প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আস্থা হারাচ্ছে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি

বণিক বার্তা:  বাড়তি ছাড়ের আশায় অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) হালট্রিপে উড়োজাহাজের টিকিট কেটে গত বছর বিপাকে পড়েছিল ট্রাভেল এজেন্টসহ বহু গ্রাহক। কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে দেশছাড়া হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এবার লাপাত্তা হলো আরেক ওটিএ ২৪ টিকেট ডটকম। এরই মধ্যে ২৪ টিকেট ডটকমের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এজেন্সিগুলোর অভিযোগ, কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ অবস্থায় অনলাইনভিত্তিক ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উড়োজাহাজ কোম্পানিগুলো সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ শতাংশ কমিশন দেয়। কিন্তু অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলো যাত্রী আকর্ষণে প্রায়ই এর চেয়েও বেশি ছাড়ে টিকিট বিক্রি করে। অনেক সময় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়ে টিকিট বিক্রির অফার দেয়। হালট্রিপ দীর্ঘ সময় ৩০ শতাংশ ছাড় দিয়ে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর কাছে টিকিট বিক্রি করেছিল। কোনো কোনো ওটিএ ফ্রি টিকিট দেয়ার অফারও দেয়। এটা কোনোভাবেই বাজারের স্বাভাবিক আচরণ হতে পারে না বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।

ওটিএ প্রতিষ্ঠান ২৪ টিকেট ডটকমও যাত্রার পর থেকে গ্রাহক টানতে অস্বাভাবিক রকমের মূল্য ছাড় দিয়ে অফার দেয়া শুরু করে। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ নানা উৎসবকে কেন্দ্র করে দেয় বিশেষ অফার ও বিনা মূল্যে টিকিট। এয়ারলাইনসগুলো থেকে ৭ শতাংশ হারে কমিশন পেলেও এজেন্সিগুলোকে কাছে টানতে তাদের কমিশন দেয় ১২ শতাংশ পর্যন্ত। বাড়তি লাভের আশায় অনেক ট্রাভেল এজেন্সি যুক্ত হয় এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।

ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর অভিযোগ, গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটির ফোন নম্বরগুলো। শঙ্কায় অনেকে মহাখালী ডিওএইচএসে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি অফিসে তালা দেয়া দেখতে পান। এক পর্যায়ে অনলাইনে টিকিট বিক্রিও বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটির মালিকের ফোন নম্বরও বন্ধ পেয়ে বাধ্য হয়ে অনেকেই কাফরুল থানায় জিডি ও মামলা করেন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের গ্রামের বাড়িতে গিয়েও তাকে পাননি কেউ।

এরই মধ্যে কাফরুল থানায় কমপক্ষে ২০ জন ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে জিডি করেছেন। ২১ মে আইকন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী মো. ইব্রাহিম একটি জিডি করেন। মো. ইব্রাহিম বলেন, এপ্রিলে তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে তাদের অফিসে গিয়ে দেখি তালা দেয়া। আবদুর রাজ্জাকের ঢাকা ও গ্রামের বাড়িতে গিয়েও তাকে পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে আইনের আশ্রয় নিয়েছি।

জানা গেছে, ২৪ টিকেট ডটকমের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন প্রদ্যুত্বরণ চৌধুরী। তিনি প্রতিষ্ঠানটির একজন পরিচালকও। গত ডিসেম্বরে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দুবাই চলে যান প্রদ্যুত্বরণ চৌধুরী। অন্যদিকে আরেক পরিচালক মিজানুর রহমান ১৯ মে কাফরুল থানায় জিডি করেন। জিডিতে তিনি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকলেও তিনি পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন না। ১ বছর ১০ মাস পর জানতে পারেন শতকোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৯ কোটি টাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কাছে পায়। এসব হিসাব নিয়ে কথা বললে তাকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেয়া হয়েছে।

আবার দুবাইতে থাকা প্রদ্যুত্বরণ চৌধুরীর বাবা পীযূষ কান্তি চৌধুরীও ছেলের পক্ষে সিলেট কোতোয়ালি থানায় জিডি করেন। ২২ মে করা জিডিতে বলা হয়, আমার ছেলে বর্তমানে দুবাইতে আছে। লকডাউনের কারণে দেশে আসতে পারছে না। নিজেদের নিরাপত্তা জন্য তারা এ জিডি করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোকে বরাবরই সতর্ক বার্তা দিয়ে আসছে ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)। আটাবের সভাপতি মনছুর আহমেদ কালাম বলেন, আমরা সবসময়ই অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির বিপক্ষে যাত্রীদের সতর্ক করে আসছি। এর পরও অনেক যাত্রী বেশি ছাড়ের প্রলোভনে পড়ে অনলাইন থেকে টিকিট কিনছেন। ফলে প্রায়ই প্রতারণার কথা উঠে আসছে। গত বছরও হালট্রিপ বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে। এতে অনেক ছোট ছোট ট্রাভেল এজেন্সি পথে বসে গিয়েছিল। এখন আবার ২৪ টিকেট ডটকম নামে আরেকটি ট্রাভেল এজেন্সির নামে এমন অভিযোগ এসেছে। এ অবস্থায় এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক না রাখার জন্য ট্রাভেল এজেন্টদের বলা হয়েছে।

এর আগে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা করা হালট্রিপ এক বছরের মাথায় বেশি ছাড়ে টিকিট বিক্রি করে পুরো পর্যটন খাতে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠানটি টাকা পাচারেও জড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা যায়। বন্ধ হওয়ার আগে তিন বছরে ৪০০ কোটি টাকা জমা হয়েছিল হালট্রিপের ১০টি ব্যাংকের হিসাবে। হালট্রিপের চেয়ারম্যান প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার জালিয়াতির মাধ্যমে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে এখন দেশছাড়া। আর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাজবীর হাসানও দেশে নেই। হালট্রিপের ৯০ শতাংশ শেয়ার পি কে হালদারের, বাকিটা তাজবীর হাসানের।

জানা গেছে, বাংলাদেশে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির আবির্ভাব ২০১৭ সালে হলেও বর্তমানে ৫০টির বেশি এ ধরনের এজেন্সি সক্রিয় রয়েছে। পূর্বাভাস বলছে, ২০২৫ সাল নাগাদ এ এজেন্সিগুলোর মার্কেট শেয়ার দাঁড়াবে প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত। বর্তমানে অনলাইন এ ট্রাভেল এজেন্সিগুলো শুধু টিকিট বুকিং সেবাই দিচ্ছে না, পাশাপাশি তাদের অন্যান্য সেবাও রয়েছে যেমন হোটেল বুকিং, ভিসা প্রসেসিং ইত্যাদি।

ওটিএ ব্যবসা প্রসঙ্গে শেয়ার ট্রিপের প্রধান নির্বাহী কাশেফ রহমান বলেন, প্রযুক্তি উন্নয়ন বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনলাইনে ভ্রমণ চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ট্রাভেল মার্কেটে এক বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। তবে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের অপেশাদারী আচরণের কারণে খাতটি বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এজন্য অনলাইন টিকেটিংয়ের নতুন এ ধারার সঠিক ও সুস্থ বিকাশের জন্য সরকারের তরফ থেকে পলিসি সাপোর্ট এবং কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন।

ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম এ প্রসঙ্গে  বলেন, হালট্রিপের ঘটনায় গত বছর দেশের অন্য অনলাইন ট্রাভেল এজেন্টের প্রতি গ্রাহকদের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল। আবারো ২৪ টিকেট ডটকমের ক্ষেত্রে একই পরিণতি হলো। করোনা মহামারীর এ সময়ে যা এ শিল্পের জন্য ভালো লক্ষণ নয়। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্টরাই মূলত এ ব্যবসায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। যারা গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেবা দিচ্ছে, তাদের সুরক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহকদেরও সচেতন হতে হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিক যাত্রা করে অনলাইন টিকেটিং এজেন্সি ২৪ টিকেট ডটকম। রাজধানীর মহাখালী ডিওএইচএসে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এএইচএম শফিকুজ্জামান। তখন প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, ২৪ টিকেট ডটকম ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিডি ট্যুরিস্টের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। বিডি ট্যুরিস্টের একক মালিকানায় রয়েছেন মো. আব্দুর রাজ্জাক। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় রয়েছেন পাঁচজন। তারা হলেন নাসরিন সুলতানা, মো. আব্দুর রাজ্জাক, আসাদুল ইসলাম, প্রদ্যুত্বরণ চৌধুরী, মিজানুর রহমান। এ প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা মো. আব্দুর রাজ্জাক যিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে আছেন। তার বোন নাসরিন সুলতানা আছেন চেয়ারম্যান পদে। তার বন্ধু আসাদুল ইসলামও রয়েছেন পরিচালক পদে। বাকি দুজন বিনিয়োগকারীও পরিচালক পদে রয়েছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত