প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ পদক, তাঁর কন্যার প্রধানমন্ত্রীত্ব ও আজকের বাংলাদেশ

দীপক চৌধুরী: বাঙালির জাতির পিতা স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৩ সালের ২৩ মে বিশ্ব শান্তি পরিষদ ‘জুলিও কুরি’ পদকে ভূষিত করে। দিবসটি এজন্যেই আমাদের কাছে চিরস্মরণীয়। বিশ্বশান্তি পরিষদ কর্তৃক ১৯৫০ সাল থেকে ‘জুলিও কুরি’ পদক প্রদান করা শুরু হয়। সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে এবং মানবতার কল্যাণে শান্তির স্বপক্ষে অবদানের জন্য এই পদকে ভূষিত করতে এটি ব্যক্তি ও সংগঠনকে দেওয়া হয়ে থাকে। বিশ্বশান্তির সংগ্রামে বিজ্ঞানী দম্পতি মেরি কুরি ও পিয়েরে কুরির নামে এ পদক। তাঁরা ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। এই পদক বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন কারণ, তাঁর ব্যক্তিত্ব, মানুষের প্রতি ভালবাসা, জীবনভর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, বাঙালির জন্য ত্যাগ ও কর্মের গুণে। শেখ মুজিব কিশোর থেকেই ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। নীতির প্রশ্নে এক চুল পরিমান তিনি সরেননি বা তাঁকে সরানো যায়নি। কোনো রক্তচক্ষু বা জেল-জুলুম অথবা ফাঁসির হুমকি দিয়ে তাঁকে দমন করা যায়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার ইতিহাস সবাই কম-বেশি জানেন। তাঁর একটি আঙুলের নির্দেশে বিশ্বেরা মানচিত্রে আমরা খুঁজে পেয়েছি একটি নতুন দেশের ঠিকানা। সেই দেশটির নাম বাংলাদেশ, আমাদের প্রিয় ভূমি। পাকিস্তানি হানাদারদের পরাজিত করে আমরা জয় ছিনিয়ে এনেছি তাঁর নেতৃত্বে ও নির্দেশে।

আজ পঞ্চাশ বছর ছুঁই ছুইঁ আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদও শুনেছিলাম। কতো অসহায় ছিলাম আমরা। এখন আমরা খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষা-যোগাযোগ অর্থাৎ সবদিক দিয়েই সামনের কাতারে এগিয়ে চলেছি এখন। অতীতে আমাদের নিজ পায়ে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিতেন কেবল জাতির পিতা। এই বাংলাদেশকে তাঁর মতো কেউ কখনো ভালবাসেনি। পুরনো পত্রিকা ঘেঁটে পাই, ১৯ আগস্ট, ১৯৭২-এ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণের এক জায়গায় বলেছিলেন, ‘যতদিন এদেশে দুঃখী মানুষ পেট ভরে খেতে না পারে, যতদিন অত্যাচার ও অবিচারের হাত থেকে তারা না বাঁচবে, যতদিন না শোষণমুক্ত সমাজ হবে, ততদিন সত্যিকারের স্বাধীনতা আসতে পারে না। রাজনৈতিক স্বাধীনতা আনতে যে ত্যাগের প্রয়োজন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আনতে তারচেয়ে বেশি কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন। রাতারাতি হয় না। কোনোদিন হয়নি। বস্তুত এর কোনো সোজা পথ নেই। ধীর পদক্ষেপে এগোতে হবে। এজন্য অনেক ত্যাগ প্রয়োজন। অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন। একদিনে হয় না। আমার রাজনৈতিক জীবনে আমি এ সত্য বহুবার উপলব্ধি করেছি।’’ .. সাম্প্রদায়িকতাকে বিষের সঙ্গে তুলনা করতেন জাতির পিতা।

শান্তি আন্দোলনের পুরোধা আমাদের বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘‘জীবনভর আমি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। যার মনের মধ্যে আছে সাম্প্রদায়িকতা সে হলো বন্যজীবের সমতুল্য। .. ..আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়া তাই নিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ যা তোমরা বিশ্বাস করো।’’ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও ছেলেদের বঙ্গবন্ধু বলতেন, “সারাদিন কী কাজ করলে তা রাতে শোবার আগে একবার হিসাব-নিকাশ করো।”

১৯৭৫-এর ২৬ মার্চ সোহরাওয়াদী উদ্যানে জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার কৃষক, আমার শ্রমিক দুর্নীতি করে না। সকল শিক্ষিত লোকদের বলব, কৃষক শ্রমিকদের সাথে ইজ্জত ও সম্মান রেখে কথা বলবেন। কারণ; দেশের মালিক ওরাই। ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে। তোমরা আজ লেখাপড়া করেছ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার অফিসার হয়েছে তাদের শ্রম আর ঘামের টাকায়।’ অর্থাৎ সবশ্রেণি-বর্ণের মানুষকে তিনি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন।

যদি প্রশ্ন করি, স্বাধীনতার পরের ইতিহাস তো অত্যন্ত সুন্দর ও গর্বের হয়ে উঠতে পারতো কিন্তু কী কারণে তা হলো না? কারণ, ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত। বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। জাতির পিতার আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা চক্রান্তকারীদের সহ্য হয়নি। বিশ্বব্যাপী জাতির পিতার সম্মান আর বাংলাদেশের মর্যাদা বেড়েই চলেছিলো। এ কারণেই সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের রাতটি দেখলাম ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে। ভয়াবহ ইতিহাস আমাদের দেখতে হয়েছে। যে ষড়যন্ত্র জাতির পিতার সময় দেখেছিলা- একইভাবে তাঁর কন্যার আমলে সেই ষড়যন্ত্র দেখছি। ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে তা শুরু হয়েছিল। স্বৈরতন্ত্রের ষড়যন্ত্র, সামরিক স্বৈরতন্ত্রেরসহ হাজারটা ষড়যন্ত্র। এখনো এটি চলছে। শুধু ষড়যন্ত্রকারীরা রঙ বদলায়। কখনো আকার-প্রকার বদলায়, কখনো স্থান বা পরিবেশ, কখনোবা পেশার ছুঁতোয় আবার কখনোবা রাজনৈতিক মোড়কে। এদেশে দুর্নীতিগ্রস্তদের ষড়যন্ত্র চলছেই।

আমরা জানি, রাজনীতির কঠিন ময়দানে জাতির জনকের এই কন্যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সময়ের প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কারণেই আজ টেকসই উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ। মোট চারবারের প্রধানমন্ত্রী তিনি। টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বারো বছর ধরে দুঃসাহসী নেতৃত্ব দিয়ে দেশের জনগণকে যেমন আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন ঠিক তেমনি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এক বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন। ইতিমধ্যেই ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি এবং তা বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই, গরিব শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, পদ্মা সেতু নির্মাণ, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার (হয়েছে ও হচ্ছে), বিশ্ব অটিজম আন্দোলনসহ শতাধিক বিষয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ। এসব ইস্যু একসময় ছিল অচিন্তনীয়। শিশুদের মুখে ছিল ডাণ্ডি, বিড়ি, ফেন্সিডিল, ইয়াবা, কিশোরদের হাতে নাইন এমএম পিস্তল, কাটাবন্দুক, যুবকদের ধ্বংস করার জন্য এমন কিছু বাকি ছিল না যা তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়নি অতীতে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে মানুষ আর দেশ বড়। বৈশি^ক সমস্যা জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে আজ সফল দেশ। নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষিতে সফলতা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অনলাইন- মোবাইল ও ইন্টারনেটে বিপ্লব, রেমিটেন্স, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, ছিটমহল সমস্যার সমাধানসহ সহস্রাধিক ইস্যুতে সরকারের ইতিহাস সৃষ্টি মানুষকে আকৃষ্ট করে আছে।

বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পরপরই মুক্তিযুদ্ধোত্তর নানান সংকটের কঠিন দিনগুলোতে বাঙালি জাতীয়তাবোধের গভীরতা থেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এদেশের সকল শ্রেণির মানুষের প্রিয় ছিলেন তিনি। আজ এটা সত্যি হয়ে উঠেছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিয়ে গেছেন স্বাধীন দেশ আর তাঁর সুযোগ্যকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা সেই দেশের মানুষের নিরাপদ ঠিকানা। ২০২১-এ আমরা যেন এই প্রতিজ্ঞা করি যে, মুজিববর্ষ হোক অগ্রগতির, সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি ও কথাসাহিত্যিক

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত