প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হারুন রশিদ: বিচারের আওতায় না আনা ‘মুসলিম বাংলা’, ‘জাগো বাংলাদেশ’র উত্তরসূরীরা না জানি কবে আবার কোন ষড়যন্ত্র এবং অপতৎপরতা শুরু করে দেয়

হারুন রশিদ: কয়েকদিন আগে সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে এক প্রবাসী বাঙালি আমাকে ফোন করে রিয়াদের বর্তমান অবস্থা, সেখানে অবস্থিত বাঙালিদের দিনকাল সম্পর্কে বেশকিছু তথ্য দিলেন। দশ বছর  হলো রিয়াদ ছেড়ে  এসেছি। কিন্তু সেখানকার অনেক বাঙালির সাথে এখনো আমার যোগাযোগ আছে। সেই ভদ্রলোক জানালেন, ২০০৭-২০০৯ সময়ের মাইনাস-টু ফর্মুলার কট্টর সমর্থক এবং অ্যাক্টিভিস্টদের কয়েকজন এখন আওয়ামী লীগের লোক পরিচয়ে দূতাবাস এবং বাংলাদেশী কমিউনিটিতে সক্রিয় হয়েছেন।

তার কথা শুনে মনে পড়ে গেলো ২০০৭ সালের শেষের দিককার এক সন্ধ্যার কথা। আমি তখন কাউন্সেল (শ্রম) পদে বাংলাদেশ দূতাবাস রিয়াদে কর্মরত। বাংলাদেশি এক পেশাজীবীর বাসায় গেছি নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। সেই পেশাজীবী ভদ্রলোক ছাত্র জীবনে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী করতেন। কবিতা লেখেন। রিয়াদে নিজেকে বিটিভির প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন। বিটিভির লোগো লাগানো ক্যামেরা নিয়ে দূতাবাসে এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যান। উল্লেখ্য, বিটিভির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালনের সময় বিদেশে বিটিভির প্রতিনিধি আছে এমন কোনো তথ্য আমি খুঁজে পাইনি। আমার সময়েও কেউ বিদেশে বিটিভির প্রতিনিধি ছিলো না।

যাহোক, চা-নাস্তা খাওয়ার পর তিনি তার ডেস্কটপের সামনে নিয়ে গেলেন আমাকে। দেখালেন তাদের ‘জাগো বাংলাদেশ’ আন্দোলনের (মূলত : মাইনাস টু বাস্তবায়নের প্লাটফর্ম) কয়েকটি টিভিসি। বললেন, ‘দুই নেত্রীর কবলে পড়ে বাংলাদেশ ক্রমাগত ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে।’ জানালেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানের নেতৃত্বে নতুন এক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আন্দোলন শুরু করেছেন তারা।

আমি তার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলাম। বলেছিলাম, রাষ্ট্র হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র চালানোর দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের, অন্য কারও নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভুল করলে জনগণ তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। অন্য কাউকে তো এ দায়িত্ব দেওয়া যায় না। তিনি পরোক্ষভাবে আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, দুই নেত্রীর পক্ষে কথা বলবেন না। বিপদে পড়বেন।

রিয়াদে ওই ভদ্রলোকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক প্রভাবশালী প্রবাসী বাঙালি ব্যবসায়ী। সেই ব্যবসায়ী রিয়াদস্থ বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে জামায়াত নেতৃত্বের পৃষ্ঠপোষক। প্রাক্তন বামপন্থী কবি সাহেবও সেই সূত্রে ঘনিষ্ঠ ছিলেন রিয়াদ জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে। জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে খ্যাত সেই ব্যবসায়ী ছিলেন সৌদি আরবে ‘জাগো বাংলাদেশ’ আন্দোলন (?) এর অন্যতম সংগঠক। ওই তথাকথিত আন্দোলনকারীদের দেখে আমার মনে পড়ে গেলো ১৯৭২-৭৩ সালের কথা। ওই কিশোর বয়সেই জেনেছিলাম, স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানি তাবেদাররা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে বিপন্ন করার জন্য ‘মুসলিম বাংলা’ গঠনের এক গোপন তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছিল। ‘মুসলিম বাংলা’র হোতারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানোর মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল তারা। বাংলাদেশের অনেক ঘটনার মতো বাংলাদেশবিরোধী ‘মুসলিম বাংলা আন্দোলনের’ হোতাদেরও বিচার হয়নি। প্রকাশ্যে আনা হয়নি তাদের অপকর্ম। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এ সময়ের হেফাজতসহ অন্যান্য সাম্প্রদায়িক শক্তির পূর্বসূরীদের প্রথম অপপ্রয়াস ছিলো ‘মুসলিম বাংলা আন্দোলন’।

বাংলাদেশে রং পরিবর্তন কোনো নতুন ঘটনা না। এই কথা বলে আমি সান্তনা দিলাম রিয়াদ থেকে আমাকে ফোন করা প্রবাসী সেই বাঙালি ভাইকে। তবে নিজের মনের মধ্যে একটা আশঙ্কা থেকেই গেলো- বিচারের আওতায় না আনা ‘মুসলিম বাংলা’, ‘জাগো বাংলাদেশ’এর উত্তরসূরীরা না জানি কবে আবার কোন ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা শুরু করে দেয়! লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বিটিভি

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত