প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়ছে তাপমাত্রা-বজ্রপাত

নিউজ ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়ছে তাপমাত্রা, এর ফলে বেড়ে গেছে বজ্রমেঘ। দেশে উঁচু গাছ কমছে দিন দিন। এতে বজ্রপাত সরাসরি ফসলের মাঠ বা খোলা জায়গায় থাকা মানুষের ওপর আঘাত হানছে। এ ছাড়া সচেতন না হওয়ায় দুর্যোগের সময় মানুষ এখনো নিরাপদ স্থানে থাকছে না। এসব কারণেই দেশে বজ্রপাত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। দেশে বজ্রপাতে গত রবিবার এক দিনেই ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর গেল সাত দিনে অর্ধশতাধিক লোকের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে হাওরাঞ্চলে, যাদের বেশির ভাগই কৃষক। কয়েক বছর ধরে ঝড়বৃষ্টির মৌসুমে সাধারণত বজ্রপাতে ৩০০ থেকে ৪০০ লোকের মৃত্যু হচ্ছে।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে ভেনিজুয়েলা ও ব্রাজিলে। সেখানকার চেয়েও বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা বেশি। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা অসচেতনতাকেই বেশি দায়ী করছেন। তাঁরা বলছেন, কোন পরিস্থিতিতে ঘরে থাকতে হবে, সেটা সাধারণ মানুষ জানে না। জানলেও অনেকে মেনে চলে না।

তবে থাইল্যান্ডে তালগাছ লাগিয়ে এবং ভিয়েতনামে উঁচু টাওয়ারের মাধ্যমে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা কমিয়েছে। এ ছাড়া অনেক দেশই বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড ব্যবহার করছে। অথচ বাংলাদেশে প্রতিবছর বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে। সরকার ২০১৬ সালে একে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা দিলেও তেমন কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও বাতাসে সিসার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, বনভূমি বা গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছ কমে যাওয়া, জনজীবনে ধাতব পদার্থের ব্যবহার ও মোবাইল ফোনের টাওয়ারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট ও নদী শুকিয়ে যাওয়া বজ্রপাতের কারণ। এ ছাড়া সব ভবনে বজ্রপাত নিরোধক রড ব্যবহার করার বিধান থাকলেও রাজধানীতে মানা হলেও অন্য জায়গায় তা আমলেই নেওয়া হয় না।

জানা যায়, আগে সাধারণত প্রতি বাড়িতেই তালগাছ, নারিকেলগাছ, সুপারিগাছ থাকত। এ ছাড়া মাঠের মধ্যেও তালগাছ ও বটগাছ থাকত। আর বজ্রপাত যেহেতু ভূপৃষ্ঠের উঁচু জায়গায় পড়ে থাকে, তাই গাছ মানুষকে রক্ষা করত। কিন্তু এ ধরনের উঁচু গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, ‘বজ্রপাত প্রথমেই খোঁজে উঁচু গাছ। সেটি না পাওয়ায় মাঠ, হাওর বা খোলা জায়গায় যদি কোনো মানুষ থাকে তাহলে সে-ই থাকে সবচেয়ে উঁচুতে। তাই তাদের ওপরই বজ  পড়ে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে বজ্র মেঘ তৈরির প্রবণতা বেড়ে গেছে। ফলে আগের চেয়ে বজ পাতের সংখ্যা বেড়েছে। গত ৩০ বছরের চেয়ে তাপমাত্রা এক থেকে দেড় ডিগ্রি বেড়েছে।’

বজ্র পাত থেকে রক্ষায় এই আবহাওয়াবিদ বেশ কিছু পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমত মানুষকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে এপ্রিল, মে ও জুন মাসে বেশি বজ পাত হয়। এই সময়ে ঘরের বাইরে বের হওয়ার আগে আবহাওয়া পরিস্থিতি দেখতে হবে। আর বজ পাত শুরু হওয়ার আগে কিছুটা বোঝা যায়। তখন নিরাপদ জায়গায় যেতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বজ  নিরোধক দণ্ড বসাতে হবে। সবাইকে তাল, নারিকেল ও সুপারিগাছের মতো উঁচু গাছ লাগাতে হবে। আর বজ পাতের সময় গাছের নিচে থাকাটাও নিরাপদ নয়। অন্তত গাছের গোড়া থেকে ১০ হাত দূরে উপুড় হয়ে থাকতে হবে। এ সময় ব্যবহার করতে হবে রাবারের স্যান্ডেল।’

জানা যায়, বজ্র পাতের আগাম সংকেত জানতে এরই মধ্যে দেশের আট স্থানে বসানো হয়েছে লাইটেনিং ডিটেকটিভ সেন্সর। আটটি সেন্সরে উঠে আসবে পুরো দেশের চিত্র। প্রতিটি সেন্সর থেকে এক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত তদারকি করা যাবে। এক মৌসুমে (এপ্রিল থেকে জুন) দেশে কতবার বিদ্যুৎ চমকায় এবং বজ পাত হয় সেটিও সংরক্ষণ করা হবে। গেল কয়েক বছর ধরেই সেগুলো পরীক্ষামূলকভাবে চলছে।

বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে সারা দেশে তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। কিন্তু সে উদ্যোগেও গতি নেই। কর্মকর্তারা জানান, বিপুলসংখ্যক গাছ পেতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। এরই মধ্যে ২৮ লাখ বীজ লাগানো হয়েছে। তবে তালগাছ বড় হতে কিছুটা সময় লাগে। ফলে অধিদপ্তর বলছে, গাছ লাগানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেই প্রক্রিয়া শুরু হতে আরো কিছুটা সময় লাগবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. তৌহিদা রশীদ বলেন, ‘বজ পাত থেকে বাঁচতে সচেতনতাই হচ্ছে আসল। বজ পাতের আগের ও পরের মুহূর্তগুলো বুঝতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এর পূর্বাভাস কৃষক পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। বজ পাতের সময় ঘরে থাকতে হবে। এ ছাড়া অনেক দেশই বজ পাত থেকে বাঁচতে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বজ পাতের ৩০ মিনিট আগে সাইরেন বাজাচ্ছে। বজ পাত নিরোধক দণ্ড ব্যবহার করছে। আমাদেরও সেসব ব্যবস্থা নিতে হবে।’

সূত্র: কালের কণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত