প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আতিকুজ্জামান ফিলিপ : আমাদের মতো অভাগা প্রজন্ম যারা মুক্তিযুদ্ধকালের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হতে পারিনি তাদের জন্যই মনে হয়  ৫ই ফেব্রুয়ারি  ও  এই গণজাগরণ এসেছিলো

আতিকুজ্জামান ফিলিপ : ২০১৩’র ৫ ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার পরপরই রায়টি আমাদের কাক্সিক্ষতমাফিক না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে যে স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলাম ফেসবুক মেমোরি আজ তা মনে করিয়ে দিলো। একে একে মনে পড়ে গেলো সেদিনের খণ্ড খণ্ড কতগুলো স্মৃতিও। রায় ঘোষণার পরপরই তার প্রতিবাদ জানিয়ে দুপুর বারোটা সাড়ে বারোটার দিকে বিএসএমএমইউ’র বটতলা থেকে যতোদূর মনে পড়ে Ahsan Habib হেলাল ভাইয়ের নেতৃত্বে একটা ছোটখাটো মিছিল নিয়ে শাহবাগ চত্বর হয়ে হোটেল শেরাটন পর্যন্ত গিয়ে আবার শাহবাগ চত্বরে এসে মিছিল শেষ করেছিলাম। সেই মিছিলে আমাদের অগ্রজ Ariful Islam Joarder  টিটো ভাইও ছিলেন। রাস্তাঘাট অন্যদিনের তুলনায় একটু ফাকাই ছিলো, সেসময় রায় ঘোষণার দিনগুলোতে এমনই হতো। জামাত শিবিরের নৈরাজ্যের আতঙ্কে অনেকেই রায় ঘোষণার দিনগুলোতে ব্যক্তিগত বাহন নিয়ে বের হতো না। আমরা যখন মিছিলটা শুরু করেছিলাম তখনও শুরুটা সেইভাবে শুরু হয়নি।

বিএসএমএমইউ আমাদের কর্মস্থল হওয়ায় এবং তা একেবারেই শাহবাগের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হওয়ায় আমরা হয়তো এই বাড়তি সুবিধাটুকু পেয়েছিলাম যে আমরা সবার আগেই শাহবাগে পৌঁছুতে পেরেছিলাম। আমরা যখন শেরাটনের মোড় থেকে মিছিল নিয়ে ঘুরে শাহবাগ চত্বরে ফিরছিলাম ততোক্ষণে আমাদের তৎকালীন রাজনৈতিক সতীর্থ অনুজ  ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের সংগঠনটি অবশ্য শাহবাগে এসে পড়েছিলো।

ইমরানদের হয়তো আগে থেকেই প্রস্তুতি ছিলো। যতোদূর মনে পড়ে, যদি আমার স্মৃতিশক্তি আমাকে বিট্রে না করে থাকে তাহলে বলবো, তাদের হাতে কয়েকটি ব্যানারও মনে হয় তখন দেখেছিলাম। তারা সংগঠিত ছিলো ও প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলো। আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিলো না, কোন ব্যানার ফেস্টুনও ছিলো না। সেদিন রায় ঘোষণা হবে তাই সেটা নিয়ে আর সবার মতো আমাদের মধ্যেও চাঞ্চল্য ছিলো, এটুকুই। কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি ‘ফাঁসি’হবে আমরা এমনটাই আকাঙ্কা করেছিলাম। যখন রায় ঘোষণার সময় ঘনিয়ে আসলো আমরা অনেকেই যার যার ডিপার্টমেন্টের কাজ সেরে বিএসএমএমইউ’র বটতলায় জড়ো হতে লাগলাম। একসময় হেলাল ভাইও আমাদের মাঝে এসে উপস্থিত হলেন। ভেবেছিলাম একটা আনন্দ মিছিল করবো কিন্তু যখন রায় ঘোষিত হলো তখন একইসঙ্গে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হলাম।

আমরা যারা জুনিয়র ছিলাম তারা হেলাল ভাইকে প্রতিবাদ মিছিলের অনুরোধ জানালাম, হেলাল ভাই সম্মতি দিলেন এবং হেলাল ভাইয়ের নেতৃত্বে তৎক্ষনাৎ আমরা সেই ছোটখাটো প্রতিবাদ মিছিলটি বের করলাম। আমরা তখনো ভাবিনি ইমরানের নেতৃত্বে অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টদের সংগঠনটি সেদিনই বিকেল থেকে এতোবড় একটি মহীরুহ গণজাগরণ গড়ে তুলবে। তবে যে কথাটি না বললে অপরাধ হবে সেটা হলো এই গণজাগরণের সেদিনের শুরুতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলো।

যদিও পরবর্তীতে অনেকেই বিভিন্নভাবে ছাত্রলীগের সেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাটি অস্বীকার করতে একরকম মরিয়া আচরণ করেন বললেও মোটেও অত্যূক্তি হবে না।

যাইহোক, সেদিন সেই ৫ই ফেব্রুয়ারির পর থেকে সব যেন যাদুমন্ত্রের মতো ঘটতে লাগলো। মুক্তিযুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধুর অমীয় যাদুমন্ত্রতে বিমোহিত হয়ে কতিপয় নর্দমার কীট ব্যতিরেকে পুরো সাড়ে সাতকোটি বাঙালি যেমন করে এক বিন্দুতে মিলেছিলো, যেমন করে সাড়ে সাতকোটি কন্ঠ এক হয়ে এক ‘জয় বাংলা’  স্লোগানে আকাশ বাতাস কাঁপিয়েছিলো তেমন করেই যেন জনস্ফুরণ ঘটতে লাগলো। আমাদের মতো অভাগা প্রজন্ম যারা মুক্তিযুদ্ধকালের সেই মহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হতে পারিনি তাদের জন্যই মনে হয় এই ৫ ফেব্রুয়ারি এসেছিলো, তাদের জন্যই মনে হয় এই গণজাগরণ এসেছিলো। আমরাও সেদিন দেখেছিলাম কতিপয় নর্দমার কীট বাদে সারাদেশের সমূদয় তারুণ্য কিভাবে এক তালে এক লয়ে এক সুরে একই শাহবাগারের মোহনায় মিলেছিলো আর কিভাবে একই গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’স্লোগানে আকাশ বাতাশ প্রকম্পিত করেছিলো। একেকটা দিন যাচ্ছিলো আর শাহবাগের মোহনায় জনসমগম যেন গুনোত্তর হারে বাড়ছিলো।

সেসময় ঢাকার বিভিন্ন দূরবর্তী অঞ্চল থেকে যেমন ঝাকে ঝাকে মিছিলের বন্যা আসতে দেখেছি তেমনি ঢাকার বাইরে থেকেও মানুষকে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে এসে এই শাহবাগের মোহনায় মিলতে দেখেছি, মিছিলে স্লোগানে উদ্বেলিত হতে দেখেছি, গগনবিদারী চিৎকারে বাতাসে বজ্রমুঠি হানতে দেখেছি। শুধু কি শাহবাগ? মোটেও না! সেই স্বোচ্ছল মিছিল, সেই হৃদয়মোথিত আবেগ, সেই তারুণ্য আর প্রাণমাখানো আগুনের ঝলকা সেদিন শাহবাগ ছাড়িয়ে ছাপিয়ে গিয়েছিলো দেশের প্রতিটি শহরে শহরে, প্রতিটি নগরে নগরে, প্রতিটি গঞ্জে গঞ্জে, প্রতিটি গ্রামে গ্রামে, প্রতিটি কোণে কোণে!

