প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খাঁচার ভেতর থেকে বাইরে আসছে নারীরা, সেটাই বিস্ময়!

কামরুল হাসান মামুন, ফেসবুক থেকে, গতকাল সকালে জগিং করতে গিয়ে হঠাৎ জুতার ফিতা খুলে গিয়েছিল। বসে যখন ফিতা লাগাচ্ছিলাম তখন তিন চারজন মধ্য বয়সী লোকের আলাপচারিতা কানে আসলো। উনাদের মধ্যে একজনকে একই জায়গায় প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম করতে দেখি বাকিদের আমি কখনো খেয়াল করিনি। উনাদের আলাপের বিষয় ছিল উনাদের স্ত্রী এবং সবাই একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন যে “মেয়েদের বুদ্ধি হাঁটুতে”। নিজের স্ত্রী সম্মন্ধে এমন ধারণা কেমন করে পোষণ করে আর কেমন করে তা অন্যদের কাছে প্রকাশ করে? এ কেমন সম্পর্ক তাদের? এমন কথা শোনার পর আমার দুই কন্যা, আমার স্ত্রী, আমার মা, আমার বোন, আমার নারী সহকর্মী, আমার ছাত্রী এবং আমি এখন যে এক অত্যন্ত খ্যাতিমান মেধাবী নারী বিজ্ঞানীর (ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্ণিয়া -ডেভিসের অধ্যাপক) সাথে কাজ করছি তাদের কথা মনে পড়ল। আমি যাদের এত ভালোবাসি, যাদের জ্ঞানবুদ্ধিতে আমি মুগ্ধ তাদের সম্মন্ধে কিছু পুরুষের এমন মন্তব্য শুনে সকালবেলাই মনটা খারাপ হয়ে গেল। শুধুই কি এই একটা মন্তব্য? তাহলে শুনুন মাত্র গত তিনচার দিনে ফেইসবুকের ঘটনা।

দুই-তিন আগে পুরুষদের চার বিয়ে নিয়ে এক স্ট্যাটাসে আমি এই কমেন্টটি করেছিলাম: একজন নারী কি ৪ বিয়ে করতে পারবে যদি সে ৪ স্বামীর ভরন পোষণ করতে পারে? কোন পুরুষ যেমন তার স্ত্রীর একই সাথে আরো ৩টি স্বামী থাকুক চাইতে পারেনা তেমনি কোন নারী তার স্বামীর আরো ৩টি স্ত্রী থাকুক সেটা চাইতে পারেনা। তার উত্তরে একজন কমেন্ট করেছেন “প্রশ্নটা এইভাবেও করা যায়: একজন নারী কি পুরুষ কে গর্ভবতী করতে পারবে? যদি পারে তাহলে আপনার কনক্লুশন ঠিক আছে আর যদি না পারে তাহলে আপনার প্রশ্নটাই ভুল।” দেখুন অবস্থা গর্ভবতী করতে পারা নিয়েও পুরুষের কি পরিমান গর্ব আর কি পরিমান হেডম বোধ করে। বাংলাদেশের অনেক মানুষ চার বিয়েকে সমর্থন করে। যারা সমর্থন করে তাদের মায়ের স্বামী কিংবা বোনের স্বামী, কিংবা কন্যার স্বামী যখন চার বিয়ে করতে যায় তখন তাদের মন কাঁদে। মায়ের স্বামী বিয়ে করলে সৎ মা এবং পারলে বাবাকেও মেরে ফেলে।

গতকাল শিহাব শাহীনের “অহং” নাটকটি দেখে এক স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম “কাজের কোন জেন্ডার নেই”। আমার সেই স্টেটাসকে শেয়ার করে সেখানে একজন লিখেছে: “আসলে কাজের ক্ষেত্রে আমরা কি দেখি? আমাদের বউ ও মা জননীগণ সংসারে অনেক কাজ করেন। সারাদিনব্যপী। কিন্তু পেশা হিসেবে এ কাজটা যখন কোনো পুরুষ করে সেক্ষেত্রে দক্ষতার ছাপ আরো বেশি থাকে। বড় বড় হোটেলের শেফদের দেখুন।অফিসে কাজের ক্ষেত্রে নারীরা বেশি ডিসিপ্লিন মেইনটেন করেন। কিন্তু কাজের আউটপুটের ক্ষেত্রে পুরুষ বেশি দেয়।ক্ষেতে? ধানের রোয়া রোপনে পুরুষ অবশ্যই এগিয়ে থাকে। মিডলইস্টে কনস্ট্রাকশন ফিল্ডে ঘামের বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে প্রায় চল্লিশ কেজি ওজনের ইট উঠা নামানোতে পুরুষের ধারের কাছেও যেতে পারবে না নারীরা। অবশ্য এই কাজ করা লোক গুলা মনে হয় পুরুষও না।এদের হাত হয়ে যায় ছোগলা উঠা কাঠের মত।ফিংগার প্রিন্ট থাকে না। রিকশা চালানো? শেখ হাসিনার পেছনে অদৃশ্য লম্বা লম্বা সারি সারি বেঞ্চে বসে আছেন এইচ টি ইমাম,সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত,গওহর রিজভি, আমির হোসেন আমু, ওবায়দুল কাদেররা। এখনো উন্নত দেশের এয়ারলাইন্সে নারী পাইলটনী হলে সেটা যাত্রীদের জানানো হয় না। ঘোষনায় পাইলটনীর নাম বলে না। মাশরাফি বা তাসকিন বা সৌরভ আক্তার যত জোরে বল করতে পারে তত জোরে সামিরারা পারে না।” বড় আফসুস লাগে যে কেমন একটা বাবলের মধ্যে এদের বসবাস। এর উত্তরে আমার নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বলি।

আমি তখন পিএইচডি করতে লণ্ডনে। এক খ্রীষ্টমাসে আমরা কয়েকজন বন্ধুবান্ধব মিলে একটি সুপারসপে কাজ করি। কাজের সময় রাট ১২ টা থেকে ভোর পর্যন্ত। কাজটি ছিল সারা দিনে দোকানের শেলফে রাখা পণ্যগুলো বিক্রি হয়ে যাওয়ায় খালি হয়ে যায়। ফলে গোডাউন থেকে পণ্যগুলোর বাক্স এনে খেলে পুনরায় সাজিয়ে রাখা। একবার বেশ বড় একটি বাক্স উপর থেকে নিচে নামাতে চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। হঠাৎ একজন লম্বা মেয়ে এসে বলল “can I help you?” বলেই দ্রুত বক্সটি নামিয়ে দিল। ধন্যবাদ দেওয়ার আগেই দ্রুত সে তার কাজে ফিরে গেল। শুধু তাই না। ওখানকার মেয়েরা যত দ্রুত হাঁটতে পারে তাদের সাথে বাংলাদেশের অধিকাংশ পুরুষরাই পারবে না। তাহলে ফারাকটা কোথায়? পার্থক্যটা হলো পরিবেশ। ওখানকার মেয়েরা ছোটবেলা থেকে ছেলেদের মত ঘরের বাহিরে মাঠে খেলতে যেতে পারে, ঘুরতে পারে, আড্ডা মারতে পারে। এই পারাটা কিন্তু ইউরোপের গত ১০০ বছরের ইতিহাস। ১০০ বছর আগেও ইউরোপে নারীদের ভোটের অধিকার ছিল না, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়তে পারতো না। তাহলে নারীদের বাহিরে যাওয়ার ইতিহাসটা যদি ৫০০ বছর হতো কিংবা ৫০০০ বছর হতো? বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা? আমাদের দেশে কেবল শুরু হয়েছে। তারপরেও অনেক বাঁধা। অনেক ট্রাইবাল গোষ্ঠী আছে যেখানে পুরুষরা ঘরের কাজ করে নারীরা বাহিরের কাজ করে। মিনা কার্টুনের একটা সিরিজের কথা মনে পরল। রাজুর মনে হলো মেয়েদের কাজ সহজ। তাই একবার মিনা প্রস্তাব দিল ঠিক আছে একদিন মিনা রাজুর কাজ করবে এবং রাজু মিনার কাজ করবে। সেইদিন রাজু টের পেয়েছিল মেয়েদের কাজ কত কঠিন এবং তারা কত বেশি কাজ করে।

ছোটবেলা থেকে আমাদের মেয়েদের চলাফেরার গন্ডি ঠিক করে দেওয়া হয়। সর্বদা শুনতে হয় এইটা পারবে না, সেইটা পারবে না, এইটা করোনা, সেইটা করোনা। এইরকম খাঁচার মধ্যে থেকেও কেউ কেউ যে খাঁচার বাহিরে আসতে পারে সেটাই আশ্চর্যের ব্যাপার।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত