প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী: চল মিলি আসাম যাব 

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী: বিডি টুডে, শনিবার ১১ ই অগাস্ট নিউজ করেছে, বাংগালী নয়, বাংলাদেশী মুসলিমদের তাড়াবে বিজেপি।

‘আমরা বাংলাদেশী মুসলিমদের তাড়াব, বাংগালীদের নয়’- পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি’র একটি প্রচারপত্র ঝুলছে কোলকাতায়। দলটির সভাপতি অমিত শাহের কলকাতা সফরের আগে আগে এই প্রচার চালিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান শহরটিতে।
বিজেপির একজন জেষ্ঠ নেতা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, ‘আমরা প্রতিবেশি দেশ গুলো থেকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হওয়া হিন্দুদের আশ্রয় দেব। তবে এখানে অবৈধ ভাবে বাসকারী কোন মুসলিমকে আমরা আশ্রয় দিতে পারিনা।
বিজেপির সুত্র বলেছে – আসামের মত পশ্চিমবঙ্গেও তারা নাগরিকত্বের এই তালিকা প্রকাশ করতে চায়’।

বাংলা ট্রিবিউন জুলাই ৩১, ২০১৮ ইং: ‘রোহিঙ্গা বাংলাদেশীদের গুলি করে হত্যা করঃ ভারতীয় এমপি’।

ভারতে বসবাসরত ‘অবৈধ ও রোহিঙ্গারা’ স্বতস্ফুর্তভাবে দেশ না ছাড়লে তাদের গুলি করে হত্যা কর । ৩০ শে জুলাই সোমবার আসামে ভারতীয় নাগরিকদের চুড়ান্ত খসড়া তালিকা প্রকাশের একদিনের মাথায় মংগলবার এমন মন্তব্য করলেন দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র এমপি রাজা সিং। ওই তালিকায় বাদ পড়েছে দেশটির ৪০ লাখ বাসিন্দার নাম যাদের বেশিরভাগই মুসলিম ।

এ বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সভায় সরব হন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহও। তিনি বলেন এনআরসি তৈরী করা হয়েছে শরনার্থীদের চিহ্নিত করার জন্যে।

নয়া দিগন্ত ৩১শে জুলাই ২০১৮: ‘অশান্ত হয়ে উঠতে পারে আসাম’

ভারতের আসাম রাজ্যে লাখ লাখ মানুষের পরিচয় ও নাগরিকত্বের বিষয়টি বহুদিন ধরে-ই তাদের জন্য উদ্বেগের কারন। এটি ভারতের এমন একটি রাজ্য যেখানে বসবাস করে বহু জাতির মানুষ। এসব অধিবাসীর মধ্যে রয়েছে বাঙ্গালী, অসমীয়-ভাষী হিন্দু এবং বহু নৃতাত্মিক গোষ্ঠীর শংকর। আসামে মোট জনসংখ্যা ৩ কোটি ২০ লাখ যার এক তৃতীয়াংশ মুসলিম। ভারত শাসিত কাশ্মীরের পরে এই রাজ্যেই সবচে বেশি মুসলিমের বাস। এদের অনেকেই অভিবাসী পুর্বপুরুষদের সুত্র ধরে ব্রিটিশ শাসনের সময় এখানে স্থায়ী হয়েছেন।

প্রায় ছয় বছর ধরে চলা এক আন্দোলনের পর প্রতিবাদকারীদের সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি চুক্তি হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। ওই চুক্তিতে বলা হয় ১৯৭১ সালের ২৪ শে মার্চের পর যারা কাগজপত্র ছাড়া আসামে প্রবেশ করেছে তাদেরকে বিদাশী বলে বিবেচনা করা হবে।

এখন বিতর্কিত জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর (এন আর সি ) যে খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হলো তাঁর ফলে ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ হয়ে গেল অবৈধ বিদেশী। ওই চুড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর চল্লিশ লাখ মানুষ রাতারাতি রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ায় এই রাজ্যে সহিংসতারও আশংকা করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি থেকে নির্বাচনের আগেই ঘোষণা করা হয়েছে যে, অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদেরকে এই রাজ্য থেকে বের করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

অনেকেই বলছেন মি মোদীর দল বিজেপি নির্বাচনী স্বার্থে আসামে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। তাঁর দলটি বলছে অবৈধ হিন্দুরা সেখানে থাকতে পারবে কিন্তু অবৈধ মুসলিম বাসিন্দাদেরকে দেশ থেকে বের করে দিতে হবে।

খুব তাড়াহুড়ো করে এবং প্রচুর অর্থ খরচ করে এ রকম একটি তালিকা তৈরী করা হল যা শেষ পর্যন্ত বিদেশীদের প্রতি ঘৃণা এবং অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।

আসাম নিয়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিমের রিপোর্ট: ‘ইউনাইটেড এগেইন্সট হেইট’- এর একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম সম্প্রতি আসামের ‘ডাউটফুল সিটিজেন’ সম্পর্কে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। উত্তর প্রদেশের সাবেক আইজিপি এস আর দারা এই টিমের নেত্রীত্ব দেন। এ রিপোর্টের প্রারম্ভিকায় এস আর দারাপুরি লিখেছেন- ‘এই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিমের অংশ হিসেবে এবং এর সরেজমিন তদন্ত থেকে শুরু করে রিপোর্ট তৈরির কাজ পর্যন্ত এর প্রতিদিনের কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার সুত্রে নিশ্চিত বলতে পারি, আসাম এখন আগ্নেয়গিরির উপর অবস্থান করছে। যে কোন সময় এর উদ্গীরন ঘটতে পারে। যদি আসামের বাংলাভাষাভাষী মুসলমান ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর ভাষা ও ধর্মের ভিত্তিতে ন্যায় বিচার করা না হয়। যদি ন্যাশনাল রেজিষ্ট্রেশন অব সিটিজেনসের ( এন আর সি ) হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া সময় মত হালনাগাদ করা না হয়, তবে এমনটি ঘটে যেতে পারে যে কোন সময়।

লোকগুলোকে এমন সুযোগও দেয়া হচ্ছে না যাতে এরা ফরেনার্স ট্রাইবুনালে প্রমান করতে পারেন যে, এরা ভারতেরই নাগরিক। তাছাড়া ‘ডাউটফুল’ ভোটারের ধারনা সম্পুর্ন অবৈধ, সংবিধানে যার কোন স্থান নেই। কেউ হতে পারেন নাগরিক কিংবা অনাগরিক। হতে পারেন ‘ডাউটফুল সিটিজেন’। কিন্তু মানুষকে বিদেশী ঘোষণা করা হচ্ছে একটি পক্ষের স্বার্থে। আমরা লক্ষ করেছি যেসব লোককে বিদেশী ঘোষণা করা হচ্ছে তাদেরকে রায়ের কপিও দেয়া হচ্ছে না। ফলে উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার হারাচ্ছেন ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে থাকা এসব ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষের দল। চুড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর লাখ লাখ লোক হবে গৃহহীন এবং রাষ্ট্রহীন। এদের কি করা হবে, আপাতত তাঁর কোন পরিকল্পনা রাষ্ট্রের হাতে নেই। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অতিরিক্ত সেনাবাহিনী মোতায়েন এটাই নির্দেশ করে, সামনে অপেক্ষায় আছে একটি গোলমেলে পরিস্থিতি এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যত। যারা ফরেনার হিসেবে চিহ্নিত তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়। এই কারাগার তাদের জন্য ডিটেনশন সেন্টার। বন্দীদেরও একটা অধিকার আছে। আসামের ছয়টি ডিটেনশন ক্যাম্পে কোন বন্দীর সেটুকু অধিকারও নেই।

উল্লিখিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম চলতি বছরের ২৬ শে জুন থেকে ৩০ শে জুন পর্যন্ত সময়ে স্বাক্ষাত করেছে সুশীল সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী, গ্রামবাসী, আইনজীবি, নাগরিক অধিকার বিষয়ক কমিটি, বুদ্ধিজীবি ও অন্যান্যদের সাথে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তারা বেশ কিছু সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছেন। এর মধ্যে কাউকে বিদেশী কিংবা অবৈধ অভিবাসী প্রমানের দায়িত্ব ছিল অভিযোগকারীর উপর, এখন সে দায় চাপানো হয়েছে অভিযুক্তের উপর। একজন লোকের বৈধ কাগজপত্র নাও থাকতে পারে নানান কারনে। নদী ভাঙ্গন, বন্যায় গ্রাম বিলীন হওয়ার কারনে স্থান পরিবর্তন ইত্যাদি নানা কারনে কাগজপত্র হারিয়ে যেতে পারে। অনেকে বিয়ের কারনে কিংবা কর্মস্থলের কারনেও স্থান পরিবর্তন করেন। অথচ তাদের নির্ভর করতে হয় পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্তের উপরে।

আর কোন ডকুমেন্টস কিংবা রেফারেন্স লিখব না। লেখা বড় হয়ে গেছে। এদেশের মানুষ কিলোবাইট খরচ করে পর্নো দেখে, দেশের খবরও রাখার মানসিকতা এদের নাই। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি একেবারে শেষের দিকে এসে বলেছে যে, বন্যার কারনেও কারো কারো কাগজপত্র খোয়া যেতে পারে। এই বন্যা হচ্ছে ব্রক্ষ্মপুত্রের বন্যা। আপনাদের মনে আছে কিনা জানিনা, আসামবাসীকে ব্রক্ষ্মপুত্রের বন্যা থেকে বাঁচাতে স্বেচ্ছাশ্রমে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মান করেছিলেন এদেশের ইতিহাসে অখ্যাত হয়ে যাওয়া এক বীর। তাঁর নাম আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। আসামকে ভাসান থেকে রক্ষার কারনেই একদা আসামের সর্বস্তরের লোকজন তাকে ‘ভাসানী’ উপাধী দিয়েছিলেন।

উপমহাদেশ বিভক্তির সময় যেসব অঞ্চল নিয়ে ভারত পাকিস্তানের বিবাদ কমানো যাচ্ছিল না তাঁর অন্যতম হচ্ছে কাশ্মীর এবং আসাম। কাশ্মীরে মাত্র সাত দিনে ১৫২ টা গ্রাম জনশুন্য করে ফেলেছিল ভারতীয় বাহিনী, কংগ্রেস, আর এস এস সহ সকল উগ্রপন্থী দলের লোকেরা। সেসব গ্রামের একজনও বাচতে পারেনি যারা বলবে কিভাবে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। তারপরেও পাকিস্তান তখন গনভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে এই দুই অঞ্চলের জনগনের রায়ের উপরই তাদের ভবিষ্যত ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব করেন। এতে সায় ছিল খোদ জাতিসংঘেরও। এমন একটি প্রস্তাবও তখন পাশ হয়েছিল। কিন্তু কানে তুলেনি ভারত। তারা কাশ্মীরের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে আসামে গনভোটের আয়োজন করেন। আজকের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাল মুহিতের বাবা সম্ভবত মুসলিম লীগের হয়ে পুরো আসাম চষে বেড়ান। সে গনভোটে আসাম পাকিস্তানের পক্ষে রায় দিলে ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে এবং আসামকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবী করে। তারা আসামের দখল ছাড়েনি তখন।

আজ সেই আসাম-ই বাংলাদেশের গলায় বিধবে বলে মনে হচ্ছে। তবে একটা ব্যাপার মাথায় আসে না। আমার ন্যায্য পাওনা কেউ জোর করে দখলেই রাখলেই কি আমার দাবি বিলীন হয়ে যায় ? যদি না যায় তবে আসাম আমাদের। আমরা-ই ঠিক করব আসামের জনগন কিভাবে শান্তিপুর্ন সহাবস্থান করতে পারে। আমরা যদি আমাদের দাবী থেকে সরে এসে না থাকি তবে কিছুদিন পর পর ভারতের মন্ত্রীরা কিভাবে হুমকি দেয় এই বলে যে, সিলেট সহ বাংলাদেশের বড় একটা অংশ দখলে নিয়ে তারা আজ যে চল্লিশ লক্ষ মানুষকে রাষ্ট্রহীন করেছে তাদের বসতের ব্যাবস্থা করবে। এখন কথা হচ্ছে, আসাম ভারতের হলে তো ভারত মাথা ঘামাবে। আসাম তো ভারতেরই না। আমরা কি বলি, মনিপুর দখল করে আসামের হিন্দুদের পুনর্বাসন করা হবে ? বলিনা। এটা সভ্য ভাষা নয়। পাশাপাশি রাষ্ট্র পরস্পর যুদ্ধংদেহী মনোভাব ধরে রাখলে এবং কেউ যদি পিছু না হটে তবে তাঁর পরিনতি কি হয়, বিশ্ববাসী ইতিমধ্যেই বহুবার দেখেছে। নতুন করে আর দেখার কিছু নেই। আবার দাবীকে জিইয়ে না রাখার অর্থ এই নয় যে, আসাম তোমাদের বলে স্বীকার করে নিলাম। আমাদের সময় আসছে আসাম সমস্যা নিজেদের গাঁয়ে চড়ে বসার আগেই এর সমাধানের পথ খোঁজা। আমাদের মনে রাখতে হবে, ভারত হচ্ছে সেই রাষ্ট্র যার সাথে প্রতিবেশী সকল রাষ্টের ছোট কিংবা বড়, একবার কিংবা বহুবার যুদ্ধ হয়েছে। এটা প্রমানিত যে, ভারত চলে চানক্য নীতিতে। যেখানে বলা আছে- প্রতিবেশী সকলেই তোমার শত্রু, প্রতিবেশীর প্রতিবেশী তোমার মিত্র। ভারতের বেলায় এই কথাটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য। ভারত আমাদের প্রতিবেশী, আবার চায়না ভারতের প্রতিবেশী। ফলে ভারত যেখানেই সমস্যা জিইয়ে তুলবে তাঁর সমাধানের জন্যে আমাদেরকে খুব বেশিদুর ভাবতে হবে না। ভারতের নীতি-ই ভারতের আগ্রাসন থেকে বাচার একমাত্র উপায়।

বাবরী মসজিদ ম্যাসাকার করে ভারতীয় বিজেপি প্রথম আলোচনায় আসে। গোধরা গণহত্যার মধ্য দিয়ে মোদী নিজেকে দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে ফেলে যখন বিজেপি সভাপতি ছিলেন রাজনাথ সিং। এছাড়া এল কে আদভানীর মত নেতাও চুপসে তলিয়ে যায় গোধরা কান্ডের পর। আগামী বছরের নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার জন্যে হলেও বিজেপি আসামে একটা রায়টের বন্দোবস্ত করে ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ এবং নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই এ বিষয়টিকে হালকা করে দেখার উপায় নেই।

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী: ডেন্টাল সার্জন, কলাম লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত