প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খান আসাদ: অপরাধবিজ্ঞান দিয়ে অপরাধীকে চিনুন

খান আসাদ: প্রচলিত ধারণা, ধার্মিক হলে, ‘ইসলামী শিক্ষা’ পেলে মানুষ নৈতিকভাবে উন্নত হবে, অসৎ হবে না, দুর্নীতি করবে না, হত্যা বা যৌন সহিংসতার মত জঘন্য ধরনের অপরাধ করবে না। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক কালে, মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন, যৌন অপরাধ, মসজিদের ইমামদের দ্বারা যৌন অপরাধ, হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ অহরহ ঘটছে। ‘ধর্মীয় নেতা’ বা ‘ইসলাম’ প্রচারকারী কিংবা ইসলামের হেফাজতকারী আল্লামা মামুনুলদের নৈতিক অসততা, দুর্নীতি ও প্রকাশ্য সহিংস অপরাধ আমরা সবাই দেখছি।

কেউ বলতে পারেন, ‘ইসলামী শিক্ষা’ দিয়ে নৈতিক উন্নতি হবে, মানুষ অপরাধী হবে না- এই ধারণাটাই ভুল। মাদ্রাসায় শিশুসন্তান পাঠায় যে বাবা মা, সেটা নৈতিকভাবে উন্নত মানুষ হওয়ার প্রত্যাশা থেকে নয়, বেহেস্তে যাওয়ার লোভ থেকে। উদ্দেশ্যটাই হচ্ছে, স্বার্থপরতার, নিজ সন্তানকে ব্যবহার করে, অনন্তকাল সুখ ভোগের লোভ। ফলে, এই ভোগবাদী চিন্তাটা নিজেই অনৈতিক। কেউ বলতে পারেন, অপরাধ আছে, কারণ ‘ছহি ইসলামী’ শিক্ষা নাই। যারা ইসলামের হেফাজত করছে, এরা কেউই ‘ছহি ইসলামী’ নয়। ছহি ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে কোনো অপরাধ থাকবে না। এই যুক্তির মানে হচ্ছে, আরও ‘ইসলামীশিক্ষা’ দরকার। প্রশ্ন হচ্ছে, কে ‘ছহি ইসলামি’ শিক্ষায় শিক্ষিত? এই লোক কোথায় আছে? আপনি একজনকে ‘ছহি ইসলামী’ বলে মনে করলেন, কয়েকদিন পরে দেখলেন সে আল্লামা মামুনুল, তাহলে কি করবেন?

কেউ বলতে পারেন, সমস্যা আসলে ‘ইসলামি শিক্ষায়’। কীভাবে? দেখেন না পাকিস্তানের অবস্থা। ১৯৭১ সালে কারা রাজাকার আলবদর হয়েছিল? ওই ‘ইসলামী শিক্ষায়’ শিক্ষিত হুজুররাই। দেখেন না মাদ্রাসায় কি হচ্ছে? এদের মতে, ‘ইসলামী শিক্ষা’ বন্ধ করে দেন, দেখবেন মানুষ ভালো হয়ে গেছে। সব কিছুর মূলে ধর্মান্ধতা। ধর্ম এই ধারণা দেয় যে অপরাধ করে, ক্ষমা চাইলেই বা হজ্ব করে এলেই শিশুর মতো পবিত্র হওয়া যায়। ধর্মীয় জ্ঞানের এই ভরসা আছে বলেই মানুষ বেশি বেশি অপরাধ করে, ঘুষ খায়, লাম্পট্য করে। সমাজবিজ্ঞান দিয়ে অথবা আরও সুনির্দিষ্টভাবে মনোবিজ্ঞান দিয়ে অপরাধ বোঝার ইতিহাস খুব সাম্প্রতিক। ১৯৬৪ সালে ‘অপরাধ ও ব্যক্তিত্ব’ নিয়ে লিখেন একজন ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী (ঐধহং ঔ. ঊুংবহপশ)। আমেরিকায় ১৯৭২ সালে এফবিআই একটি আলাদা শাখা প্রতিষ্ঠা করে, ‘আচরণ বিজ্ঞান ইউনিট’ নামে। অপরাধীকে বোঝার জন্য, মনোবিজ্ঞান ব্যবহার করার নানা নাম আছে; ফরেনসিক মনোবিজ্ঞান, অপরাধ মনোবিজ্ঞান ও তদন্ত মনোবিজ্ঞান।

ইদানিং মনোবিজ্ঞান কেবল মানুষের আচরণ নিয়ে গবেষণা নয়। মানুষের আচরণ বোঝার জন্য, আক্ষরিক অর্থেই মগজ বা নিউরনের কাজ বোঝা দরকার, যা নিউরো সায়েন্স। এটি একইসঙ্গে বায়োলজি ও কেমিস্ট্রির জ্ঞানও। এই জ্ঞানকে দার্শনিক অবস্থান থেকে বোঝার নাম, নিউরো ফিলসফি। ফলে, অপরাধ বোঝার কাজটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি ও সমাজবৈজ্ঞানিক। অপরাধের জন্য কোনো একক কারণ দায়ী না। যেমনটা ধর্মবাদী বা নাস্তিক্যবাদীরা মনে করেন। ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে কোনোই সম্পর্ক নেই তা বলা যাবে না। যদি ধর্মবিশ্বাস হয় অন্ধবিশ্বাস যা লোভ, ভয় ও সহিংসতাকে বৈধতা দেয়, তখনই সেটি অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু ধর্মবিশ্বাস যদি অন্ধবিশ্বাসের বদলে আধ্যাত্মিক চর্চা হয়, যেমন পরমসত্ত্বা অনুসন্ধান করা, লোভ ও ভয়ের বদলে ভালোবাসার অনুভূতি দিয়ে জগত ও জীবনের সত্য-সুন্দর-কল্যাণ-আনন্দ বুঝতে চাওয়া, তাহলে সে সহজে অপরাধ করতে পারে না।

অপরাধ করার জন্য তিনটে শর্ত দরকার। প্রথমে দরকার চরম স্বার্থপর লোভ লালসা ভোগবাদী চেতনা, এমন সামাজিকায়ন, মতাদর্শ বা বিশ্বাস যে অপরাধের কাজটি তাঁর কাছে ‘সম্ভব’ বা ‘যুক্তিসিদ্ধ’ বলে মনে হয়। দ্বিতীয় শর্ত, মনোবিকলন বা অসুস্থতা যেমন ধর্ষকামিতা। হত্যা বা যৌনসহিংসতা করতে হলে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার মনোবিকলন থাকতে হবে। তৃতীয়ত, ক্ষমতা বা ক্ষমতাবলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক। এই ক্ষমতা হতে পারে, সামাজিক, আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক। বসুন্ধরার পুত্র যখন অপরাধ করে, তার রয়েছে আর্থিক ক্ষমতা। আর ইমাম বা মাদ্রাসার হুজুরের রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ক্ষমতা। এই ক্ষমতার কারণে সে মনে করে যে, অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে।

অপরাধ করার জন্য একটি সামাজিক প্রেক্ষিতও দরকার। ধর্মান্ধ ও ব্যক্তিস্বার্থের ভোগবাদী সংস্কৃতি, দুর্নীতিগ্রস্ত বিচার ব্যবস্থা, বৈষম্য ও শোষণমূলক লুটেরা অর্থনীতি, দুর্নীতিবাজ আমলা-ব্যবসায়ি শ্রেণিনির্ভর রাজনীতি ইত্যাদি। এই রকম সমাজে, নান্দনিক শিল্পকলা ও বিজ্ঞান চেতনার বিকাশ ব্যহত হয়, ফলে অপরাধের চক্রবৃদ্ধি হতে থাকে। অপরাধ থেকে মুক্ত হতে হলে, অনেক আশু পদক্ষেপ দরকার, যেমন মনোবিজ্ঞান দিয়ে অপরাধকে বোঝা ও আইনের প্রয়োগ করার চেষ্টা। কিন্তু সামাজিক প্রেক্ষিত তথা সমাজব্যবস্থা বদলের কাজটিও করতে হবে, যাতে এমন সামাজিকায়ন, সংস্কৃতি ও শিক্ষা মানুষ পায় যে সে আর অপরাধী হবে না। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত