প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এম আমির হোসেন: পলিটিক্যাল ভার্সেস ফিলোসোফিক্যাল ইসলাম : বর্তমান প্রেক্ষাপটে

এম আমির হোসেন: সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে কেবল রক্ত ঝরছে। হয় তারা নিজেরা নিজেরা যুদ্ধ করছে নতুবা অন্যদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। এর মূল কারণ ইসলাম নয়, বরং পলিটিক্যাল ইসলাম চর্চাই মূলত দায়ী। ইসলামের সূচনাপর্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এত বহুধাবিভক্তি ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ সবকিছুই নির্ধারিত হতো পলিটিক্স দ্বারা। সাধারণ মানুষ ছিলো একেবারেই সাধারণ এবং ঐতিহাসিক মূল্যেও গুরুত্বহীন। তথাকথিত এলিট শ্রেণির পলিটিক্যাল কর্মকাণ্ডই ছিল সব। সেই সময়ে ইসলামের বিস্তারের জন্য পলিটিক্যাল ইসলামের প্রয়োজন ছিলো। তাই ইসলামের ফিলোসোফিক্যাল চর্চা তখন এতোটা দৃশ্যমান হয়নি বা হলেও তা আলোচনায় আসেনি। একটি রাষ্ট্র বা সমাজ বা গোষ্ঠীর শাসক নির্বাচিত হওয়া ও শাসন-ক্ষমতা ধরে রাখার পদ্ধতির নাম হলো পলিটিক্স। রাজনীতি তথা পলিটিক্যাল ইনভলভমেন্ট ছাড়া ক্ষমতার শীর্ষে আরোহন করা যায় না। আঠারো/উনিশ শতকের আগ পর্যন্ত পলিটিক্সের মূল উপাদান ছিলো ধর্মকেন্দ্রিক নানান ভাববাদী চিন্তাচেতনা। ধর্মীয় নীতির সাহায্যে ধর্মপ্রধানেরাই মূলত শাসন করত নতুবা শাসকদের নিয়ন্ত্রণ করত। অনুরূপ রাজনৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মও বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করেছিল। এরপর বিশ্বজুড়ে ধীরেধীরে বস্তুবাদী চিন্তাচেতনা বিকশিত হতে থাকে। পলিটিক্সও বস্তুবাদী চিন্তা দিয়ে প্রভাবিত হয়; এর ফলে তা ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও ধর্মনেতাদের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে শুরু করে। সর্বশেষ উসমানীয় খিলাফতের পতন হলেও ইসলাম পরিবর্তিত বস্তুবাদী এই ধারাটির সাথে অভিযোজন করতে পারেনি। তারা পলিটিক্যাল ইসলামের পূর্বের ধারাটি এখনো বহাল রাখতে চায়। ফলশ্রুতিতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বস্তুবাদী ট্রেন্ড থেকে তারা পিছিয়ে পড়ে। দ্বন্দ্বটা এখান থেকেই শুরু হয়।

পক্ষান্তরে ফিলোসোফিক্যাল ইসলাম হলো কমপ্লিট প্যাকেজ অব লাইফ জন্ম, কর্ম, শিক্ষা, বিয়ে, উৎসব, সমাজ, সম্পত্তিবন্টন, মৃত্যু, এমনকি মৃত্যু-পরবর্তী জীবনসহ সব কিছুর পরিপূর্ণ প্যাকেজ। ধর্ম হলো ব্যক্তির নির্ভরতার জায়গা, সংস্কৃতি, আইডিওলজিক্যাল সেল্টার, প্রাকৃতিক বা মানব-সৃষ্ট অশান্তি ও অপূর্ণতার সান্ত্বনা, নির্ভার হয়ে এলিয়ে পড়ার বিছানা, নৈতিকতার মানদণ্ড নির্ধারণকারী, পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত হওয়ার মোটিভেশান, ত্যাগ ও মানব-কল্যাণে উৎসাহদান, আত্মার সাথে পরমাত্মার সম্পর্ক। ফিলোসোফিক্যাল সেই ইসলামের কোনো বিকল্প কি আছে ইসলাম অনুসারীদের? সুফিবাদ ফিলোসোফিক্যাল ইসলামের সেই চর্চাটাই করেছে। পলিটিক্যাল ইসলামের সাথে ফিলোসোফিক্যাল এই ইসলামকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। এই দুটির মধ্যকার পার্থক্য মুসলিমরা যত দ্রুত বুঝতে পারবে তাদের জন্য ততোই মঙ্গল। যে কোনো মতাদর্শকে পলিটিক্যালাইজ করা যায়। এটা নির্ভর করে মতাদর্শের ব্যাখ্যার উপর। ধর্ম পরিমাণগত নয়, গুণগত একটি মতাদর্শ যার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ একশ আশি ডিগ্রি বিপরীত করেও দেওয়া সম্ভব। কী উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে সেটাই বিবেচ্য। পলিটিক্যাল প্রয়োজনে ব্যাখ্যা দিলে তা ফিলোসোফিক্যাল ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক হতেই পারে। পলিটিক্যাল প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথকে যদি ধর্মপ্রণেতা বানায় তবে তার ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’-এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিজ্ঞানের মাধ্যাকর্ষণতত্ত্ব, বায়ুর গতিপ্রবাহ ইত্যাদি হাস্যকর পবিত্র যুক্তিও খুঁজে পাবে কেউ কেউ!

পলিটিক্যাল ইসলামের চর্চা বন্ধ করতে হলে আগে এর পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে। সৌদ রাজবংশ পরিচালিত সৌদি আরব, সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও জায়নবাদী ইসরায়েলের যোগসাজশে জঙ্গিবাদের মদদদাতা যে অশুভশক্তি গড়ে উঠেছে সেটাকে নিউট্রালাইজ করতে হবে। ইসলাম ধর্মের উৎপত্তিস্থল মক্কা-মদিনাকে সর্বপ্রথম স্বাধীন করতে হবে। প্রধান পোপ কর্তৃক পরিচালিত ভ্যাটিকান সিটির আদলে মক্কা-মদিনাকে প্রধান ইমাম কর্তৃক পরিচালিত মুসলিমদের স্যাকেরডোটাল স্টেট বানাতে হবে—স্বার্থান্বেষী সৌদ রাজবংশ পরিচালিত সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইনের সমস্যা সমাধানকল্পে দুটি জাতিকে নিয়ে একক সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠন করতে হবে যার নাম হতে পারে ইউনাইটেড স্টেটস অব জেরুজালেম বা ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইন। আরব ও ইহুদি দুই জাতিভিত্তিক দুটি দেশ না করে একক রাষ্ট্র গঠন করতে পারলে যুগযুগ ধরে চলা রক্তপাতের অবসান হবে। যে স্থানগুলো দুই ধর্মের কাছেই পবিত্র সেগুলোকে ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বাকি স্থানগুলোতে আরব ও ইহুদিদের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু ইসলাম নয়, সকল ধর্মের ধার্মিকদের মনে রাখতে হবে, পলিটিক্যাল রিলিজিয়নের যুগ শেষ হয়ে গেছে, এখন ধর্মকে টিকে থাকতে হবে তার ফিলোসোফিক্যাল শক্তিতে। এটা ধর্ম ও মানবসভ্যতা উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক। ধর্মের মূল উদ্দেশ্য বরং এতেই সাধিত হবে। রাষ্ট্র চলবে বস্তুবাদী নিয়মকানুন ও আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে যা সময়ের সাথে যুগোপযোগী, পরিবর্তন ও পরিমার্জন হবে। মানুষের বিকাশ ও ইতিহাসের গতি ঠেকিয়ে রাখতে চাওয়ার মতো মূর্খতা আর দ্বিতীয়টি নেই। এই মূর্খতার শিকার হয়ে আর কতোকাল নিষ্পাপ রক্ত ঝরবে? মানুষ তার মূর্খতাকে জয় করে এগিয়ে যাক প্রজ্ঞার শক্তিতে এটাই প্রত্যাশা আমার। লেখক : চিকিৎসক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত