প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] মহামারী করোনার থাবায় হুমকির মুখে পাবনার তাঁত শিল্প

আবুল কালাম আজাদ : [২] প্রতি বছর ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ব্যস্ত হয়ে পরে পাবনার তাঁত সমৃদ্ধ এলাকাগুলো। তবে মহামারি করোনার থাবায় দেশের বৃহত্তম তাঁত সমৃদ্ধ এলাকায় এখন শুধুই হতাশা। করোনা মহামারিতে গেল বছর ঈদুল ফিতরে কাঙ্খিত ব্যবসা করতে না পেরে পুঁজি হারিয়েছে অনেকেই। এ বছরও ঈদে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে যখন উৎপাদন শুরু হবে ঠিক তখনই দেশে করোনা ভয়াবহ আকার ধারন করায় আবারো লকডাউন শুরু হয়েছে আর এতেই বিপাকে পরেছে এ অঞ্চলের তাঁতিরা।

[৩] ঝুঁকি মাথায় নিয়ে অনেক তাঁত কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে তবে লকডাউনের কারনে বন্ধ রয়েছে বেশিরভাগ তাঁতকারখানা। লকডাউনের কারনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁত পণ্য শাড়ি লুঙ্গি কেনার জন্য পাইকারী ক্রেতারা না আসায় উৎপাদন করেও হতাশ তাঁত মালিকরা। গত বছরের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারায় অধিকাংশ তাঁতির ঘরেই থরেথরে জমে আছে তাঁত কাপড়।

[৪] এসব এলাকার তাঁত মালিকরা জানান, সারা বছরের তাঁতের কাপড়ের ব্যবসার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যবসা হয় রোজার মাসে ঈদকে সামনে রেখে। গত বছর রোজার মধ্যে লকডাউনের জন্য অর্ধেক কাপড়ও বিক্রি করতে পারেনি তাঁতিরা। কাপড় বিক্রি করতে না পারায় পুজি হারিয়েছে অনেকেই। নতুন করে ব্যাংক লোন ও মহাজনি লোন নিয়ে যারা উৎপাদন শুরু করেছে তারাও এখন আরো বেশি হতাশায় ভূগছেন।

[৫] সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে দরিদ্র তাঁত শ্রমিকেরা। বছরের এই সময়ে তারা উৎসবের আমেজে কাজ করে, সারা বছরের উপার্জনের বেশির ভাগ আসে রমজান মাসে, করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে কঠোর লকডাউন শুরু হওয়ায় এসব তাঁত শ্রমিকরা কাজ না পেয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন।

[৬] এসব তাঁত শ্রমিকদের কাছে এখন করোনার ঝুঁকির চেয়ে খেয়ে পরে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন ধারণই মুখ্য হয়ে পড়েছে। কাজ বন্ধ হলেও দরিদ্র এসব শ্রমিকদের জোটেনি কোন সাহায্য সহযগিতা। আর তাই করোনার ঝুঁকি মাথায় নিয়েই কাজ করে উপার্জন করতে চায় শ্রমিকরা।

[৭] পাবনা গোপালপুর এলাকার তাঁত কারখানার মালিক কামাল সরকার জানান, করোনা মহামারির জন্য যখন তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখাটাই হুমকির মধ্যে পরেছে তখন মরার উপর ফাড়ার ঘা-এর মত তাঁত শিল্পের কাঁচামাল সুতার লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বৃদ্ধিতে উদ্বিগ্ন এ অঞ্চলের তাঁতিরা। তাঁত মালিকরা জানায় গত দুই মাসে প্রতি পাউন্ড সুতার দাম বেড়েছে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ টাকা, এতে করে বিক্রি না হলেও তাঁত কাপড়ের উৎপাদন খরচ বেড়েই চলেছে। তবে উৎপাদন খরচ বাড়লেও উৎসবকে সামনে রেখে এখনই কেউ উৎপাদন বন্ধ করতে চাইছে না। সরকারী নজর দারির অভাবে বেড়েই চলেছে কাঁচামালের দাম।

[৮] বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম এন্ড পাওয়ার তাঁত সমিতির সহসভাপতি হায়দার আলী জানান, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় প্রায় ৬ লক্ষাধিক তাঁত রয়েছে যারমধ্যে ৪ লাখ তাঁতই এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ক্রমাগত লোকসান আর করোনা মহামারিতে পুঁজি হারিয়েছে বেশির ভাগ দরিদ্র তাঁতি। ধার কর্য করে যারা উৎপাদন শুরু করছে তারাও পণ্য বিক্রি করতে না পারায় ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে চাইছেন।

[৯] দেশের উৎপাদিত মোট তাঁত কাপড়ের প্রায় ৪৮ ভাগ কাপড় উৎপাদিত হয় পাবনা ও সিরাজগঞ্জের তাঁত সমৃদ্ধ এলাকায়। এ দুই জেলার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত। গত দুই বছরের করোনা মহামারীর প্রকোপে দেশের সর্ববৃহৎ তাঁত কাপড় উৎপাদনকারী অঞ্চলে তাঁত কাপড় উৎপাদনকারী, শ্রমিক এবং ব্যবসায়ীদের সবাই এখন দিশেহারা। দেশের বৃহত্তম তাঁতশিল্পকে বাচিয়ে রাখতে সরকারী সাহায্য সহযোগিতার দাবি জানিয়েছে তাঁত মালিক ও শ্রমিকরা। না হলে তাদের পথে বসা ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা নেই বলে জানান তিনি।

[১০] জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ জানান, তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা থাকবে। তবে ভুক্তভোগীরা জেলা প্রশাসনের কাছে কোনো আবেদন করেননি। তারা তাদের সমিতির পক্ষ থেকে আবেদন করলে প্রশাসন ব্যাংকের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে তাদেরকে সহায়তা প্রদানে উদ্যোগী হবেন। সরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প টিকে থাক এই প্রত্যাশা সকলের।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত