প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রবৃদ্ধি বাড়লেও অসম উত্তরণের বিপজ্জনক ঝুঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতি

অর্থনৈতিক ডেস্ক: বিশ্বের প্রথম ও দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মহামারি পরবর্তীকালে শক্তিশালী বিকাশ নিয়ে উত্তরণের পথে আছে। বাকি দেশগুলোর ক্ষেত্রে অবশ্য সেই নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না

চলতি বছরেই গত অর্ধশতকের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। তবে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির মহামারির অভিঘাত উত্তরণের দিক থেকে যে পার্থক্য ও বৈষম্য রয়েছে, তা মহামারি পূর্ব অবস্থানে বিশ্ব অর্থনীতির ফিরে আসাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এমনকি অচিরেই সেই সুদিনে ফেরাকে দীর্ঘমেয়াদী ও কষ্টসাধ্য করে তুলতে সক্ষম এমন পরিস্থিতি।

জাতীয়সহ বিশ্ব অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চলতি সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর অর্ধ-বার্ষিক বৈঠকে নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের “আমেরিকা প্রথম” নীতিকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব অর্থনীতির অভিভাবকের আসনে আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, সেজন্য তার প্রশাসন লাখ লাখ কোটি ডলারের বাজেট প্রণোদনা ঘোষণাও করেছে। সরকারি প্রণোদনার মধ্যেই গত আগস্টের পর সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির সংবাদ জানা যায় গত শুক্রবারে, এতে নতুন আশায় উদ্বেলিত মার্কিন অর্থনীতি।

জাতীয় বিকাশকে চাঙ্গা রাখার মাধ্যমে চীনও নিজের বৈশ্বিক অবদান জোরদার রেখেছে। প্রথমে দেশটি সফলভাবে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও তার প্রেক্ষিতে সুবিশাল অর্থনীতিকে সবার আগে গতিশীল করে চমক লাগায়। এখন দেশটি আন্তর্জাতিক পণ্য চাহিদার বড় অংশের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করছে। মহামারির প্রাথমিক দৈন্যদশার পর দেশটি পূর্ব ঘোষিত কিছু প্রণোদনা বাতিল করা শুরু করলেও, তাতে ইতোমধ্যেই প্রাণবন্ত অর্থনীতি তেমন প্রভাবিত হয়নি।

অর্থাৎ, বিশ্বের প্রথম ও দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির এ দুই দেশ মহামারি পরবর্তীকালে শক্তিশালী বিকাশ নিয়ে উত্তরণের আশাই করছে। বাকি দেশগুলোর ক্ষেত্রে অবশ্য সেই নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। বরং ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দা পরবর্তী কালের তুলনায় উত্তরণের সম্ভাবনা অনেক বেশি ত্রুটিপূর্ণ বলেই দৃশ্যমান হচ্ছে। এমনটা হওয়ার প্রধান কারণ, সীমান্ত ভেদে বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রণোদনা ও টিকা কর্মসূচির অসমতা। সবচেয়ে নাজুক হাল উদীয়মান অর্থনীতি এবং ইউরো জোনের দেশসমূহে। ইউরো জোনের দুই বৃহৎ অর্থনীতি ফ্রান্স ও ইতালি সম্প্রতি ভাইরাসের বিস্তার রোধে চলমান লকডাউনের মেয়াদও বাড়ায়।

গেল সপ্তাহে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, “বৈশ্বিক অর্থনীতির সার্বিক পূর্বাভাসে উন্নতি আসলেও, সম্ভাবনাগুলো বিপজ্জনকভাবে বিচ্ছিন্নতায় রূপ নিচ্ছে। এখনও সব দেশের সকল মানুষের জন্য টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়নি। বিপুল সংখ্যক মানুষ নিয়ত চাকরি হারাচ্ছেন এবং ক্রমবর্ধমান অতি-দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছেন। অনেক দেশ উত্তরণের পথ থেকে পিছিয়েও পড়ছে।”

ফলাফলস্বরূপ: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো করে মহামারির ক্ষয়ক্ষতি সম্পূর্ণভাবে কাটিয়ে উঠতে চলা দেশের কাতারে যোগ দিতে বিশ্বের একটি বিশাল অংশের কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। এমনটা হলে, ২০২৪ সালে গড় বৈশ্বিক উৎপাদন হবে মহামারি পূর্বকালে দেওয়া আভাসের তুলনায় ৩ শতাংশ কম। আইএমএফ জানায়, এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে পর্যটন এবং সেবা ভিত্তিক খাতের উপর নির্ভরশীল দেশগুলো।

অসম বিকাশের এই পার্থক্য ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্স তাদের নতুনতম প্রাক্কালন সূচি “নাউকাস্ট” এর মাধ্যমে প্রকাশ করে। সেখানে চলতি ২০২১ সালের প্রথম তিন মাসে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি পূর্ববর্তী প্রান্তিকের তুলনায় ১.৩ শতাংশ অনুমান করা হয়েছে। তবে ওই একই আভাস সূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পুনর্জীবিত হওয়ার চিত্র উঠে আসলেও, জানানো হয় ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য এবং জাপানের অর্থনীতি ক্রমে সঙ্কুচিত হওয়ার কথা। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ব্রাজিল, রাশিয়া ও ভারত স্পষ্টতই পিছিয়ে পড়েছে চীনের গতির কাছে।

চলতি বছরের পুরো সময়ে ৬.৯ শতাংশ বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির আভাস দিয়েছে ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্স, যা ১৯৬০ সালের পর সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধির রেকর্ড। এই স্ফীত আভাসের আওতায় আমলে নেওয়া হয়; ভাইরাসের হুমকি হ্রাস, মার্কিন সরকারের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের প্রণোদনার প্রভাব এবং জমানো সঞ্চয় থেকে ভোক্তাদের খরচের প্রবণতা।

কিন্তু, আভাসটির বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সকল দেশ কত দ্রুত অধিকাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে পারে তার ওপর। এতে যত বেশি সময় লাগবে, বিশ্ব অর্থনীতির ঘাড়ে ভাইরাসের হুমকি ততোই প্রলম্বিত হবে। তাছাড়া, অভিযোজনের কারণে নতুন ধরন সৃষ্টির ফলে ভাইরাসের হুমকি আন্তর্জাতিক সঙ্কটেও রূপ নিয়েছে।

ব্লুমবার্গ ভ্যাকসিন ট্র্যাকার অনুসারে, নিজ জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র, সেই তুলনায় ইউরোপিয় ইউনিয়ন ১০ শতাংশ হারও অর্জন করতে পারেনি। মেক্সিকো, রাশিয়া এবং ব্রাজিলে তা ৬ শতাংশেরও কম। আর জাপানে সংখ্যাটি ১ শতাংশের চেয়েও কম।

ব্যাংক অব সিঙ্গাপুরের প্রধান অর্থনীতিবিদ মনসুর মহি-উদ্দিন বলেন, “এখানে প্রধান শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে জীবাণুর বিস্তার রোধ আর প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য করার সুযোগ নেই।”

মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তা নাথান শিটস বলেন, চলতি সপ্তাহের আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বৈঠককে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও প্রণোদনার পথ থেকে সরে না আসার ব্যাপারে উৎসাহিত করবে বলে তিনি আশা করছেন। তার মতে, প্রণোদনা বন্ধ করার সঠিক সময় যে এখনও আসেনি, মার্কিন সরকার সেই যুক্তি প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এমনতর যুক্তির পেছনে প্রধান লক্ষ্যই হবে ইউরোপকে প্রভাবিত করা। বিশেষ করে, জার্মানিকে- কারণ দেশটির রয়েছে বার্ষিক ব্যয় সঙ্কোচনের দীর্ঘ ইতিহাস। ইউরোপিয় ইউনিয়নের ৭৫০ বিলিয়ন ইউরোর যৌথ করোনাভাইরাস উত্তরণ সহযোগী তহবিল থেকে চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধের আগে সহায়তা শুরু হবে না। সেই তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র দুই দিক থেকে যুক্তি দেওয়ার সুবিধা পাবে। প্রথমত; স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালীকরণ এবং দ্বিতীয়ত; মার্কিন অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন একজন অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ। ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি আইএমএফ বৈঠকের সম্ভবনাময় দিকগুলো কাজে লাগানোর সঙ্গে ভালো করেই পরিচিত।

অবশ্য, এই বৈঠকে বেশ কিছু ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় দিকটি হলো ভ্যাকসিন মজুতকরণ। যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব চাহিদার থেকেও বেশি ডোজ মজুদ করে টিকা কর্মসূচি চালাচ্ছে, যা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে অনেক দেশের মধ্যে। শিটস বলেন, “বৈঠকের সময় আমরা সমতার ভিত্তিতে সকলের জন্য টিকাদান নিশ্চিত করার জোরালো আহবান শোনার ধারণা করছি। এনিয়ে নিঃসন্দেহে সমালোচনাও হবে।”

আবার “বাইডেন প্রশাসনের প্রণোদনা প্যাকেজকে দ্বিধারী তলোয়ার” বলে মন্তব্য করেন আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মাওরি অবস্টফেল্ড। তিনি বর্তমানে ওয়াশিংটন ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক পিটারসন ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্সে সিনিয়র ফেলো হিসেবে যুক্ত আছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সুদহার বাড়তে থাকায় “বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা সঙ্কুচিত হবে। একারণে মহামারির অভিঘাত মোকাবিলায় বিপুল ঋণ নেওয়া দেশগুলোর পক্ষে দেনার টেকসই ব্যবস্থাপনা অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।” একথার মাধ্যমে তিনি অন্যান্য দেশের সরকারের প্রণোদনা সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ার দিকেই ইঙ্গিত দেন, যা স্বল্পোন্নত ও দরিদ্র দেশের অর্থনৈতিক উত্তরণের পথ আরও দুর্গম করবে।

সূত্র: ব্লুমবার্গ

সর্বাধিক পঠিত