প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংস্কার নয়, স্থায়ী বাঁধেই সমাধান

কালের কণ্ঠ : ঘূর্ণিঝড় ইয়াস সরাসরি আঘাত না করলেও এর প্রভাবে সৃষ্ট প্রবল জোয়ার লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। সাগর থেকে এভাবে একের পর এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে উপকূলীয় জনপদে। তছনছ হয়ে যায় উপকূল রক্ষা বাঁধ। দুর্যোগের পর প্রতিবারই টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি ওঠে। প্রতিশ্রুতিও মেলে। বাড়ে বরাদ্দ। বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণে কিছু কাজও হয়। কিন্তু টেকসই বাঁধ নির্মাণ প্রতিশ্রুতির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে বাস্তবে রূপ পায় না। ভোগান্তির শেষ হয় না উপকূলবাসীর।

সিডরে প্রায় এক হাজার ৫৮০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তী উপকূলীয় ছয় জেলার প্রায় ৭২ কিলোমিটার বাঁধের ক্ষতি হয় ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে। আম্ফানে ক্ষতি হয় ১৬১ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধের। আর সর্বশেষ ইয়াসের প্রভাবে ২৭৭টি পয়েন্টে ৮৮ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার নয়, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে উপকূলীয় জনপদের মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে ১১ হাজার ৪৩০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। তার মধ্যে উপকূলীয় এলাকার সুরক্ষার জন্য রয়েছে পাঁচ হাজার ১৬০ কিলোমিটার বাঁধ। উপকূল রক্ষার এই বাঁধের মধ্যে তিন হাজার ৩০০ কিলোমিটার রয়েছে বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ভোলা ও ঝালকাঠিতে। এই ছয় জেলায় ৮২টি পোল্ডারের আওতায় রয়েছে ৫২৭টি বাঁধ।

পাউবোর বরিশাল অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম সরকার বলেন, ষাটের দশকে নির্মিত বাঁধগুলোর উচ্চতা বিভিন্ন কারণে কমে আসছে। তার ওপর নদীপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। ফলে ঝড়ের প্রভাবে পানি আগের থেকে উচ্চতায় আসছে। তাই বাঁধ উপচে পানি বাঁধের অন্য প্রান্তে পড়ছে। এতে বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। বাঁধের উচ্চতা বাড়িয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা গেলে ক্ষতি কমে আসবে।

পাউবোর বরিশাল আঞ্চলিক প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্র বলছে, বিভাগের ৮২টি পোল্ডারের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের জন্য একটি গ্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বিশ্বব্যাংকের ইসিআরআরপি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১০ সালে বাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু হয়। পরে তহবিল জটিলতার কারণে কাজ বন্ধ থাকে। ২০১৪ সালের জুনে সেই কাজ আবার শুরু হয়। সেই প্রকল্পের কাজ এখনো থেমে থেমে চলছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের প্রায় এক হাজার ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরো একটি প্রকল্প হাতে নেয় পাউবো। এর আওতায় বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরের ছয়টি পোল্ডারের বাঁধ উঁচুকরণে উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫৯ কিলোমিটার বাঁধ উঁচুকরণ এবং বাঁধের ঢাল ব্লক দিয়ে বাঁধাই করার কাজ শুরু হয়। বাঁধ উঁচুকরণের কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে।

খুলনা উপকূলে বাঁধ নির্মাণ হয়েছিল সেই ১৯৬০-এর দশকে। ১৯৮০-এর দশক থেকে ওই বাঁধ কেটে নোনা পানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঁধ কাটা-ছেঁড়ায় ভাঙনের মুখে পড়ে সংরক্ষিত ভূমি চলে গেছে নদীর পেটে। প্রতিনিয়ত নদীর পানির চাপ বাঁধের ওপর পড়ছে। এর ফলে স্বাভাবিক সময়েই পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় জোয়ারের চাপে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দুর্বল বাঁধ ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে একেবারে ধসে যায়। তখন থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ উঁচু, টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় উঁচু ও চওড়া বেড়ি বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। একই কাজের অংশ হিসেবে খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার ৩১ নম্বর পোল্ডারেও বাঁধের কাজ হয়েছে; তবে খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় এই বাঁধের কাজ হয়নি।

পাউবো খুলনা অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকউল্লাহ জানান, খুলনা অঞ্চলে বাঁধের মোট দৈর্ঘ্য দুই হাজার ২০০ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে এবার ১২০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর ২০টি জায়গায় ভেঙে গেছে। এই অঞ্চলের ২৩টি পোল্ডারের মধ্যে খুলনা জেলার তিনটি এবং সাতক্ষীরা জেলার পাঁচটি পোল্ডার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

খুলনা উপকূলভাগে ৮৭০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। জেলার মধ্যে সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রা উপজেলার বাঁধ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে পাউবো সাতক্ষীরা বিভাগ। আইলা ও আম্ফানে এই কয়রা উপজেলার বাঁধ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আইলায় কয়রার পবনা এলাকার সামান্য এলাকার ভাঙন তিন বছরে পাঁচ শতাধিক হাত দীর্ঘ ভাঙনে রূপ নেয়; পরে তা পাউবো বিশাল অঙ্কের বরাদ্দ নিয়ে আটকায়। দাকোপের জালিয়াখালিতে অনুরূপ একটি ছোট ভাঙনের জের ধরে পূর্ব জালিয়াখালি নামের গ্রামটি সম্পূর্ণভাবে ঢাকি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে পাউবো সেখানে একটি রিং (আগের বাঁধ এলাকা থেকে বেশ খানিকটা জায়গা ঘুরিয়ে) বাঁধ দিয়ে এলাকা রক্ষা করে।

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতীরের কুতুবনগর ও বারইকরণ এলাকার ফসলি জমি, মাছের ঘের ও বাড়িঘর রক্ষায় সরকার ২০০০ সালে দেড় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে। কিন্তু টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করায় ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে কিছুটা ক্ষতি হলেও ইয়াসের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসে পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে বাঁধটি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ঝালকাঠি জেলার সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতীরের ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাঝেমধ্যে সংস্কার হলেও বেশির ভাগই অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধের আটটি এলাকার প্রায় চার কিলোমিটার ভেঙে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কাঁঠালিয়া উপজেলার বিষখালী নদীর বেড়িবাঁধের। ৯ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের তিন কিলোমিটাররে বিভিন্ন স্থান ভেঙে পানি ঢুকে পড়েছে। এ ছাড়া সদর উপজেলার গাবখান-ধানসিঁড়ি, দেউরী বেড়িবাঁধ, কৃষ্ণকাঠি এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধ এবং বিষখালীর নদীর হদুয়া এলাকায় বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

ঝালকাঠি পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিব হোসেন বলেন, ঝালকাঠি জেলায় চার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

টেকসই বাঁধের দাবিতে কাফনের কাপড় পরে অবস্থান কর্মসূচি : সাতক্ষীরা উপকূলে জানমালের সুরক্ষায় অবিলম্বে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে কাফনের কাপড় পরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে স্থানীয় লোকজন। গতকাল সকালে শ্যামনগর উপজেলার পাতাখালি পয়েন্টে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধের ওপর এই অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়। উপকূলের শিক্ষার্থীদের সংগঠন ম্যানগ্রোভ স্টুডেন্ট সোসাইটি এই কর্মসূচির আয়োজন করে।

এ সময় ক্ষতিগ্রস্তরা বলেন, ‘১২ বছর ধরে উপকূলের মানুষ ভাসছে। প্রতিবারই এমন পরিস্থিতিতে কর্তাব্যক্তিরা আশ্বাসের বুলি আওড়ান। নানা ধরনের মেগাপ্রকল্পের গল্প শোনান। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ নেই। আমরা বারবার নয়, একবারই মরতে চাই।’

বরগুনার বেতাগীতে ইয়াসের প্রভাবে প্রবল জোয়ারের পানির তোড়ে উপজেলার সাতটি স্থানের বেড়িবাঁধ ভেঙে ২৩টি গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে।

কলাপাড়ায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন : মোহনাসংলগ্ন আন্ধারমানিক নদসংলগ্ন বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন করেছে ভুক্তভোগী গ্রামবাসী। গতকাল সকাল ১১টার দিকে উপজেলার মহিপুরের নিজামপুর গ্রামের বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধে এই কর্মসূচি পালিত হয়। বেড়িবাঁধের ওপর শত শত মানুষ মানববন্ধন করে। গত তিন দিনের আন্ধারমানিক নদে সৃষ্ট জোয়ার ও ঢেউয়ের তাণ্ডবে আংশিক বিধ্বস্ত হয় মহিপুরের নিজামপুর, সুধিরপুর, কোমরপুর গ্রামের প্রায় দেড় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ।

প্রবল জোয়ারে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার মূলঘরে চিত্রা নদীর বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চিত্রা নদীর কয়েকটি অংশ ভেঙে যায়।

সর্বাধিক পঠিত