অন্য সবার মতো আমরা চিকিৎসকরাও স্বাচি’র পক্ষ থেকে প্রতিটি দিন, প্রতিটি বিকেল, প্রতিটি সন্ধ্যায় মিছিল নিয়ে হাজির হয়েছি শাহবাগের সেই মোহনায়; কখনো ব্যানার হাতে, কখনো পতাকা মেলে কিংবা কখনো মোমবাতি জ্বালিয়ে। সেসময় আমাদের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি স্লোগানে শাহবাগের মোহনায় আমাদের চিকিৎসকদের অগ্রভাগে নিজে স্বশরীরে উপস্থিত থেকে আমাদেরকে সতত উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন স্বাচিপ’র তৎকালীন মহাসচিব এবং বর্তমানের সভাপতি Iqbal Arslan স্যার।  সেসময় শাহবাগ চত্বরের কেন্দ্রীয়  স্লোগানের পাশাপাশি ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দূরবর্তী বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বিভিন্ন সহযোদ্ধারা গুচ্ছে গুচ্ছে ভাগ হয়েও স্লোগান ধরতেন। আমাদের স্বাচিপ’র গুচ্ছেও তেমনি অনেকে স্লোগানে ধরতেন।

ছোটভাই Fuad’i স্লোগানে উপস্থিত সকলকেই ছুয়ে যেতো, Shaikh মামুন ভাই তো ওর নামই দিয়ে দিলো  স্লোগান মাস্টার’। মাঝে মাঝে মিছিল স্লোগানের ফাঁকে ফাঁকে দেশাত্ববোধক জাগরণের গানও চলতো। সেইসব গান যেন আরও জ্বালানী হিসেবে কাজ করতো, রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিতো, শিরায় শিরায় নাচন তুলে দিতো।

বন্ধু Riad Siddiky প্রাণ, Sanjoy, Mamun ও আরো অনেকেই গানের এই আসরে প্রাণ যোগাতো। শাহবাগ চত্বরেই স্বাচিপ’র তত্ত্বাবধানে একটা প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রও খোলা হয়েছিলো যেখান থেকে খাবার পানি, খাবার স্যালাইন, অ্যন্টি আলসারেন্ট, মাথা ব্যাথার জন্য প্যারাসিটামল বা এরকম আরো কিছু প্রাথমিক ওষুধ সরবরাহ করা হতো। খুব সম্ভবতঃ Towhid ভাই, Mir Mobarak Hossain দিগন্ত ভাই আর Mizanur Rahman মিজান ভাইয়ের পরিকল্পনায় এটা করা হয়েছিলো আর এটার সার্বিক দায়িত্বে ছিলো বন্ধু Nazmul, Hossain Imam ইমু, সঞ্জয় আর ছোটভাই সাগর।

কোথায় হারিয়ে গেলো সেই দিনগুলো! আহ্! আবারও যদি ফিরে আসতো! আবারও যদি সবাই প্রাণের বন্ধনে একইভাবে মিলতে পারতাম! আবার যদি কখনো ডাক আসে, আবার যদি ৭১’র পরাজিত হায়েনারা আমার পতাকা খামছে ধরতে চায় নিশ্চয় আমরা আবারও একইভাবে মিলিত হবো। আবারও বাতাসে বজ্রমুঠি হেনে গগনবিদারী ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে শাহবাগ কাঁপাবো। তবে জীবদ্দশায় যদি আবার ডাক না আসে তাহলে অন্তঃত এই সুখস্মৃতিই আমাদের জাগিয়ে রাখবে  যতোদিন বেঁচে থাকবো। কারণ এই স্মৃতির মাঝেই গর্ব আছে, এই স্মৃতির মাঝেই তৃপ্তি আছে, এই স্মৃতির মাঝেই সুখ আছে। এই স্মৃতি আগলেই আমার অনাগত প্রজন্মের কাছে বুক ফুলিয়ে বলতে পারবো আমিও সেদিন ছিলাম, আমরাও সেদিন ছিলাম। ছিলাম শাহবাগের মোহনায়। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত