প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কাজী হানিয়াম মারিয়াম: দেশের মানুষ সার্টিফিকেটের কাগজ পেলেই খুশি থাকে শেখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবে না

কাজী হানিয়াম মারিয়াম: মনে করুন বা ধরুন, কোনো এলাকার একটি স্বনামধন্য কলেজ একটি স্বনামধন্য বিবিশ্ববিদ্যালয়ের পেটের ভিতরে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি অনেকটা কাক হয়ে কোকিলের (কলেজ) ডিমে তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কলেজের একটি বিজ্ঞান বিষয়ের জন্য বরাদ্দ আছে তিনটি রুম যার মধ্যে একটি শিক্ষকদের বসার রুম, একটি ক্লাসরুম এবং একটি ল্যাব কাম ক্লাসরুম। ক্লাস থাকলে ক্লাস হয়, ল্যাবের সময় ল্যাব হয়। এই তিনরুমের বিভাগের ছাত্রসংখ্যা হলো প্রায় হাজার খানেক এবং তাদের দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র তিনজন শিক্ষক। তারমধ্যে দুজন স্টেশনে উপস্থিত আরেকটি পোস্ট ফাঁকা। এই বিভাগের ছাত্রদের কাছে আপনি কী আশা করেন? তারা বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী হবে? বিজ্ঞানের ছোঁয়াও যদি গায়ে লাগে তাদের তাহলে কী অনেক বেশি চাওয়া হবে না। এই চিত্র হলো ঢাকার কয়েকটি বাদে প্রায় সবগুলো সরকারি কলেজের। বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে তারা অনার্স-মাস্টার্স করাচ্ছে কিন্তু তাদের কোনো ল্যাবরেটরি সেটআপ নেই। ছাত্ররা কী পড়ে বিজ্ঞান শিখবে তা কর্তৃপক্ষের দেখার বিষয় নয়। শুধু জাতে ওঠার জন্য কলেজগুলোতে অনার্স খুলতে হবে। আচমকা এরকম একটি হঠকারী সিদ্ধান্তে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ বানানো হলো যেটার ক্ষতিকর প্রভাব পুরোটাই ছাত্ররা বহন করছে।

এমনই আরেকটি হোমওয়ার্ক ছাড়া সিদ্ধান্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যেতে হয় সেই ছাত্রদের পরীক্ষা নিতে। সে এক লুকোচুরি খেলা। সেখানকার শিক্ষকদের মতে সব ক্লাস-ল্যাব যথাযথভাবে হয়েছে, কিন্তু ১/২ জন বাদে প্রায় সব ছাত্রই কেন জানি ল্যাবে এসে পরীক্ষার দিন প্রথম যন্ত্রপাতি দেখে! এই ধরা খাওয়া চেহারা দেখে আপনি বুঝতে পারবেন না তাকে আসলে যাচাই কী দেখে করবেন। কোনো রকমে প্রশ্ন করে, সেটার উত্তর নিজেই দিয়ে আপনি দায়িত্ব শেষ করবেন কাকের মত এবং ভুলে যাবেন। পরের বছর আবার পরীক্ষা নিতে গিয়ে কা কা করবেন। এসব করতে করতে আপনি শিক্ষক থেকে কেরানী হয়ে যাবেন। কলেজের শিক্ষক খুশি যে এই ব্যাচের ঝামেলা শেষ হলো, ছাত্র খুশি যে এযাত্রায় বেঁচে গেলো এবং কলেজে পড়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট পেলো। খেলা শেষ। মাঝখান থেকে ছাত্ররা কিছুই শিখলো না। দেশের মানুষ সার্টিফিকেটের কাগজ পেলেই খুশি থাকে, শেখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবে না। ঠিক এমনই আরেকটা ভুল সিদ্ধান্ত হবে সব জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় খোলা। বিশ্ববিদ্যালয় মানে একটা বিল্ডিং নয় যেটা জেলায় জেলায় উঠিয়ে ফেললেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত হয়ে যাবে। দুঃখের কথা হলো, জনপ্রতিনিধিদের নির্বাচনী ইশতেহারে থাকে যে এলাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করা হবে। তার চেয়েও মজার ব্যাপার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত-নৃত্যের মতো বেশকিছু কলাবিভাগের বিষয়েও অনার্স করা যায়। আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়ন মানে অবকাঠামো নির্মাণ, কয়েক’শ লোকের চাকরির সংস্থান। বেশকিছু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেখানে মেধাবী মানুষজন বাইরে থেকে বড় বড় ডিগ্রী নিয়ে এসে শিক্ষক হিসেবে জয়েন করে কেরানী হয়ে বসে আছেন শুধুমাত্র ল্যাবরেটরির অভাবে। সেদিকে কি একটু নজর দিবেন। গবেষণার জন্য দশ লাখ বরাদ্দ চাইলে আপনি একলাখ দিবেন, আবার উন্নত গবেষণা চাইবেন। কেমন যেন শ্যাওলা-পুকুরের শিশির আদান-প্রদানের প্রবাদের মতো।

একজন সদ্য বিদায়ী অধ্যক্ষকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার সময়ে কলেজের কী কী পরিবর্তন হয়েছে। উনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বহু উন্নয়নের কথা বললেন যার মধ্যে ছিলো কলেজের মাঠ সংস্করণ, বিল্ডিং ঠিককরণ, নিজের এবং শিক্ষক কমনরুম আধুনিকীকরণ, সাময়িকী বের করা এবং শিক্ষা অফিস থেকে দুটো নতুন বিভাগ খোলার অনুমোদন এনেছেন। যার কলেজের চালু বিভাগসমূহের নিজস্ব রুম-ল্যাব নেই, তিনি আবার নতুন বিভাগ খোলার অনুমতি নিয়েছেন। শিক্ষক যদি শিক্ষাবিস্তারের থেকে নিজের নাম ফাটানোর কথা বেশি চিন্তা করেন তাহলে আর কিছু বলার থাকে না। কোথায় বিভাগগুলোর জন্য আধুনিক ল্যাবের ব্যবস্থা করবেন তা নিয়ে চিন্তা না করে, ছাত্রসংখ্যা বাড়ানোতে মনযোগ বেশি। তাহলে পরিবর্তন কীভাবে হবে। মূল উন্নয়ন থেকে তার কাজ কয়েকশ মাইল দূরে।

আমি জানি না জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় খোলার মতো ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্তের পেছনে আদতে কোনো উপদেষ্টা আছেন কিনা। তারা কী শিক্ষানুরাগী নাকি জনপ্রতিনিধি? দয়া করে একটু পড়াশোনা করে সিদ্ধান্ত নিন। নতুন খোলার আগে পুরানো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার করুন। ল্যাবগুলো আধুনিক করুন। সেই পুরানো আমলে যন্ত্রপাতি ঘষে ঘষে আর কতো দিন চলবে। জং ধরে যাচ্ছে যে। ফেসবুক থেকে

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত