প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সবার নজর এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে: বুথফেরত সমীক্ষায় কিছুটা এগিয়ে মমতা!

ডেস্ক রিপোর্ট : পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হবে আগামীকাল রোববার। তবে নজর সবার পশ্চিমবঙ্গে। এ রাজ্যের নির্বাচনকে এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বনাম মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। দু’জনের হাইভোল্টেজ প্রচার-প্রচারণায় রাজনীতির যে উত্তাপ ছড়িয়েছে, তা কোনো বিধানসভা নির্বাচনে দেখা যায় না বললেই চলে।

আট দফা ভোটের শেষে বুথফেরত সমীক্ষায় বাংলার ফলাফল নিয়ে কোনও স্পষ্ট দিশা পাওয়া গেল না।

অধিকাংশ মূলস্রোতের সমীক্ষাতেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তাতে শাসক তৃণমূলকে সামান্য এগিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু কোনও পক্ষই ২৯৪ আসনের বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার কাছকাছি পৌঁছতে পারেনি। অথচ, দুই শিবিরই প্রথম থেকে দাবি করে আসছে যে, তারা ২০০ আসনের গন্ডি পেরোবেই। এই দাবি এবং পাল্টা দাবির আবহেই অষ্টম দফার ভোটের শেষে সামনে এসেছে বুথফেরত সমীক্ষার ফলাফল। যাতে যুযুধান দুই পক্ষের মধ্যে কাউকেই খুব ‘স্বচ্ছন্দ’ ভাবে জয়ী বলে দেখা হয়নি। ফলে ঠিকঠাক ফলাফল জানতে আগামী রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। বুথফেরত সমীক্ষার ইঙ্গিত মিলে গেলে সেখানেও প্রচুর সাসপেন্স থাকার অবকাশ রয়েছে।

বুথফেরত সমীক্ষায় বাংলা ছাড়া বাকি যে রাজ্যগুলির ফলাফল সম্পর্কে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা অবশ্য প্রত্যাশিত। কেরলে বামজোট, তামিলনাড়ুতে বিজেপি জোট এবং অসমে বিজেপি-র জয়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তা ঠিক হয় কিনা, সময়ই বলবে। তবে আরও একটি ইঙ্গিত আছে সমীক্ষায়— সব রাজ্যেই কংগ্রেসের অবস্থা সঙ্গীন। পশ্চিমবঙ্গেও বাম-কংগ্রেস-আব্বাস সিদ্দিকির জোটকে খুব বেশি আসন কোনও সমীক্ষাতেই দেওয়া হয়নি।

প্রসঙ্গত, ইতিহাস বলে, এই ধরনের সমীক্ষার ফলাফল যে সবসময়ে হুবহু মিলে যায়, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমীক্ষার ফলাফল আসল গণনার সময় গিয়ে একেবারে উল্টো হয়েছে, এমন দৃষ্টান্তও একাধিক রয়েছে। তবে সাধারণত এমন সমীক্ষা থেকে ফলাফলের আগাম একটা ইঙ্গিত পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে তা ইঙ্গিতই মাত্র।

রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে ভোট হয়েছে। সমশেরগঞ্জ এবং জঙ্গিপুরে করোনা সংক্রমিত হয়ে দুই প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ওই দুই আসনে ভোট ১৬ মে। ইন্ডিয়া টু ডে-র বুথফেরত সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে, বিজেপি পেতে পারে ১৩৪ থেকে ১৬৪টি আসন। পক্ষান্তরে, তৃণমূল পেতে পারে ১৩০ থেকে ১৫৬টি আসন। বাম-কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত মোর্চা পেতে পারে সর্বোচ্চ ২টি আসন। অর্থাৎ, লড়াই একেবারে সেয়ানে-সেয়ানে। কিন্তু তাতে সামান্য এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। এবিপি আনন্দে দেখানো বুথফেরত সমীক্ষা আবার বলছে, ১৫২ থেকে ১৬৪টি আসন পেতে পারে তৃণমূল। অর্থাৎ, ‘ম্যাজিক ফিগার’ ১৪৮টি আসনের চেয়ে সামান্য বেশি আসন পেয়ে তৃতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় ফিরতে চলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাদের সমীক্ষা বলছে, বিজেপি পেতে পারে ১০৯ থেকে ১২১টি আসন। বাম, কংগ্রেস এবং আব্বাস সিদ্দিকির সংযুক্ত মোর্চা পেতে পারে ১৪ থেকে ২৫টি আসন।

সিএনএন-নিউজ এইট্টিনে প্রকাশিত বুথফেরত সমীক্ষায় তৃণমূলকে দেওয়া হয়েছে ১৬২টি আসন। বিজেপি-কে দেওয়া হয়েছে ১১৫টি আসন। সংযুক্ত মোর্চাকেও ১৫টি আসন। রিপাবলিক টিভি তাদের বুথফেরত সমীক্ষায় আবার বিজেপি-কে দিয়েছে ১৩৮-১৪৮টি আসন। তৃণমূলকে ১২৮-১৩৮টি আসন। সংযুক্ত মোর্চাকে ১১-২১টি আসন। ফলে তাদের বুথফেরত সমীক্ষাতেও বিজেপি-কে সামান্য এগিয়ে রাখা হয়েছে। তবে সংযুক্ত মোর্চাকে তাদের সমীক্ষায় দুই অঙ্কের আসনে পৌঁছতে দেখা গিয়েছে।

রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা ভোটের মাঠে ‘বাংলাদেশ প্রসঙ্গ’কে বারবার উচ্চারণ করায় এ দেশের মানুষেরও দৃষ্টি রয়েছে ফলাফলের দিকে। এরই মধ্যে বুথফেরত জরিপে তৃণমূলের জয়ের আভাস মিলেছে। তবে তা মানতে নারাজ বিজেপি। উভয় দলই দাবি করেছে, যে আভাস পাওয়া গেছে, তা ঠিক হবে না। দুই দলই আশাবাদী, তারা দুই শতাধিক আসন পাবে। তবে তা তো হওয়ার নয়। কারণ, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মোট আসন ২৯৪টি। জয়ের জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় দুটি আসনে ভোট স্থগিত রয়েছে। আগামীকাল ২৯২ আসনের ফল ঘোষণা করা হবে।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এবার বড় ফ্যাক্টরের মধ্যে ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, তোলাবাজি (চাঁদাবাজি), উন্নয়ন, মতুয়া সম্প্রদায়, বহিরাগত, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং সংখ্যালঘু। ঘুরেফিরে এগুলোই প্রাধান্য পেয়েছে শীর্ষ নেতাদের প্রচারে। এবার নির্বাচন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেই বারবার জনসভা করেছেন। অমিত শাহ দিনের পর দিন পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করেছেন। লেগেছিলেন সর্বভারতীয় বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা। কেন্দ্রের অন্য নেতারাও এসেছেন। সেই সঙ্গে রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষসহ অন্যরা তো আছেনই। ফলে লড়াই হয়েছে হাড্ডাহাড্ডি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ফলাফলেও এর প্রতিফলন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরই চার রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত একটি অঞ্চলের বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশ করে কয়েকটি গণমাধ্যম ও সংস্থা। বেশিরভাগই আভাস দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসছে তৃণমূল কংগ্রেস। দুটি সংস্থা বলেছে, বিজেপি ক্ষমতা দখল করতে চলেছে। তবে বুথফেরত সমীক্ষার দাবি উড়িয়ে দিয়েছে দুই শিবিরই। উভয়েই দাবি করেছে, তারাই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করবে।

তৃণমূলের মুখপাত্র তাপস রায় বলেন, ‘বুথফেরত সব জরিপেরই ফল দেখেছি আমরা। এটি পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, কোনো হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে না। কারণ, আমরাই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরছি। সে ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তৃতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হবেন।’

অন্যদিকে, তৃণমূলের মতো রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু দাবি করেছেন, বুথফেরত জরিপের ওপর ভরসা করা উচিত নয়। এত কম নমুনার ভিত্তিতে এসব সমীক্ষা হয়, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো আভাস দিতে পারে না। সে ক্ষেত্রে ফল পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো। বাংলার মানুষ কী রায় দিয়েছেন, তা রোববারই জানা যাবে। বিজেপিই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলায় সরকার গড়বে।

বুথফেরত জরিপের ফল উড়িয়ে দিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। তার সাফ কথা, ২ মে বিধানসভার আসল ফল সামনে আসবে। কী সেই আসল ফল, তা তিনি স্পষ্ট করে বলেননি। দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘কয়েকটি জরিপে ওদের (তৃণমূল) এগিয়ে রাখা হয়েছে। এমন কিছু সংস্থা আছে, যারা চার মাস আগে যা বলেছিল, এখনও সেটাই বলেছে। আমরা জানি এক্সিট পোল সঠিক নয়, এক্স্যাক্ট পোলটাই ঠিক। ২ মে আসলটা বোঝা যাবে।’

প্রথম থেকে ২০০ আসনের বেশি পাওয়ার দাবি করে এসেছে বিজেপি নেতৃত্ব। জরিপের ফল প্রকাশের পরও আত্মবিশ্বাস দেখালেন দিলীপ ঘোষ। তিনি বলেন, ‘আমরা যেটা চেয়েছিলাম, ওটাই হবে। ২০০-এর কাছাকাছি আসন পাব আমরা।’ তবে আগে যা ছিল দুইশর বেশি, জরিপের ফল প্রকাশের পর তা এখন দুইশর কাছাকাছি হয়ে গেছে।

এদিকে গতকাল দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। গণনাকেন্দ্র পাহারা দেওয়া, গুজবে কান না দিয়ে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা ২০০-এর বেশি আসন পাব। জয় আমাদেরই হবে।
কলকাতায় ভার্চুয়াল বৈঠকে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘আমরাই জিতব। কিন্তু বিজেপি সকাল বেলা রটাতে পারে, তারা জিতেছে। কখনোই কাউন্টিং সেন্টার ছাড়বেন না। শেষ পর্যন্ত থাকবেন। ভোর ৫টার মধ্যে ভোট গণনাকেন্দ্রে পৌঁছে যাবেন। অন্য কারও কাছ থেকে খাবার খাবেন না।’

জরিপের ফল এবং জয়-পরাজয় নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপির বাগ্‌যুদ্ধ চললেও তাতে শামিল হতে দেখা যায়নি বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটকে। সবগুলো জরিপেই বলা হয়েছে, তারা এবার সর্বোচ্চ ২৫টি আসন পেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত আগামীকালের ফলাফল কী হয়, তা দেখার অপেক্ষায় সবাই।
সূত্র- আনন্দবাজার ও সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত