প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: ছন্দাইনন্দাইয়ে আমরা কতো ক্রিয়েটিভ!

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: দেশের আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বেতনের সঙ্গে গবেষণা ভাতা নিয়ে থাকেন। এবার সরকারি হিসেব কমিটি এরকম ঢালাওভাবে গবেষণা ভাতা দেওয়া বন্ধের জন্য সুপারিশ করেছে। লজ্জা হবে? লজ্জা হয় না? আমি ২০১৯ সালে এই বিষয় নিয়ে লিখেছিলাম। বাই দ্য ওয়ে, সরকারি হিসেব কমিটি যারা এই গবেষণা ভাতাকে অনৈতিক বলছেন তারাও কিন্তু বিভিন্ন সভা সেমিনারে যোগ দিয়ে এনভেলপ ভাতা গ্রহণ করেন। আসলে এই দেশের নীতি নৈতিকতার একটা ধস নেমেছে। এইটা রোধ করতে না পারলে টাকাপয়সায় যতোই উন্নত হই ষোলো আনাই মিছে হবে। আমি ২০১৯ সালে ইনকাম ট্যাক্স দিতে গিয়ে বিষয়টি প্রথম লক্ষ্য করি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে সরবরাহকৃত আমার স্যালারি স্টেটমেন্ট আমি গবেষণা ভাতা বাবদ ‘৫২৫০০’  টাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছি। তার মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অধ্যাপকরা এই পরিমাণ গবেষণা পেয়েছে এবং নিশ্চই সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক ছাড়াও প্রভাষকরাও সমপরিমাণ বা তার কাছাকাছি একটি পরিমাণ পেয়েছে। এইভাবে গবেষণা না করে যদি গবেষণার জন্য ভাতা পাওয়া যায় তাহলে গবেষণা করবে কোন বলদে?  গবেষণা যারা না করে তাদেরকেও প্রতিমাসে ভাতা দেওয়াটা যেমন অযৌক্তিক আর ওই শিক্ষক এই ভাতা নেওয়াটাও অনৈতিক। পৃথিবীর কোথাও কি এইরকমভাবে গবেষণা ভাতা দেওয়ার নজির আছে? এইটা অকল্পনীয়! প্রথম কথা হলো গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া যায়। এইটা বেতন ভাতা হিসেবে দেওয়ার বিষয় না। দ্বিতীয় কথা হলো এটা সকলকে এক পাল্লায় মেপে দেওয়ার বিষয় না। কেবল যারা গবেষণা করে বা যাদের গবেষণার জন্য টাকার প্রয়োজন আছে এবং যার যেমন প্রয়োজন যাচাইবাছাই করে কেবল তাদেরকেই প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া উচিত। ভাতা হিসেবে নয়। এইভাবে বেতনভাতা হিসেবে দিলে সবাই এটাকে বেতনের অংশ ভাববে।

কতোজনে এই টাকাটা গবেষণা কাজে ব্যয় করেছেন? অন্যদের কথা জানি না। আমি আমার কথা বলতে পারি। আমি প্রতিবছর এর চেয়েও বেশি টাকা গবেষণা সংক্রান্ত কাজে ব্যয় করি। আমার অফিসের কম্পিউটার, আমার অফিসের সোফা, চেয়ার ইত্যাদি অনেক কিছুই আমার নিজের টাকায় কিনা। সবাইকে গড়ের মাল হিসেবে বিবেচনা করা এই দেশে এটা একটি বড় সমস্যা। সবাইকে সমান treat করলে বিশেষ মানুষ তৈরি হবে না। গবেষণার জন্য যৎসামান্য যতোটুকু টাকাই থাকুক না কেন সেটা বিচার বিশ্লেষণ করে যাদের প্রয়োজন কেবল তাদের দিলে এই টাকার সদ্ব্যবহার হতো। প্রশ্ন হলো কর্তৃপক্ষ কেন এইরকম করে বা করল? এর একটি কারণ হতে পারে ভোটের রাজনীতি। সকলকে তুষ্ট করে ভোটে জেতার রাজনীতি। আর দ্বিতীয় হতে পারে শিক্ষকদের বেতন খুব কম। বেসিক সরকারি কর্মকর্তাদের সমান হলেও অন্যান্য সুবিধাদি তেমন না থাকায় বেতন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা মিলিয়ে যা পায় খুবই যৎসামান্য। ফলে শিক্ষকরা নানা ছন্দাইনন্দাইয়ে ব্যস্ত। কেউ পার্ট-টাইম শিক্ষকতা, কেউ কনসাল্টেন্সি, কেউ রাজনীতির মাধ্যমে বিভিন্ন কিমিটিতে ঢুকে এনভেলপ মানি ইত্যাদির দৌড়ে ব্যস্ত। সরকারি কর্মকর্তাদের এইরকম সুবিধাদি অনেক। যেমন গাড়ি না ব্যবহার করেও গাড়ির তেল ভাতা, অথবা গাড়ি CNG চালিত হলেও তেল ভাতা, চাকুরির কাজের পার্ট হিসেবে মিটিং করলেও ইনভেলাপ মানি ইত্যাদি নানা ফন্দি ফিকির করে টাকা কামানোর ক্রেয়েটিভিতে আমরা বিশ্বে এক নম্বর হবো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শুধুই কি গবেষণা ভাতা? আরো বেশ কিছু ভাতা দেওয়া হয় যা আমার কাছে অনৈতিক মনে হয়। যেমন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন ভাতা, পরীক্ষায় ইনভিজিলেটরের দায়িত্বের জন্য ভাতা ইত্যাদি।

এইসব কাজে কেন ভাতা দিতে হবে? এইসবইতো একজন শিক্ষকের চাকরির অংশ। আসলে শিক্ষকদের বেতন যদি যথেষ্ট সম্মানজনক হতো তাহলে তাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হতো আর তখন এসব ছন্দাই নন্দাই করার মানসিকতা তৈরি হতো না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অধ্যাপকের বেতন আমার প্রায় তিনগুন বা তারও বেশি। সেই পরিমাণ বেতন দিয়ে এসব অনৈতিক ভাতা বন্ধ করলে শিক্ষকরা অনেকটা সৎ থাকতো। আর এই কারিগররা সৎ হলে সমাজেও সৎ হতো। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষকদের সম্মান এবং সম্মানী ভারত ও পাকিস্তান থেকে অনেক অনেক কম। গবেষণার জন্য বরাদ্দও নেই বললেই চলে। শিক্ষকদের গবেষণার কথা বললে বলবে: ‘গবেষণার জন্য সুযোগ কই যে গবেষণা করব? গবেষণার জন্য appreciation  কোথায় যে গবেষণা করব? ভালো জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ ছাপালে তার মূল্যায়ন কোথায় যে গবেষণা করব?’ আবার সরকারের কাছে গবেষণার জন্য দাবি জানালে বলবে ‘শিক্ষকরাতো গবেষণা করেন না তাহলে শুধু শুধু বরাদ্দ দিয়ে লাভ কি? শিক্ষকরাতো বিভিন্ন পদ পদবি পাওয়ার লবিইং-এ ব্যস্ত শুধু শুধু বরাদ্দ দিয়ে লাভ কি? এর কোনোটিই অসত্য না কারণ আমরা এক ভিসিয়াস সার্কলে বন্দি। একই সাথে শিক্ষকরা কিন্তু গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য আন্দোলনও করছে না। কইনছেন দেখি কি একটা শৃঙ্খলের মধ্যে আটকে গেলাম! লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত