প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সন্তানের প্রতি হজরত লোকমানের উপদেশ

ইসলাম ডেস্ক: রমজানের আঠারোতম তারাবিতে আজ তেলাওয়াত করা হবে একুশতম পারা অর্থাৎ সুরা আনকাবুতের ৪৫ নম্বর আয়াত থেকে শুরু করে সুরা আর রুম, সুরা লোকমান, সুরা সেজদা ও সুরা আল আহজাবের ৩০ আয়াত পর্যন্ত। আজকের তারাবিতে পঠিতব্য অংশের গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হলো হজরত লোকমান (আ.) কর্তৃক তার সন্তানকে দেওয়া উপদেশমালা। মক্কায় নাজিল হওয়া সুরা লোকমানে ৩৪টি আয়াত রয়েছে। এ সুরায় আল্লাহতায়ালা আসমান ও জমিন সৃষ্টির ক্ষেত্রে নিজের নিদর্শনাবলি বর্ণনার পাশাপাশি নিজ সন্তানের প্রতি হজরত লোকমানের কিছু প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ তুলে ধরেছেন। এ কারণে এই সুরার নামকরণ করা হয়েছে লোকমান। এই উপদেশগুলো সুরা লোকমানের ১৩ থেকে ১৯ আয়াতে স্থান পেয়েছে।

মুফাসসিরদের মতে, হজরত লোকমান (আ.) কোনো নবী ছিলেন না। কিন্তু তিনি এতটা ধার্মিক ও জ্ঞানী ছিলেন যে, মহান আল্লাহ তার তাকওয়ায় মুগ্ধ হয়ে তাকে প্রজ্ঞা শিক্ষা দিয়েছিলেন। এ সুরায় হজরত লোকমানের জবানিতে সন্তানের জন্য দেওয়া অমূল্য উপদেশগুলোকে কোরআন বিশারদরা মুসলিম শিশুদের জন্য শ্রেষ্ঠতর উপহার হিসেবে অবহিত করেছেন। কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে লোকমান সন্তানকে উপদেশস্বরূপ বলল

আল্লাহর সঙ্গে শিরক না করা : ইরশাদ হয়েছে, ‘হে পুত্র! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক অনেক বড় জুলুম।’ সুরা লোকমান : ১৩

মানুষ শুধু মূর্তিপূজার মতো বিষয়কে শিরক মনে করে। কিন্তু ইসলামি স্কলাররা বলেন, ইসলামে শিরকের ধারণা অনেক বিস্তৃত। এক কথায় আল্লাহর প্রতি মানুষের বিশ্বাস, আস্থা, ভালোবাসা ক্ষুণ্ণ হয় এবং তাতে সৃষ্টির অংশ বেড়ে যায় এমন সব কাজ শিরকের পরিধিভুক্ত। ইমান নষ্ট করে এমন কাজ শুধু শিরক নয়, বরং ইমানের সৌন্দর্য নষ্ট করে এমন কাজও শিরক।

মা-বাবার সেবা করা : আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি মানুষকে মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করার নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়া হয় দুবছরে, সুতরাং আমার ও তোমার মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করো। আমার কাছেই তো ফিরে আসবে।’ সুরা লোকমান : ১৪

পৃথিবীতে সন্তানের মানুষের প্রতি মা-বাবার যে অনুগ্রহ তার দাবি হচ্ছে, তাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা। এ আয়াতে মানুষকে মায়ের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। মা-বাবার নির্দেশ ইসলামবিরোধী না হলে তা মান্য করা আবশ্যক। আর ইসলামবিরোধী নির্দেশ দিলেও তাদের সঙ্গে মন্দ ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মনে আল্লাহর স্মরণ জাগ্রত রাখা : ইরশাদ হয়েছে, ‘হে পুত্র! যদি তা (পাপ-পুণ্য) হয় সরিষার দানার সমান এবং তা থাকে পাথরের ভেতর অথবা আসমান জমিনের যে কোনো স্থানে, আল্লাহ তা উপস্থিত করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী।’ সুরা লোকমান : ১৬

তাফসিরবিদরা বলেন, এ আয়াতের মাধ্যমে হজরত লোকমান (আ.) তার সন্তানকে আল্লাহর ধ্যানে উদ্বুদ্ধ করেছেন। সে যেন এ কথা সর্বদা স্মরণ রাখে, আল্লাহর কাছে পৃথিবীর কোনো কিছুই গোপন নয়, সব গোপনীয়তা ও রহস্য সম্পর্কে তিনি অবগত। তিনি বান্দার অতি কাছে। বান্দার ছোট-বড় সব কাজ তিনি দেখেন এবং কিয়ামতের দিন তা তিনি উপস্থিত করবেন।

নামাজ আদায় করা : হজরত লোকমান (আ.) তার সন্তানকে বলেন, ‘হে পুত্র! নামাজ আদায় করো।’ সুরা লোকমান : ১৭

ইমানের পর নামাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হাদিসের বর্ণনা মতে, নামাজ মুমিন ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে পার্থক্যকারী। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব হবে। মানুষের মন ও জীবন, ব্যক্তি ও সমাজে নামাজের প্রভাব অত্যন্ত ইতিবাচক।

মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা : হজরত লোকমান (আ.) তার সন্তানকে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘হে পুত্র! … সৎ কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো।’ সুরা লোকমান : ১৭

সামাজিক কল্যাণ-চিন্তা ইসলামি জীবনব্যবস্থার সৌন্দর্য। সামাজিক কল্যাণের জায়গা থেকেই ইসলাম মানুষকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতে বলেছে, যেন সামাজিক পরিবেশ মনুষ্যত্বের উপযোগী থাকে। যাতে কল্যাণের ধারাগুলো বিনষ্ট না হয়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় হতে দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে, যদি সে তাতে সক্ষম না হয় তবে সে যেন মুখে প্রতিবাদ করে, যদি সে তাতেও সক্ষম না হয় তবে সে যেন মনে মনে তার প্রতিকার চিন্তা করে। আর এটাই ইমানের দুর্বলতম স্তর।’ সহিহ মুসলিম : ৪৯

বিপদে ধৈর্য ধারণ : তিনি আরও বলেন, ‘হে পুত্র! … তোমার ওপর আসা বিপদে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই এগুলো দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ সুরা লোকমান : ১৭

এই আয়াতে মহান আল্লাহ মানুষকে বিপদে মুমিনদের ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দিয়েছেন। বিশেষত দ্বীনের কাজের সময় মানুষের কটু কথা ও অসহনশীল আচরণে ধৈর্য ধারণ করতে হবে, যা নবী (আ.)-এর বৈশিষ্ট্য। তারা মন্দ আচরণের পরিবর্তে ভালো ব্যবহার করতেন। শত্রুর সঙ্গেও কোমলতর আচরণ করতেন।

জীবনে বিনম্র হওয়া : ইরশাদ হয়েছে, ‘অহংকারবশত তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না, পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে বিচরণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না। চলাফেরায় তুমি সংযত হও এবং স্বর নিচু রাখো। নিশ্চয়ই আওয়াজের ভেতর গাধার আওয়াজ সবচেয়ে শ্রুতিকটু।’ সুরা লোকমান: ১৮-১৯

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়, মানুষের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলা উচিত নয়, যাতে অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য প্রকাশ পায় এবং এমনভাবে চলাফেরা করা উচিত নয়, যাতে অহমিকা প্রকাশ পায়। বরং মানুষের জীবন এমন হবে যাতে তার ভেতর বিনয় প্রকাশ পায়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত