প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: শ্রমের ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়েছে কি বিশ্বে?

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: ১ মে ১৮৮৬ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শ্রমিকদের এক সমাবেশে পুলিশের গুলিবর্ষণে বেশ কয়েকজন শ্রমিক হতাহত হন। এর ফলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন পুলিশের গুলির তীব্র প্রতিবাদ করে। শ্রমিক সংগঠনগুলো আরও জোরালোভাবে তাদের দাবি বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের মধ্যে ঐক্যকে সংহত করে এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে এই আন্দোলন চলে আসছিলে। এছাড়া শ্রমমজুরি বৃদ্ধি, কর্মপরিবেশ, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার দাবিও ছিলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তখন পুঁজিবাদের বিকাশ শুরু হয়। মাঝারি ও বৃহত কলকারখানাও তখন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিলো। মূলত রেল সড়ক, রেল গাড়ি, পিচঢালা সড়ক পথ, জাহাজ শিল্প, খনিজও পদার্থ উত্তোলন, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে উঠছিলো। লাতিন আমেরিকা মহাদেশে মার্কিন কোম্পানি সমূহের বিস্তার ঘটছিলো, সে কারণে মার্কিন যুক্তারাষ্ট্রে বিভিন্ন কলকারখানায় বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কাজ করতো। তবে কাজের চাহিদা চাইতেও শ্রমিকের যোগান বেশি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা শ্রমিকদের শ্রমঘণ্টা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করতো।

এতে দেখা যেতো ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টাও কারখানার শ্রমিকরা কাজ করতে বাধ্য হতো কিন্তু মজুরি বৃদ্ধি করা হতো না। অনেক কারখানার পরিবেশ শ্রমিকদের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য পরিবেশ অনুকূলে ছিলো না। অমানবিক পরিবেশে শ্রমিকরা জীবনযাপন করতে বাধ্য হতো, বেশির ভাগ শ্রমিকই বস্তি এলাকায় থাকতে বাধ্য হতো। ফলে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অনেক শ্রমিকই কম বয়সে রোগাক্রান্ত হতো কিংবা মৃত্যু বরণও করতো। ১৯ শতকের শুরুতে কলকারখানা পরিবেশ, শ্রমঘণ্টা, মজুরি আরও খারাপ ছিলো তবে ইউরোপের দেশগুলোতে শ্রমিক  আন্দোলন মজুরিসহ শ্রমঘণ্টার দাবি ৩০ দশকেই ইউরোপে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রভাব ৬০ এবং ৭০ দশকে পড়েছিলো। সেই সময়ে কমিউনিস্ট আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে পাশে দাঁড়ায়, শ্রমিকদের শ্রমঘণ্টা দৈনিক ৮ ঘণ্টার পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন। একইসঙ্গে মজুরি বৃদ্ধিসহ কারখানার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প নগড়িতে ট্রেড ইউনিয়ন এসব দাবি না মানিয়ে ছোট ছোট আন্দলোন গড়ে তোলে। ৮০ দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা এবং তাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলো ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি বাস্তবায়নে একমত প্রসন করে সেই দাবি নিয়ে ১৮৮৬ সালে শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করে। সেসব আন্দোলন মালিক পক্ষ সহজে মেনে নিতে পারেনি ফলে শমিকদের মধ্যে বিক্ষোভ বাড়তে থাকে।

শিকাগো শহরের শ্রমিকরা ১ মে তারিখে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে মিছিল করতে করতে হে মার্কেট চত্বরে সমবেত হতে থাকেন, এখানে শ্রমিক নেতারা বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তিতায় শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা দৈনিক শ্রমঘন্টা নির্ধারণ, বেঁচে থাকার মজুরি প্রদানের দাবি উৎথাপন করেন। সমবেত শ্রমিকরা তা সমর্থন করেন। বক্তিতা শেষে শ্রমিকরা যখন মিছিল নিয়ে শহরের রাস্তা পদক্ষিণ করে এগোতে থাকে তখনি আর্কষিকভাবে গুলি  ছোড়া হয়। এতে ঘটনা স্থলেই বেশ কয়েকজন শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনায় হে মার্কেটের এই  হত্যা কাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পরে। কয়েকদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করা হয়। ১৮৮৯ সালে জুলাই মাসে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথমদিনের অধিবেশনেই সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয় যে ১৮৯০ সালে ১ মে থেকে প্রতি বছর শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি, সৌভ্রাতৃত্ব ও সংগ্রামের দিন হিসেবে এই দিনটি পালিত হবে। এটি তখন শ্রমিকদিবস  হিসেবে গৃহীত হয়েছিলো কিন্তু রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পর ১ মে কে শ্রমজীবী মানুষের দিবস হিসেবে পালন করা হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে মে মাসের ১ তারিখ সব মানুষই শ্রম দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। এখন সারা বিশ্বব্যাপী মানুষের কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। মানুষ এখন অফিস, শিল্প কারখানাসহ সর্বত্রই ৮ ঘণ্টা কাজ করার নিয়মে চলছে। এটি স্বাস্থ্যসম্মত এবং বিজ্ঞান সম্মতও।

আজকের পৃথীবি যে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস আইন ও বিধান সর্বত্র মেনে চলছে তা ১৮৮৬ সালে ১ মে তারিখে হে মার্কেটের শ্রমিকদের আত্মত্যাগের বিনিময় অর্জিত হয়েছে। পৃথীবির মানুষ এখন সেই শহীদদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। বাংলাদেশেও ১৯৭২ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু সরকার ১ মে কে পালন করার জন্য ছুটি ঘোষণা করেছিলো। সব দেশের সঙ্গে আমরাও শ্রমজীবী মানুষের এই আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাই। লেখক : শিক্ষাবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত