প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মহেশখালীর মিষ্টি পান দেশ-বিদেশে সমাদৃত

ডেস্ক রিপোর্ট : দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবসহ সামাজিক রীতি, বিয়ে-শাদিতে মিষ্টি পানের খ্যাতির পাশাপাশি প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কক্সবাজার জেলার মহেশখালী মিষ্টি পানের জন্য বিখ্যাত। জেলায় ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টি পানের ব্যবসার উপর নির্ভর করে ৭টি উপজেলার প্রায় ৪০ হাজার পরিবার। পানচাষিদের দাবি, রপ্তানি বৃদ্ধি হলে পান উৎপাদন আরও বাড়বে।

সাগর আর নদীবেষ্টিত দ্বীপ উপজেলার নাম হচ্ছে মহেশখালী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলভূমি মহেশখালী দ্বীপ উপজেলাটির অবস্থান হলো দেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত কক্সবাজার জেলায়। মহেশখালী দ্বীপের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হলো মৎস্য, লবণ, মিষ্টি পান ও কৃষি। তবে দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ পান চাষের উপর নির্ভরশীল। চলতি মৌসুমে মহেশখালী উপজেলার বিল বরজ ও পাহাড়ের ঢালুতে পানের বাম্পার ফলন হওয়াতে পানচাষিরা মহাখুশি। পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এই ভূমি পান চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। মহেশখালীর পানের বিশেষত্ব হলো মিষ্টি স্বাদ। যার কারণে এই পান সারাদেশে বিখ্যাত। এ বছর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মিষ্টি পানের বাম্পার ফলন যেমন হয়েছে তেমনি হাট-বাজারে পানের দামও আকাশচুম্বী। এখানকার উৎপাদিত পান দেশজুড়ে বিখ্যাত সুস্বাদু মিষ্টি পান হিসেবে পরিচিত।

জেলা কৃষি অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে কক্সবাজার জেলায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে মহেশখালীতে ১৭শ’ হেক্টর এবং চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, সদর, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ১৮শ’ হেক্টর জমিতে চাষ হয়। পাহাড়ি জমিতে যে পান চাষ হয় তার হিসাব কৃষি বিভাগে নেই। তবে একটি সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ে অন্তত ২ হাজার হেক্টরেরও অধিক জমিতে পান চাষ হয়। এছাড়া পাহাড়ি এলাকায় একবার পানের চাষ করলে প্রায় দুই বছর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। সমতল জমিতে ফলন পাওয়া যায় প্রায় নয় মাস। সমতল জমিতে পানের চাষ শুরু হয় অক্টোবরে, শেষ হয় জুন মাসে। আর পাহাড়ি এলাকায় পানের চাষ যেকোনো সময় অথবা বর্ষা মৌসুমে বেশি করা যায়।

পান অত্যন্ত স্পর্শকাতর ফসল। সাধারণত বরজ তৈরি করে পানের চাষ করতে হয়। আবহাওয়া, মাটি, জাত, চাষাবাদ পদ্ধতি ইত্যাদির কারণে স্থানভেদে পানের ফলন কমবেশি হয়। পান চাষের জন্য বিশেষ দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা জরুরি। পানের ক্ষেতকে বলা হয় বরজ। বর্তমানে পান চাষের উপকরণ শন, উল, বাঁশ, কীটনাশক, সার, খৈল ইত্যাদির দাম বেড়ে যাওয়ায় পান চাষ করতে অধিক টাকার প্রয়োজন পড়ছে। যার কারণে চাষিরা জীবিকার তাগিদে মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ মুনাফার শর্তে টাকা ধার নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে লাভের বড় অংশটি চলে যায় মহাজনের খাতায়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চাষিরা সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নিজেরাই স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে।

মহেশখালীর পানচাষি সমিতির সভাপতি আবদুল কাইয়ূম বলেন, এ বছর যেভাবে পানের বাম্পার ফলন হয়েছে তেমনি পানের মূল্যও আকাশচুম্বী। বর্তমানে মৌসুমের শুরুতে প্রতি বিড়া বড় মিষ্টি পান ৪-৫শ’ টাকা দামে বিক্রি হয়। মাঝারি পান এক বিড়া ৪-৩শ’ টাকা দামে বিক্রি হয়। আর ছোট পান ২৫০-২০০ টাকা দামে বিক্রি হয়ে থাকে। ৪টি পানে হয় ১ গন্ডা, আর ৪৫ গন্ডা পানকে ১ বিড়া বলা হয়। তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশে পান রপ্তানি সরকারিভাবে বন্ধ থাকলেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পান রপ্তানি হচ্ছে। এখানকার পানের সুনাম দেশের সীমানা পেরিয়ে এশিয়া মহাদেশ ছাড়াও ইউরোপ-আমেরিকাতেও রয়েছে।’

মিষ্টি পান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ইলিয়াছ মিয়া বলেন, ‘কক্সবাজার জেলায় মিষ্টি পানের চাষ যেমন বেড়েছে একই সঙ্গে ফলনও বেড়েছে। এটি লাভজনক চাষ হওয়ায় এ পেশায় জড়িয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এবার পানের দাম স্থিতিশীল থাকলে কক্সবাজারেই অন্তত সাড়ে ৩শ’ কোটি টাকার পান উৎপাদন হবে। যার অধিকাংশ পানই সরবরাহ হয় কক্সবাজার ছাড়াও চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিলস্নায়। এছাড়া মিষ্টি পানের চাহিদা রয়েছে সৌদি আরব ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তাই রপ্তানি বাড়লে পানের চাষ বাড়বে, এতে উৎপাদনও আরও বাড়বে। অর্জিত হবে বৈদেশিক মুদ্রা।’

মহেশখালীর পানের
বরজ সাধারণত দুই ধরনের- পাহাড়ি বরজ এবং বিল বরজ। উপজেলার বড় মহেশখালী, হোয়ানক, কালারমারছড়া, ছোট মহেশখালী ও শাপলাপুর ইউনিয়নের পাহাড়ের ঢালু ও সমতল কৃষি জমিতে যুগ যুগ ধরে পান চাষ করে আসছেন স্থানীয় পানচাষিরা।

কালারমারছড়ার পানচাষি সৈয়দুল কাদের বলেন, ‘মৌসুমি পান চাষের সময়ে দাম বেশি থাকে এবং পানের উৎপাদন বেশি হয়। এক হেক্টর জমিতে পান চাষ করতে চাষিদের খরচ লাগে ৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকার মতো। বছরে প্রতি হেক্টর জমিতে আনুমানিক ১০৭ মেট্রিক টন পান উৎপাদন হয়। প্রতি হেক্টরে পান বিক্রি হয় প্রায় ১৬ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা। সেই হিসাবে চাষিরা খরচ বাদ দিয়ে লাভবান হন প্রতি হেক্টরে প্রায় ৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। প্রতি বছর মহেশখালী থেকে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন পান বাইরে রপ্তানি হচ্ছে।’

টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নতুন পলস্নানপাড়ার পানচাষি সুলতান আহমদ বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশের কারণে স্থানীয়ভাবে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পানের দাম বেড়েছে। টেকনাফে ৪৮০ হেক্টর জমিতে পানের চাষ হচ্ছে। উপজেলায় ২ হাজার ৭৫০ জন চাষির ২ হাজার ৮৯৫টি পান বরজ রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পান রপ্তানিতে অনেক ধরনের বাধা রয়েছে। যদি সরকার এই বিষয়ে একটু সুনজর দেয় তবে বৈদশিক মুদ্রা অর্জন করা সহজ হবে। এছাড়া পানচাষিদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হলে পানের উৎপাদন বাড়বে।’

কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কাসেম বলেন, ‘পানের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি সার ও কীটনাশক সহজলভ্য হওয়ায় কৃষকরা নির্বিঘ্নে চাষে কাজ করতে পারছে। পুরো মৌসুমেই তাদের সার ও কীটনাশকের ব্যাপারে চিন্তা করতে হয় না। কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের নানাভাবে সহযোগিতা করা হয়। কোনো রোগ দেখা দিলে তাৎক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া প্রতিনিয়ত মড়কের ব্যাপারে চাষিদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা হয়।’ -যায়যায়দিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত