প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাজেটে বাড়ছে না করের বোঝা

সমকাল : করোনা মহামারির কারণে ব্যক্তির আয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি বিবেচনায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে করের বোঝা বাড়ছে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর হার কমছে। কর দিতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা যেসব সমস্যায় পড়ছেন, সে ক্ষেত্রেও ব্যবসাবান্ধব কিছু পদক্ষেপ আসছে।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, করোনা মহামারির বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয় পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। এ জন্য অতিরিক্ত কোনো কর আরোপ না করে বরং কিছু ক্ষেত্রে তা ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এনবিআরের। প্রতিষ্ঠানটি করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায়।
জানা গেছে, আমদানি পর্যায়ে আগাম আয়কর (এআইটি) হার কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত আগাম আয়কর দিতে হয়, যা কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এ হার কমিয়ে ১ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত করতে পারে এনবিআর। আমদানি পর্যায়ে আগাম কর (এটি) ও ভ্যাট কমতে পারে। কাঁচামাল আমদানিতে বর্তমানে ৪ শতাংশ ভ্যাট রয়েছে। এ হার ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হতে পারে। এতে ব্যবসায়ীদের কাছে নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়বে।

অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, সরবরাহ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে করপোরেট কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানো হতে পারে। এ সুবিধা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এবং তালিকাভুক্ত নয়, উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেওয়া হতে পারে। বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের পক্ষ থেকেও করপোরেট কর কমানোর দাবি রয়েছে। বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির কর ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর ২৫ শতাংশ। তবে ব্যাংক, বীমা, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল অপারেটর কোম্পানি ও তামাকজাত পণ্যের কোম্পানির ক্ষেত্রে করপোরেট কর হার অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে।

সূত্র জানায়, নতুন বিনিয়োগ উদ্বুদ্ধ করা, কোম্পানি সম্প্রসারণ ও এফডিআই আকর্ষণে করপোরেট করে ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে এনবিআর। গত বছর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কর কমানো হয়েছে। এ বছর করোনা বিবেচনায় আরও কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে এনবিআরের। তালিকাভুক্ত কোম্পানির করমুক্ত লভ্যাংশের সীমাও বাড়ানো হতে পারে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানির লাভের ৫০ হাজার টাকা করমুক্ত। সারাবিশ্বই করোনার সময়ে করপোরেট করে কিছু ছাড় দিয়েছে।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ধরনের কর ছাড়ের পরিকল্পনা থাকায় আগামী অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়াচ্ছে না সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল, তা-ই রাখা হচ্ছে। যদিও চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এনবিআরের কর সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ২৯ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৩ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট কর হার আরও কমানো দরকার। এতে অনেকেই তালিকাভুক্ত হওয়ায় আগ্রহী হবে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোম্পানির স্বচ্ছতা বাড়ে। আর আমদানির ক্ষেত্রে আগাম আয়কর কমানো যেতে পারে। এতে ব্যবসায়ীদের হাতে নগদ টাকা বেশি থাকবে। তবে মনে রাখতে হবে, আগাম আয়কর নেওয়া হয় কর ফাঁকি বন্ধের জন্য। এ ধরনের সুবিধা দেওয়া হলে কর ফাঁকি বন্ধেরও উদ্যোগ থাকতে হবে। আবার সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ দরকার। কারণ সম্পদ আহরণ কমে গেলে সরকার ব্যয় করতে পারবে না। ফলে যেসব সুবিধা দেওয়া হবে, সেগুলো কারা পাচ্ছে এবং তার প্রভাব কী তা যথাযথভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

আগামী ৩ জুন জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হবে। বাজেটে ব্যয়ের সম্ভাব্য আকার ৬ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয় পরিকল্পনা ইতোমধ্যে অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ। মোট ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭৮ কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকতে পারে। এর মধ্যে এনবিআরকে সংগ্রহ করতে হবে চলতি অর্থবছরের মতো ৩ লাখ ৩০ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। বাকি রাজস্বের ৫৯ হাজার কোটি টাকা আসবে করবহির্ভূত রাজস্ব থেকে। ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ১৩ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।

ব্যক্তি শ্রেণির আয়কর অপরিবর্তিত থাকতে পারে :ব্যক্তি করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ টাকা। নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের বেলায় এ সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা। প্রতিবন্ধী করদাতাদের ৪ লাখ ৫০ হাজার এবং মুক্তিযোদ্ধা করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সবার ক্ষেত্রে এ সীমা অপরিবর্তিত থাকছে। তবে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে। সব টিআইএনধারীর রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করতে চায় এনবিআর। একটি কর অঞ্চলের যুগ্ম কমিশনার বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে সব টিআইএনধারীর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু সবাই রিটার্ন দাখিল করেননি। করোনাভাইরাসের বিস্তার, অনলাইন রিটার্ন দাখিল ব্যবস্থা কার্যকর না থাকায় সরকার এ বিষয়ে ছাড় দিয়েছে। তবে যারা রিটার্ন দাখিল করেছেন আর যারা রিটার্ন দাখিল করেননি, তাদের আলাদা করার কাজ চলছে। আগামী অর্থবছরে যারা রিটার্ন দাখিল করবেন না, তাদের টিআইএন নম্বর অকার্যকর বা স্থগিত রাখা হবে। এ ছাড়া অনেক সেবা নিতে টিআইএন সনদের পাশাপাশি রিটার্ন দাখিলের প্রাপ্তি স্বীকারপত্র জমা দেওয়ার বিধান চালু করা হবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে ৬১ লাখ টিআইএন রয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে রিটার্ন দাখিল করেছেন ২৪ লাখের কিছু বেশি।

কালো টাকা সাদা :আগামী অর্থবছরেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তবে কী পদ্ধতি বা কত হারে কর পরিশোধ করে কালো টাকার মালিকরা এ সুবিধা পাবেন না; তিনি জানাননি। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে যেভাবে এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে, আগামীতে তা থাকবে না। আগামীতে বিনিয়োগকেন্দ্রিক কার্যক্রমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হবে। অর্থাৎ এমনভাবে সুযোগ দেওয়া হবে, যাতে করদাতার অপ্রদর্শিত অর্থ কোনো না কোনো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হয়। একই সঙ্গে প্রচলিত করের সঙ্গে জরিমানা কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে এনবিআর। শেয়ার বাজার চাঙ্গা করার পরিকল্পনা রয়েছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকবে এ খাতে। এ ক্ষেত্রে বর্তমানের ‘তিন বছরের লকইন’ নিয়মে পরিবর্তন আনা হতে পারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ১০ হাজার ৩৪ জন করদাতা নগদ অর্থ ও সম্পদ মিলিয়ে ১৪ হাজার ৩০০ কোটির সমপরিমাণ কালো টাকা সাদা করেছেন। এ থেকে এনবিআর এক হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে। ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা বিনা প্রশ্নে মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছেন।

ভ্যাট, উৎসে কর ও অন্যান্য :সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের চলতি পুঁজির ঘাটতি কমাতে বিভিন্ন পর্যায়ে উৎসে কর কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আমদানি পর্যায়ে পরিশোধ করা আগাম কর ও ভ্যাট ফেরতযোগ্য হলেও তা সময়মতো ফেরত পান না ব্যবসায়ীরা। এ জন্য আগাম পরিশোধ করা কর ও ভ্যাট ফেরত পদ্ধতি সহজ করার উদ্যোগ থাকছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ভ্যাটমুক্ত সীমা ৫০ লাখ টাকা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে কর সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য সরকার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় জোর দেবে। আগামী অর্থবছর থেকে ভ্যাট রিটার্ন অনলাইনে দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা হবে। যারা অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন না, তাদেরকে জরিমানা গুনতে হবে। ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে। ভ্যাটের আওতা বাড়াতে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইসের (ইএফডি) ব্যবহার বাড়ানো হবে। সময়মতো কর পরিশোধ করা না হলে যেসব ক্ষেত্রে জরিমানা ও দণ্ডসুদ রয়েছে সেগুলো কমানোর উদ্যোগ থাকছে বাজেটে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হিসাবের আওতাবহির্ভূত সীমা বাড়ানোর কথা ভাবছে এনবিআর। ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে এনবিআর। বর্তমানে ব্যাংকের ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ মোট বিনিয়োগের হিসাবের আওতাবহির্ভূত। সিমেন্ট, সিরামিক, কোমল পানীয় খাতে আগাম কর পরিশোধে ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে এনবিআর। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী, ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য তেমন কোনো সুখবর নেই। এ দুই খাতের কোটি কোটি গ্রাহকের উৎসে কর অপরিবর্তিত থাকছে। এদিকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি ভ্যাট নিবন্ধনের সুযোগ দিতে যাচ্ছে এনবিআর। বিশেষ করে ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠান নিজেরাই ভ্যাটের নিবন্ধন নিয়ে তা পরিশোধ করতে পারবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত