প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আকরামুল হক: দেশের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীকে দেশবিরোধী করে তোলার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অবিলম্বে বের হোন

আকরামুল হক: হেফাজত নেতৃবৃন্দ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে মিটিং করার পর রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মিটিং করেছে। সেখানে হেফাজত নেতৃবৃন্দ গোটাকয়েক দাবি উত্থাপন করছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢালাও গ্রেপ্তার না করা, মাদ্রাসা খুলে দেওয়া, সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার তদন্ত করা। এতিম শিক্ষার্থীদের ঢাল বানিয়ে মাদ্রাসা খুলে দেওয়ার দাবির পেছনে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অভিসন্ধি রয়েছে হেফাজতের। সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনার তদন্ত করার কথা বললেও হেফাজত নিজেরা সহিংসতায় জড়িত নয় মর্মে দাবি করেছে। হাটহাজারীর গুহা থেকে বাবুনগরী ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘হেফাজত শান্তি-শৃঙ্খলা চায়। কাউকে ক্ষমতায় বসানো বা কাউকে ক্ষমতা থেকে নামানো হেফাজতের উদ্দেশ্য নয়। কোনো পার্টি বা দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন হেফাজত ইসলামের উদ্দেশ্য নয়।’ চাপে পরে বাবুনগরী এখন সুর নরম করেছে।

অথচ আজ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হেফাজতের ঢাকা মহানগর কমিটির তৎকালীন প্রচার সম্পাদক  মুফতি ফখরুল ইসলাম বলেছেন, ‘২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে যাওয়ার ঠিক একসপ্তাহ আগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছিলেন সংগঠনটির তৎকালীন মহাসচিব বাবুনগরী।’ হেফাজত যতোই অস্বীকার করুক তারা অরাজনৈতিক শক্তি, হেফাজতের তেরদফা দাবির পুরোটাই রাজনৈতিক এজেন্ডা। ২০১৩ ৫ মে’র আগে হেফাজতকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিল বিএনপির মাহমুদুর রহমান ও ফরহাদ মজহার আর পেছনে ছিল ৭১’এর পরাজিত শক্তি জামায়াত-শিবির। ধর্মকে পুঁজি করে মিথ্যা ও গোয়েবলসীয় কায়দায় হেফাজতের সদস্যদের ধর্মীয় রোগ। দেশের নানান জায়গায় ওয়াজ-মাহফিলগুলোতে হেফাজতের সদস্যরা দেদারসে মিথ্যা কথা বলে, কেউ বিলগেটসকে শিক্ষা দেয়, কেউবা এলন মাস্ককে শিক্ষা দিচ্ছে, ইউরোপ আমেরিকার ইউনিভার্সিটিগুলো এসমস্ত কাঠমোল্লাদের কাছে থেকে আইডিয়া নিয়ে চলছে বলে দাবি করে ধর্মের ষাঁড়গুলো। দেশের সংবিধান ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিনের পর দিন ধর্মপ্রাণ আমজনতাকে উত্তেজিত করে চলছে হেফাজতের পান্ডারা।

মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তযোদ্ধাদের নিয়ে সমানে অসম্মানজনক কথা চলে ওয়াজ-মাহফিলগুলোতে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারগুলোও এ সমস্ত পান্ডাদের লকলকে জিহবার জিঘাংসার শিকার। হেফাজত দিন দুয়েক আগে বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কমিটা করবে তারা। এই কমিটি কী ধর্ম রক্ষার জন্যে নাকি ভিন্ন মতাদর্শী রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের বাড়ি ঘরে মব তুলে হত্যা এবং আগুন দেওয়ার জন্য? ডাকসুর সাবেক ভিপি বাবুনগরীর ভাবশিষ্য ভিডিও বার্তায় বলেছে, ‘কোনো মুসলমান আওয়ামী লীগ করতে পারে না। যারা আওয়ামী লীগ সমর্থন করে তারা প্রকৃত মুসলমান না।’ সুস্পষ্ট ধর্মীয় সমীকরণের দিকে রাষ্ট্রকে নিয়ে যেতে যাইছে এ সমস্ত ধর্মীয় গাড়লরা। চট্টগ্রামে ইজহারুল হকের মাদ্রাসায় ট্রেনিং নেওয়ার সময় বোমা ফুটেছিল, একই কর্ম ঘটেছিল হাটহাজারী মাদ্রাসাতেও। দেশে ১৩৩টি জঙ্গি সংগঠন রয়েছে।

প্রতিটি জঙ্গি সংগঠনই মাদ্রাসাগুলোর আড়ালে কাজ চালিয়ে যায়। ১/১১’র পরে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি (আইডিপি) নামে একটি দল খুলেছিল তালেবানদের সাথে যুদ্ধ করা আফগান ফেরত মুজাহিদরা, তৎকালীন সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার প্রচ্ছন্ন সহায়তায়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভায়ও গ্রেনেড হামলা করেছিল আফগান ফেরত মুফতি হান্নানরা। হেফাজত এখন রাষ্ট্রের চাপে সুর নরম করেছে, ক্ষমতাসীনরা এখন আপোসের পথে হাঁটলে, সোনারগাঁয়ে যেমন যুবলীগ কর্মীর নিজে বাড়ি ও শ্বশুর বাড়ি আগুনে পুড়েছে মামুনুলকাণ্ডে, দেশব্যাপী একই কর্ম করবে হেফাজত ও তাদের চৈনিকপন্থী দোসররা। হেফাজত রাষ্ট্রের মাস্তানির চাপে ঘাড় কাৎ করেছে বটে, কিন্তু আদর্শিকভাবে তালেবানীয় স্বপ্ন ত্যাগ করেছে এটি ভাবা ভুল হবে। প্রতিটি মাদ্রসাকে নিজস্ব মার্সেনারী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলছে ধর্মান্ধরা, আমজনতার ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে। শিক্ষা ব্যবস্থার নীতি পরিবর্তন ছাড়া ন্যূনতম জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হবে না।

তিন রকমের শিক্ষা ব্যবস্থা বহাল রয়েছে দেশে। শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্যই দেশে ভিন্ন মতাদর্শের নাগরিক তৈরি হচ্ছে। চলমান সহিংসতা প্রমাণ দিচ্ছে, দেশে ভয়ানক রকমের মতাদর্শগত বিভেদ তৈরি হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বসানো নিয়ে তুলকালামকাণ্ড ঘটিয়েছে ধর্মীয় পান্ডারা। এর পুরোটাই পাকিস্থানপন্থী মতাদর্শের বহিঃপ্রকাশ। হেফাজত দাবি করেছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেখানে পাকিস্তান সৈনিকরা আত্মসমর্পন করেছে সেখনে ১০০ ফুট উঁচু আল্লহর নামাঙ্কিত মিনার বানাতে হবে। কী বোঝা গেলো হেফাজতের দাবিতে? ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক বিরোধিতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অবমাননা করা হচ্ছে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের। ক্ষমতাসীনরা সুশাসন কায়েম করেছে এটি যেমন সত্য না। তেমনি ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করতে গিয়ে অহেতুক মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধদের টেনে আনাটা হচ্ছে রাজনৈতিক ভন্ডামি। প্রকারান্তরে মনের ভেতর থাকা স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের প্রকাশ।

ক্ষমতাসীনরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মাতম করারা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আঁকড়ে ধরে না থেকে পাকিস্তানপন্থীদের কোলে উঠে বসে মাতম করে। এর ফলেই আওয়ামী লীগ একচেটিয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদারে পরিণত হয়। ভাসানীর গোল টুপি মাথায় দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রাণভোমরা শেখ মুজিবকে অস্বীকার করে, আর মাতম করতে থাকে মুজিবনগর সরকারের কাউকে স্মরণ করা হচ্ছে না। অথচ এরা মুজিবনগর সরকারের মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রটিকেও আমলে নেয় না। হেফাজতের সঙ্গে তাল না মিলিয়ে, একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করুন। সব মাদ্রাসা রাষ্ট্রের কব্জায় আনুন। ধর্মীয় শিক্ষাকে শিক্ষার্থীর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিন। যার মনে ধরবে সে ধর্মগ্রন্থ মুখস্ত করবে, যার মনে ধরবে সে গীতাঞ্জলী মুখস্ত করবে। দেশটি অনেক রক্তের সাগর পেরিয়ে অর্জিত হয়েছে।

এখন একটি ভুল সিদ্ধান্তে সবই হারাতে হতে পারে। পাকিস্তান তালেবান ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ওপর ভর করে আফগানিস্থানে ইসলামী বিপ্লব কায়েম করতে গেছিল, পুরো পাকিস্তানে এখন আগুন লেগে গেছে। পাকিস্তান এখন মাদ্রাসায় পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনছে। একপাক্ষিক শিক্ষার খপ্পর থেকে বের হোন মহোদয়েরা। মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া যেমন সত্য, তেমনি সত্য এটি একটি ব্যবসা; এতিম শিক্ষার্থীরা হচ্ছে এ ব্যবসার উপকরণ মাত্র। যাদের ওপর ভর করে মাদ্রাসার চাঁদা উঠে ভাগ বাটোয়ারা হয়, দোজাহানের অশেষ নেকী হাসেলে স্বার্থে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, অসৎ রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীরা যাতে শামিল হয়। দেশের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীকে দেশবিরোধী করে তোলার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে অবিলম্বে বের হোন। দেশের অর্ধেক উঠতি সন্তানদের উম্মি ও দরিদ্র বানিয়ে রাখার কৌশল ত্যাগ করুন। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত