প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : কোভিড-১৯ এবং ভ্যাকসিন : যে কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আগাম ধন্যবাদ

ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : কয়েকদিন আগেই ছিলো গত ১০ জানুয়ারি জাতির পিতার ঊনপঁঞ্চাশতম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। পাকিস্তানের কারাগার থেকে নয় মাসের বন্দিত্ব শেষে বাহাত্তরের এ দিনটিতে দেশে ফিরেছিলেন বঙ্গবন্ধু, লন্ডন এবং নয়াদিল্লি হয়ে। আর বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার এ দিনটিতেই পূর্ণতা পেয়েছিলো একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বরে আমাদের বিজয়। এদেশের নাম থেকে শুরু করে জাতীয় সঙ্গীত আর এমনকি বাংলাদেশ নামক জাতি রাষ্ট্রটির ধারণাটিও এই একজন ব্যক্তিরই ঠিক করে দেওয়া। কাজেই তার অনুপস্থিতিতে ‘তার বাংলাদেশের’ রাজনৈতিক অভ্যুদয় ছিলো অসম্পূর্ণ। ১০ জানুয়ারি পরবর্তী বাংলাদেশের যে অগ্রযাত্রা, সে যাত্রায় যতি চিহ্ন বসিয়ে দিয়েছিলো পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোরে দেশি-বিদেশি অশুভ চক্রের চক্রান্তের সফল মঞ্চায়ন। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নবজন্ম আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে আজ থেকে বারোটি বছর আগে। মাঝে তার যে ক্ষণস্থায়ী প্রধানমন্ত্রিত্ব তার যবনিকাও এসেছিলো মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় তথাকথিত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বে। আজকের সামনে ছুটে চলা বাংলাদেশের অর্জনগুলো বিশ্লেষণও এই লেখার বিষয়বস্তু নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত করে বলা যেতেই পারে যে আজকে যে বাংলাদেশে বসে আমরা আমাদের সুকন্যা-সূর্যদের জন্য আগামীর উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর, তার সূচনাটা হয়েছিলো যেদিন নিজ পরিবার-পরিজনের মায়া বিসর্জন দিয়ে পিতার মতোই পুরো দেশকে নিজ পরিবার জ্ঞান করে, সামরিক শাসকের হুমকি-ধামকিকে থোড়াই পরোয়া করে দেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন প্রিয় নেত্রী।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর স্বাধীন বাংলাদেশ তার সবচাইতে বড় দুর্যোগকালটা অতিক্রম করছে এই মুহূর্তে। একই কথা সম্ভবত প্রযোজ্য এই বিশে^র এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে প্রতিটি দেশের বেলাতেই। কারণ বিশ^ এখন মোকাবেলা করছে একটি অতিমারী, যার ধাক্কায় ধরাশায়ী একের পর এক উন্নত রাষ্ট্র, শক্তিশালী অর্থনীতি আর ঈর্ষণীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। মার্কিন মুলুকের আয়তন আমাদের দেশের চেয়ে ১৭১ গুণ বড়। অথচ সুবিশাল দেশটির জনসংখ্যা মাত্র আমাদের প্রায় দ্বিগুণ। এতো উন্নত সে দেশে কোভিডে মৃত্যুর মিছিল আমাদের চেয়ে কততোগুণ লম্বা হিসাব কষেছেন কি কখনো? একের পর এক লকডাউনে অর্থনৈতিকভাবে পর্যদুস্ত নিউইয়র্ক-লন্ডন-বার্লিনবাসি রাস্তায় নেমে যখন বিক্ষোভ করছে, ঢাকার রাজপথে তখন আবারো কর্মচাঞ্চল্যের বাহুল্যে চিরচেনা যানজট। ইউনিসেফ যখন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্রিটেনের স্কুলগুলোতে ‘মিড ডে মিলের’ নামে খাদ্যত্রাণ বিতরণে ব্যস্ত, তখন এদেশে পয়লা জানুয়ারিতে যথারীতি বই উৎসব। ইউরোপের দেশে- দেশে প্রবৃদ্ধি যখন ঋণাত্মকের কোঠায়, তখন এদেশে তা ঈর্ষণীয় পাঁচ শতাংশের ঘরে। আর সবচেয়ে বড় কথা, জীবন আর জীবিকাকে পাশাপাশি সচল রাখার এই প্রচেষ্টায় মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় আপোস করা হয়নি এতোটুকুও। কোভিডের দ্বিতীয় ধাক্কায় কুপোকাৎ দেশগুলোর তালিকা যখন ক্রমবর্ধমান, তখন এদেশের কোভিডের উল্টো যাত্রা- নতুন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের দৈনিক হারটি ক্রমশই সঙ্কোচিত হতে-হতে পাঁচ শতাংশের সেই ম্যাজিক ফিগারটিও ছুঁয়ে ফেলেছে। ব্লুমবার্গের র‌্যাংঙ্কিয়ে বাংলাদেশ অবশ্য কয়েকদিন আগেই কোভিড-১৯ বিবেচনায় পৃথিবীর নিরাপদতম দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। যে বিবেচনাগুলোয় বাংলাদেশের এ অর্জন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এদেশে প্রতি এক লাখ নাগরিকের মধ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা মাত্র ৩৪ জন, কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৬ শতাংশ, প্রতি দশ লাখে মৃত্যুর সংখ্যা ৪৪ জন আর নতুন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের হার ১০ দশমিক ২ শতাংশ। লক্ষণীয় ব্লুমবার্গ যে দশটি ইন্ডিকেটর বিশ্লেষণ করে এই র‌্যাংঙ্কিংটি নির্ধারণ করেছে সেখানে বাংলাদেশ দুর্বলতার জায়গাটি হচ্ছে ভ্যাকসিন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের নামের পাশে যোগ হয়েছে আর মাত্র পাঁচটি পয়েন্ট। অথচ এই জায়গাটায় আরেকটু এগিয়ে থাকলেই ব্লুমবার্গের এ র‌্যাংঙ্কিয়ে আমরা অনায়াসে টপকে যেতে পারতাম সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরায়েল, রাশিয়া আর নেদারল্যান্ডসকেও। বলে রাখা ভালো, ব্লুমবার্গের এই র‌্যাংঙ্কিয়ে সবার শেষে জায়গা করে নিয়েছে পেরু, আর্জেন্টিনা আর মেক্সিকো।

দেশগুলোর অবস্থান যথাক্রমে ৫১, ৫২ আর ৫৩ তম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এই তালিকায় ৩৭ নম্বরে। আমাদের এই দুর্বলতাটুকুকেও সক্ষমতায় রূপান্তরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তার প্রথম প্রজ্ঞা ভ্যাকসিন বাছাইয়ে। ফাইজার আর মডার্না তৈরি ভ্যাকসিন পাওয়ার সম্ভাবনা আমাদের অনেক কম। পৃথিবীর তাবৎ বড়-বড় ধনী রাষ্ট্রগুলো অতি দামি এ ভ্যাকসিনগুলো এরই মধ্যে আগাম বুকিং দিয়ে বসে আছে। এ নিয়ে সম্প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাও। তাছাড়া মাইনাস ৭০ ডিগ্রিতে ফাইজারের ভ্যাকসিন সংরক্ষণের সক্ষমতা যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই সীমিত, সেখানে বাংলাদেশের কথা নিশ্চয়ই বলাই বাহুল্য। পাশাপাশি পৃথিবীর সবচাইতে কম দামি ভ্যাকসিনটিও বেছে নিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার তৈরি। কোভিশিল্ড নামের এ ভ্যাকসিনটি তৈরি করা হয়েছে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা থেকে টেকনোলজি ট্রান্সফারের মাধ্যমে। আর দামেও তা শুধু ফাইজার আর মডার্নাই নয়, এমনকি চীনা ভ্যাকসিনের চেয়েও সস্তা। পাশাপাশি সেরাম ইন্সটিটিউট বিশে^র বৃহত্তম ভ্যাকসিন উৎপাদক প্রতিষ্ঠান। বছরে তারা দেড়শ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন উৎপাদন করে যা ব্যবহৃত হয় পৃথিবীর কমপক্ষে ১৭০টি দেশে ইপিআই কার্যক্রমে। পৃথিবীতে ইপিআই-এর ৭০ শতাংশ ভ্যাকসিনই সরবরাহ করে এ প্রতিষ্ঠানটি। কাজেই তাদের কাছ থেকে ভ্যাকসিন যে আগেভাগে আসবে তেমনটাই প্রত্যাশিত। এ কারণেই নিজ দেশে চীনা আর সঙ্গে সেরাম ইনস্টিটিউটের ভ্যাকসিন দুইটির ট্রায়াল করার পরও ব্রাজিল আস্থা রাখছে সেরাম ইনস্টিটিউটের উপরই। পাশাপাশি অবশ্য এটাও মনে রাখতে হবে যে ব্রাজিলে ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সিনোভ্যাকের চায়নিজ ভ্যাকসিনটির কার্যকারিতা পাওয়া গেছে মাত্র ৫০ শতাংশের আশেপাশে। সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিনটির পরবর্তী গন্তব্য যে এখন ভাগাড়ে সেটা বলাই বাহুল্য। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি জাইর বলসোনারো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছেন তার দেশকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভারতীয় এ ভ্যাকসিনটি দেওয়ার জন্য। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক এ খবরটি অবশ্য একেবারেই প্রত্যাশিতই ছিলো। ভারতের সঙ্গে আমাদের যে ভৌগোলিক নৈকট্য সে কারণে ভারত থেকে ভ্যাকসিন আমদানি যেমন একদিকে সহজ হবে, তেমনি কমবে পরিবহন খরচও। মনে রাখতে হবে এ ভ্যাকসিনটি সংরক্ষণের জন্য ফাইজারের ভ্যাকসিনের মতো বিশেষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থারও প্রয়োজন পরবে না। সবচেয়ে বড় কথা ভারতের সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক সন্ধি আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষিত ‘নেইবার ফার্স্ট’ নীতির কারণে আমরা যে এ মাসেই যে ভ্যাকসিন পেতে চলেছি সেই খবরটিও এখন বাসি। অবশ্য প্রিয় প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশ যে তার প্রিয়তমের তালিকায় সে নিয়ে কখনোই কোনো রাখ-ঢাকও করেন না নরেন্দ্র মোদি, করেননি এবারও। গত সতের ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে অনলাইন সম্মেলনে তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের ভ্যাকসিন পাওয়ায় অগ্রাধিকার থাকবে বাংলাদেশের। সম্প্রতি ভারতীয় ভ্যাকসিন নিয়ে বিশেষ করে এদেশে কারো-কারো জল ঘোলা করার যে চিরায়ত প্রচেষ্টা, তার প্রেক্ষিতে তিনি দ্য ইকোনমিক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছিলেন যে, তার সিদ্ধান্তে কোন ব্যত্যয় হবে না। আর একই কথা স্পষ্ট করেছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার জনাব বিক্রম দোরাইস্বামীও। ভ্যাকসিন প্রাপ্তি ও বিতরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে সরাসরি দেখভাল তাতে কোভিড মোকাবেলায় জাতি নতুন আশা দেখছে। আমরা আস্থাশীল বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আমরা আমাদের জাতীয় জীবনের এই অন্যতম ক্রান্তিকালটির সফলভাবে অতিক্রমে সক্ষম হবো। মুজিববর্ষে পরাজিত হবে কোভিড-১৯, বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তীতেই এদেশ ছাড়বে সার্স- কোভ-২। ১৭ জানুয়ারিকে সামনে রেখে, গভীর আস্থার জায়গা থেকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে তাই আগাম অভিবাদন।
লেখক :অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয় সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত