন্দেহ কোন বিজ্ঞানীর নাই। প্রাণীর বিবর্তন বাদ দিলাম কোন স্মার্ট ফোন কোম্পানি যদি গবেষণার মাধ্যমে আরো ভালো, আরো ফাস্ট, আরো উন্নতমানের নতুন নতুন মডেল না বানায় কোম্পানিইতো টিকবে না। টিকে থাকার মূলমন্ত্রই হলো বিবর্তন।

এরপর স্পেস থেকে তোলা রাতের পৃথিবী কেমন দেখায় তার একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলাম। সেটা নিজের ওয়ালে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক্স স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনে পোস্ট করেছিলাম। সেখানকার মন্তব্যেও আমি হতবাক। অনেকেই মন্তব্য করেছে “এইটা fake”! ওই ভিডিওতে যেমন দৃশ্য দেখা গেছে সেইরকম দৃশ্য যারা রাতেরবেলা বিমানে ভ্রমণ করেছে তারাও দেখে থাকবে।

সেখানকার কিছু মন্তব্য কাট & পেস্ট করছি (১) “This is fake it cannot be night whole earth at a time!” (২) “ঠিক বুঝতে পারছি না। পৃথিবীর সব প্রান্তেই তো রাত থাকার কথা নয়। নাকি আমি ভুল করছি।” (৩) “ফেইক মনে হচ্ছে।” (৪) “এটা দেখে তো মনে হয় সারা পৃথিবীর সব জায়গায় একসাথে রাত চলছে।” (৫) “ছবি সুন্দর। তবে কেমন যেন এলোমলো মনে হচ্ছে।” এইসব পড়লে অবাক হই। ভাবি রাতেরবেলা ঢাকা দুবাই, ঢাকা-দোহা, কিংবা ঢাকা-ইস্তাম্বুল প্লেন জার্নি করলেও প্লানের জানালা দিয়ে তাকালে এইরকম চিত্র দেখা যায়।

যেই ভিডিওটি শেয়ার করেছিলাম সেটি ১ মিনিটেরও কম সময়ের। আর ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্যাটেলাইট ৯৩ মিনিটে একবার পৃথিবী ঘুরে। অর্থাৎ এই ১ মিনিটেরও কম সময়ের ভিডিও দেখে রাতদিন দেখার চিন্তা আসলো কেন?

উপরের মন্তব্যগুলো কিন্তু এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাই সদস্যদের কাছ থেকে। যে যেই বিষয়েই পড়াশুনা করুক না কেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট করার পরও এই সামান্য বিষয়েই যদি এত খটকা থাকে তাহলে তারা ভালো পিতামাতা হবেন কিভাবে? শিশুদের বাবা-মাইতো সন্তানের প্রাথমিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে পাশ করা শিক্ষিতরা যদি এমন মন্তব্য করে সেখান থেকে বোঝা যায় আমাদের শিক্ষাটা পরিপূর্ণ হচ্ছে না।

এর মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আমরা বিজ্ঞান পড়তে গিয়েও বিজ্ঞানকে ধর্মের লেন্স দিয়ে বিচার করি। অথচ এই দুটি mutually exclusive বিষয়। একটাকে আরেকটা দিয়ে সিদ্ধ করতে গিয়েই সকল বিপর্যয়ের অবতারণা। এর ফলে বিজ্ঞান পড়তে ফিয়ে খটকার মধ্যে পরে যায়। এমনও দেখা যায় বিজ্ঞান পড়ে বিজ্ঞানী হয়েছে, প্রকৌশলী হয়েছে, ডাক্তার হয়েছে কিন্তু বিজ্ঞানকে ধারণ করে না। কেবল বিজ্ঞানকে কেবলই রুটিরুজির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে। বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের মাঝেই এইটা বেশি দেখা যায়।

অথচ মুসলমানরা এক সময় জ্ঞান বিজ্ঞানে অনেক এগিয়ে ছিল। কখন সম্ভব হয়েছিল? যখন তারা বিশ্বের নানা প্রান্তের সকল জ্ঞানকে অনুবাদ করে পড়তে শুরু করল। elgebra, algorithm ইত্যাদিসহ জ্ঞান বিজ্ঞানের নানা শাখায় মুসলমানদের অনেক ভূমিকা আছে। জ্ঞান একটা ইউনিভার্সাল জিনিস। জ্ঞানকে ধর্মের লেবাস দিলে চলবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন ধর্মের মানুষরা নিত্য নতুন যেইসব জ্ঞান সৃষ্টি হচ্ছে তা সকলের জন্য। Thanks God যে মুসলমান, হিন্দু, খৃস্টান, ইহুদি যে যেই ধর্মেরই হউক না কেন সৃষ্ট জ্ঞানকে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য উম্মুক্ত করেছে। যদিও প্রযুক্তি সকলের জন্য উম্মুক্ত নয়। এইখানে মানুষ সংকীর্ণতার পরিচয় দিচ্ছে। কপি রাইট, পেটেণ্ট ইত্যাদির মাধ্যমে জ্ঞানকে কুক্ষিগত রাখার এক ধরণের মানসিকতা আমরা দেখতে পাই। বর্তমানে আমরা একটা অতিমারীর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। সেখানে ভ্যাকসিন নিয়েও বাণিজ্য দেখা যাচ্ছে। অথচcooperation, social learning, and cumulative culture হলো মানুষের সফলতার মূল মন্ত্র।

লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত